২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

ধর্ষণের সাজা কোথায় কেমন

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : পৃথিবীর প্রতিটি দেশ ও প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষণ চরমতর ঘৃণিত অপরাধ বলে বিবেচিত। সমাজ থেকে ধর্ষণ বিতাড়নে কঠোরতর, মারাত্মক সাজার বিধান রয়েছে প্রায় প্রতিটি দেশেই। সাজা মারাত্মক না হওয়ায় অনেক দেশে ধর্ষণ মহামারীতে রূপ নেয়। যেমনটা নিয়েছে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে। একের পর এক ন্যাক্কারজনক ধর্ষণকান্ড ঘটছে দেশে। সম্প্রতি ধর্ষণ বিরোধী মিছিলে উত্তাল হয়েছে রাজধানী সহ গোটা দেশ। আসুন এই সময়ে জেনে নেই কোন দেশে ধর্ষণের সাজা কতখানি মারাত্মক।

বাংলাদেশ :
‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ নামের একটি আইন রয়েছে বাংলাদেশে। সেই আইনে বলা হয়েছে, যদি কোন পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন।

এই আইনের ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে বিডিলস নামের একটি সরকারি ওয়েবসাইটে। ব্যাখ্যায় বলা হয়, যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত (ষোল বছরের) অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা (ষোল বছরের) কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হবেন।

আরো বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন।

যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহা হলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডণীয় হইবেন এবং অতিরিক্ত অন্যুন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন।

যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন। আবার কেউ যুদি ধর্ষণের চেষ্টা করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যুন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন।

আইনের ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়, যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে কোনো নারী ধর্ষিতা হন, তাহালে যাহাদের হেফাজতে থাকাকালীন উক্তরূপ ধর্ষণ সংঘটিত হইয়াছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ ধর্ষিতা নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরিভাবে দায়ী ছিলেন, তিনি বা তাহারা প্রত্যেকে, ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হলে, হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য, অনধিক দশ বছরের কিন্তু অন্যুন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন এবং অতিরিক্ত অন্যুন দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডণীয় হবেন।

চিন :
কমিউনিজিমে বিশ্বাসী এই দেশটিতে ধর্ষণের সাজা শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ড। ধর্ষণ প্রমাণ হলেই আর কোনও সাজা নয়, সরাসরি মৃত্যুদণ্ড। আর তা কার্যকর করা হয় অত্যন্ত দ্রুত।

ইরান :
হয় ফাঁসি, না হয় সোজাসুজি গুলি। এভাবেই এদেশে শাস্তি দেওয়া হয় ধর্ষককে। কারণ তারা মনে করে, দোষী ধর্ষিতা নন, ধর্ষকই এই কাজে আসল দোষী।

আফগানিস্থান :
এই দেশটির কথা উঠলেই মনে পরে তালিবানী শাসন। কিন্তু, অদ্ভুত বিষয় আফগানিস্থানে ধর্ষণের হার অত্যন্ত কম। তবে, সেখানে ধর্ষণের সাজা শুনলে আপনিও আঁতকে উঠবেন। কারণ, ধর্ষণ করে ধরা পড়লে সোজা মাথায় গুলি করে মারা হয় ধর্ষককে।

ফ্রান্স :
নির্যাতিতার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ধর্ষকের সাজা ঠিক করা হয় এখানে। তবে, ধরা পড়ার পর এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে ১৫ বছরের জেল। অপরাধ গুরুতর হলে তা বেড়ে হতে পারে ৩০ বছরও।

উত্তর কোরিয়া :
এদেশে ধর্ষণের সাজা শুধুই মৃত্যুদণ্ড। অভিযোগ, গ্রেফতার আর তারপর অভিযোগ প্রমাণ হলে গুলি করে হত্যা করা হয় ধর্ষককে।

সৌদি আরব :
এখানেও ধর্ষণের সাজা ভয়ঙ্কর। সৌদি আরবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে রায় ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই জুমার পরে জনসম্মুখে শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। আর তাই এখানেও ধর্ষণের সংখ্যা অনেকটাই কম।

মঙ্গোলিয়া :
ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

মিশর :
ধর্ষককে জনসম্মুক্ষে ফাঁসি দেওয়া হয়।

নেদারল্যান্ডস :
যে কোনও ধরনের যৌন নিপীড়ন, এমনকি অনুমতি ছাড়া জোর করে চুম্বন করাও নেদারল্যান্ডসে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। এর শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে বয়সের উপরে ভিত্তি করে ৪ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। যৌনকর্মীদের উপরে যৌন নির্যাতনের বিষয়টিকে বেশিরভাগ দেশে অপরাধ হিসেবে খুব একটা আমল দেওয়া হয় না। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে এক্ষেত্রে অপরাধীর শাস্তি অন্তত ৪ বছরের কারাদণ্ড।

ফ্রান্স :
‌ফ্রান্সে ধর্ষণের শাস্তি অন্তত ১৫ বছরের কারাদণ্ড, সঙ্গে শারীরিক নির্যাতন। ভিকটিমের ক্ষতি কতটা গুরুতর, তার উপরে নির্ভর করে ধর্ষকের সাজা। ৩০ বছর থেকে আমৃত্যু কারাদণ্ড পর্যন্তও করা হতে পারে।

রাশিয়া :
রাশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি কমপক্ষে ৩ বছরের কারাদণ্ড। ভিকটিমের ক্ষতি কতটা গুরুতর, তার উপরে নির্ভর করে ধর্ষকের সাজা বাড়িয়ে ৩০ বছর পর্যন্ত করা হতে পারে।

গ্রিস‌ :
গ্রিসে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার একমাত্র শাস্তি আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড।

নরওয়ে :
নরওয়েতে ধর্ষকের সাজা ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতির পরিমাণের উপরে নির্ভর করে ৪ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড।

ইসরায়েল :
ইসরায়েলে ধর্ষক ব্যক্তি ন্যূনতম ৪ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র :
এখানে দুই ধরনের আইন প্রচলিত : অঙ্গরাজ্য আইন এবং ফেডারেল আইন। ধর্ষণ মামলাটি ফেডারেল আইনের অধীনে পড়লে ধর্ষককে অর্থদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে। তবে অঙ্গরাজ্য আইনের অধীনে পড়লে সাজার প্রকৃতি নিশ্চিত নয়। কেননা দেশটির একেক অঙ্গরাজ্যে ধর্ষণের শাস্তি একেক রকম। যেমন আলাবামা অঙ্গরাজ্যে শিশু ধর্ষণ রুখতে নতুন এক আইন পাস করা হয়েছে। ওই আইনে, ১৩ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষকের শরীরে রাসায়নিক ইনজেকশন প্রবেশ করিয়ে নপুংসক করা হয়।

ইউক্রেন :
ধর্ষণ করলে সেই ধর্ষককে শাস্তি হিসেবে নপুংসক করে দেওয়া হবে। দোষীদের যৌন সক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার আইন পাস করা হয়েছে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে। এই আইনে ধর্ষণ ও শিশুকে যৌন নির্যাতন হিসাবে প্রমাণিত হলে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের পুরুষের ক্ষেত্রে কার্যকর করা হবে।

ইন্দোনেশিয়া :
শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ইন্দোনেশিয়ায় শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে দেশটির আইনে সংশোধন করেছে। তবে ২০১৬ সালের এক আইনে ইন্দোনেশিয়ায় যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে নপুংসক করা হবে বলে ডিক্রি জারি করা হয়।

/এএ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com