৪ঠা এপ্রিল, ২০২০ ইং , ২১শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১০ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

দেওবন্দী আলেমের কণ্ঠে এখন মওদুদীর সুর

দেওবন্দী আলেমের কণ্ঠে এখন মওদুদীর সুর

মাওলানা আমিনুল ইসলাম ❑ আপাতত মওদুদী মতবাদের অনুসারীদের সফল মনে হচ্ছে। কেননা, তারা ওলামায়ে দেওবন্দের ঘাঁটিতে আঘাত হেনে সফলতা লাভ করেছেন। আজ যুগ যুগ ধরে মওদুদীর অনুসারীরা দেওবন্দীদের পিছে লাগা। কারণে-অকারণে ওরা আলেম সমাজকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু কুলিয়ে উঠতে পারে না। কারণ, মওদুদী সাহেব এমন কিছু ভুল-ভ্রান্তি করেছেন, এমন কিছু ফেৎনার আবিস্কার করেছেন, যেটার কারণে ইসলামের মৌল প্রাসাদ হুমকির সম্মুখিন। তার সে সব ভ্রান্ত-আকিদা বিশ্বাস কোন দ্বীনদার মুসলমান গ্রহণ করতে পারে না। তবুও মওদুদীর অনুসারীরা টার্গেট করে, কিভাবে ওলামায়ে দেওবন্দকে ধরাশায়ী করা যায়। কোন কায়দায় আলেমদেরকে মওদুদীবাদের দিকে ধাবিত করা যায়। ওরা যুগে যুগে বহু কায়দা কৌশল করেছে। একেক সময় একেক সিষ্টেম অবলম্বন করেছে, কোন ভাবে আলেমদেরকে তাদের দলে ভেড়ানো যায় কিনা। অথবা আলেমদের মুখ বন্ধ করা যায় কিনা।

আসলে কি, ওলামায়ে দেওবন্দ হক- হক্কানিয়্যাতের উপরে অটল-অবিচল সব সময়। আমাদের পুর্বসুরী কোন আলেম মওদুদী সাহেবকে সাপোর্ট করেননি। বরং তার অসারতা এবং ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনাকে জাতির সামনে তুলে ধরেছেন। যাতে এই জাতি গোমরাহীর দিকে চলে না যায়। কিন্তু মওদুদীর অনুসারীরা সহজেই ক্ষ্যান্ত হবার নয়। তারা হণ্যে হয়ে আলেমদের পিছু নিয়েছে। ওরা একবার টার্গেট নিলো দেওবন্দী আলেমদের সাথে নির্বাচনী ঐক্য। আমাদের কিছু আলেমদের ফুসলিয়ে নির্বাচনী ঐক্য গঠন করল। আবার আরেক টার্গেট হল, শিবিরের কিছু ট্রেনিং প্রাপ্ত কর্মিকে কওমী লেবাস পরায়ে কওমী মাদ্রাসায় ঢুকিয়ে দেওয়া হল। যাতে কওমীতে প্রবেশ করে, ভিতরে ভিতরে মওদুদী মতবাদের কাজ করতে পারে।

একটা বড় প্রমাণ, বিগত হাইয়াতুল উলয়ার পরীক্ষায় শিবিরের সভাপতি নিজেই দাওরায়ে হাদীসের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিল। একদম পাঁচ কুল্লি টুপি আর জুব্বা লাগায়ে বড় দরবেশ সেজে কওমী মাদ্রাসায় পরীক্ষা দিয়েছিল। যেটা নিয়ে তখন দেশ ব্যাপি ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠে ছিল।

এভাবে বহু মওদুদীবাদের অনুসারী কর্মিকে তারা দেওবন্দী মাদ্রাসায় দাখেলা করাচ্ছে। এমনকি মাদারে ইলমী দারুল উলূম দেওবন্দেও তারা তাদের ট্রেনিং প্রাপ্ত লোক পাঠায়ে কাসেমী লকব ধারণ করার মত দুঃসাহস দেখায়েছে। লেবাসগুলো একদম দেওবন্দী। কিন্তু আকিদা বিশ্বাসে মওদুদী। ওরা কওমী অঙ্গনের বিভিন্ন হালকায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। অন লাইনে ফেসবুকে বড় টুপি-পাগড়ী আর কাসেমী লকব দিয়ে আইডি খুলে খুব চাতুরতার সাথে মওদুদীবাদের গুণকীর্তন করতে দেখা যায়।

কোথাও আর মওদুদীবাদের মুখোশ উম্মোচন প্রোগ্রাম হয় না। নির্বাচনী ঐক্যতে আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের মুখ বন্ধ হয়েছে। ওরা সাকসেস হয়েছে।

মানে বোঝা এখন মুশকিল। দেওবন্দী সুরতে মওদুদীর বাঁশি বাজাচ্ছেন ওরা। কিন্তু তাদের মওদুদীর সুর। ওদের চাল-চলনে মনে হয় না। কিন্তু আসলে ওরা সেই সাজানো লোক মওদুদীবাদীদের। তবে সবচেয়ে বেশী সাকসেস মওদুদীরা, সেটা হল নির্বাচনী ঐক্য। ২০০১ সনে দেওবন্দী চিন্তা ধারার কিছু আলেম-উলামা ওদের সাথে নির্বাচনী ঐক্যে যায়, দেওবন্দীদের ফলাফল যাই হোক, ওরা কিন্তু বিশাল সফলতা লাভ করে।

এক সময় কওমী মাদ্রাসাগুলোতে মওদুদী মতবাদের উপরে বিস্তর লেখা পড়া হত। ছাত্রদেরকে মওদুদীবাদী ভ্রান্ত-আকিদা বিশ্বাস সম্পর্কে অবগত করা হত। দেশের বিভিন্ন জায়গাতে আমাদের উলামায়ে কেরাম মওদুদীর অসারতা সম্পর্কে জাতিকে সজাগ করতেন। কিন্তু যখনই নির্বাচনী ঐক্য গঠন হল, এরপরে যেন কওমী মাদ্রাসাগুলোতে আর সেই অবস্থা নেই। কোথাও আর মওদুদীবাদের মুখোশ উম্মোচন প্রোগ্রাম হয় না। নির্বাচনী ঐক্যতে আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের মুখ বন্ধ হয়েছে। ওরা সাকসেস হয়েছে।

মওদুদীবাদীরা আরো সাকসেস বোঝা যাচ্ছে, একদম বর্তমান জামানার মাঠে-ময়দানের তেজস্বী বক্তা, আবার তিনি শায়খুল হাদীস আজিজুল হক (রহ.)-এর সাহেব জাদা, বাংলাদেশের শীর্ষ এক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, জামেয়া রাহমানিয়ার শায়খুল হাদীস, মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের জেহেন ধোলাই করে ফেলেছেন।

মামুনুল হক সাহেবকে বোঝা বড় দায়, তিনি দুই নৌকাতেই থাকতে চান। তার কিছু কিছু বক্তব্য আছে, দেওবন্দীদের পক্ষে, আর মওদুদীর বিপক্ষে। আবার কিছু বক্তব্য আছে, মওদুদীদের জন্য তার বড় মায়া কান্না। কদিন আগে তিনি বললেন, কাদিয়ানী আর শিয়া ছাড়া সবাই এক প্লাট-ফরমে আসতে হবে। মানে তিনি মওদুদীদের সাথে মিশে যেতে চান। তাদের সাথে আবার ঐক্য গড়তে চান।

মামুন সাহেবের শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা আজিজুল হক সাহেব মওদুদী মতবাদের ভ্রান্তি সম্পর্কে লিখে গেছেন। আর সাঈদী সাহেব তো সেই মওদুদীবাদী দলের নায়েবে আমীর। তার মুক্তি চাওয়া মানেই তাদের দলকে সাপোর্ট করা।

মামুন সাহেবের সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা আরো পরিস্কার করে দিলেন গতকাল অনলাইনে এসে। তিনি এখন সাঈদী সাহেবের মুক্তি চান!! তার মত একজন দায়িত্বশীল আলেমের এধরনের জ্ঞানহীন বক্তব্য মানায় না। তিনি যে পর্যায়ে লোক, সে হিসেবে নিজেকে কন্ট্রোল করা উচিত ছিল। সাঈদী সাহেবের প্রতি তার হয়তো ব্যক্তিগত ভালবাসা থাকতে পারে। তবে এভাবে নাম উল্লেখ করে বলাটা ঠিক হয়নি।

মামুন সাহেবের এই বক্তব্যে আমাদের কওমী অঙ্গনের সন্তানেরা মনে করবে, মওদুদীবাদের অনুসারী সাঈদী সাহেব আসলে তিনি কোন অপরাধী নন এবং মওদুদী মতবাদ টাও খারাপ কিছু নয়। অথচ মামুন সাহেবের শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা আজিজুল হক সাহেব মওদুদী মতবাদের ভ্রান্তি সম্পর্কে লিখে গেছেন। আর সাঈদী সাহেব তো সেই মওদুদীবাদী দলের নায়েবে আমীর। তার মুক্তি চাওয়া মানেই তাদের দলকে সাপোর্ট করা। আর আমাদের সন্তানগুলো এখন মামুন সাহেবের রাস্তায় চলা শুরু করেছে।

নির্বাচনী ঐক্য যেমন আমাদের মুরুব্বীদের ইস্তেহাদী ভুল ছিল, ঠিক মামুন সাহেব এখন জেনে বুঝে বড় ভুল করলেন। যে ভুলের খেসারত কত দিন দিতে হবে আল্লাহ মালুম। আরো অনেক আলেম জেল খানায় আছে, তাদের কথা বলেন না, হেফাজতের মামলায় আক্রান্ত কত আলেম, সেটার কথা না বলে শুধু সাঈদী সাহেবের কথা এভাবে বলাটা কতটা মানানসই হয়েছে আপনি একটু ভেবে দেখুন।

আপনার প্রতি আমার খারাপ ধারণা নয়। আপনার জ্বালাময়ী বক্তৃতা আমি নিজেও শুনি। ভাল লাগে। কিন্তু এরকম ছেলে খেলা দেখানো ঠিক হলো না। আপনি নাম ছাড়াই বলতে পারতেন। এর দ্বারা আমাদের কওমী অঙ্গনে কোন প্রভাব পড়ত না। কিন্তু আপনি এমন ভাবে বললেন, যেটা আমাদের সন্তানেরা বিপথগামী হবে ভবিষ্যতে।

একটা কথা মনে রাখা দরকার। বাতিল চিরদিন বাতিল। যতই তাতে হকের আবরণ লাগানো হোক না কেন। মওদুদী মতবাদ সকল আলেমদের ঐক্যমতে বাতিল ও গোমরাহ। সুতরাং এব্যাপারে আমাদের সকলের সতর্ক হওয়া দরকার। আল্লাহ তাআলা আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com