২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা সফর, ১৪৪২ হিজরী

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩

বাকীদের অবস্থাও আশংকাজনক

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় জুলহাস (৩৫) নামে দগ্ধ আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৩ জন। তার আগে শামীম হাসান (৪৫) নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আবাসিক সার্জন পার্থ সংকর পাল।

এ পর্যন্ত ২০টি মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ১৪ জনের মরদেহ নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একে একে সবার মরদেহ মাঠে রাখা হয়েছে। জানাজা শেষে সবার মরদেহ দাফন করা হবে। এরই মধ্যে এক শিশুর জানাজা শেষ হয়েছে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে শিশুটির জানাজা শেষ হয়। পরে কেঁদে কেঁদে শিশুটিকে দাফনের জন্য নিয়ে যান স্বজনরা।

এর আগে বিকেল থেকে একে একে নিহতদের মরদেহ ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় নিয়ে আসা হয়। ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা বোমওয়ালার বাড়ির খেলার মাঠে নিহতদের জানাজার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে অনেকগুলো খাটিয়া। গোসল ও জানাজা শেষে মরদেহ দাফনের জন্য প্রস্তুত স্থানীয়রা।

একসঙ্গে এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শনিবার এলাকার সব দেকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ গ্রহণ করেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদা বারিক। জানাজা শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করবেন ইউএনও। এদিকে নিহতদের পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. জসিম উদ্দিন।

সদর উপজেলার পশ্চিম তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে শুক্রবার এশার ফরজ নামাজ শেষ হওয়ার পর ৬টি এসি পর পর বিস্ফোরণে বেদনা বিধুর এ ঘটনাটি ঘটে। ফরজ নামাজের মোনাজাত শেষে অনেকে সুন্নত ও অন্য নামাজ পড়ছিলেন। এসময় মসজিদের ভেতরে প্রায় ১০০ জনের মতো মুসল্লি ছিলেন। বিস্ফোরণে অন্তত ৪০ জন মুসল্লি দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৩৭ জনকে রাতেই শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পরপরই জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন মহল ঘটনাস্থল পরির্দন করেছেন। এ ঘটনা তদন্তে পৃথক তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় গভীর শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এদিকে, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দগ্ধদের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি যারা ভর্তি আছেন তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। মৃতদের মধ্যে ১৩ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলে রিফাত (১৮), মোস্তফা কামাল (৩৪), জুবায়ের (১৮), সাব্বির (২১), কুদ্দুস ব্যাপারী (৭২), হুমায়ুন কবির (৭০), ইব্রাহিম (৪৩), মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন (৪৮), জুনায়েদ (১৭), জামাল (৪০), জুবায়ের (৭) ও রাশেদ (৩৪) ও রাসেল (৩৪)। বাকি ৪ জনের নাম এখনও জানা যায়নি।

নিহত ১৮ জনের মধ্যে গতকাল সন্ধ্যার মধ্যে ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম হোসেন খান। তিনি বলেন, স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শনাক্তের পর বিনা ময়নাতদন্তে ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আহতদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশ: শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) বিস্ফোরণে আহতদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। একই সঙ্গে তিনি রোগীদের সব রকম সুবিধা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগ থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আহতদের ব্যক্তিদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক, পরিচালক ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে আমি বৈঠক করেছি। তাদেরকে বলেছি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। আমাদের চিকিৎসার মধ্যে সর্বোচ্চ দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধদের দেখতে এসে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক রোগীকে দেখেছি। তাদের যে অবস্থা আমরা এমনটা বলতে পারবো না যে তারা প্রত্যেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। তবে এইটুকু আমরা বলতে পারি আমাদের বাংলাদেশে যতটুকু চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে এই উন্নত হাসপাতালে তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।’

তদন্ত কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। আমরা যতটুকু শুনেছি তারা ঘটনার সূত্রপাত আইডেন্টিফাই করেছে এবং গ্যাস পাইপের লিক কোনও জায়গা থেকে বের হয়েছে তাও জানা গেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর জানা যাবে কেন এ ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে শুনেছি তদন্ত অব্যাহত আছে, আশা করি দ্রুতই আপনারা জানতে পারবেন।’

স্বজনদের জন্য পুলিশের হটলাইন: এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ও নিহতদের সহায়তায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একটি জরুরি সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসেনর পক্ষ থেকে এই সহায়তা কেন্দ্র খোলা হয়েছে। স্বজনরা এখান থেকে সব ধরনের তথ্য ও সহযোগিতা পাবেন। এছাড়া নিহতদের মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে স্বজনদের একটি হটলাইন খুলেছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিনের পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। মরদেহ গ্রহণ ও হস্তান্তরের জন্য স্বজনদের এই ০১৭৩২৮৯২১২১ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

খোঁজ রাখছে ধর্ম মন্ত্রণালয়: এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত মুসল্লিদের চিকিৎসার বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় খোঁজ খবর রাখছে বলে জানিয়েছেন সচিব ড. নুরুল ইসলাম। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় মুসুল্লিদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি। এছাড়া মারা যাওয়া মুসল্লিদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ ও এসির অবস্থা পরীক্ষা করার নির্দেশ: মসজিদে এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় তিতাস তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। পাশাপাশি সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন এলাকায় মসজিদ-মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ সংযোগ ও এসির অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এদিকে মসজিদে এসি বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ শোক প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

নাশকতা মনে করছেন এমপি শামীম ওসমান: নারায়ণগঞ্জের তল্লায় মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে মনে করছেন না নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি একেএম শামীম ওসমান। ঘটনাটিকে তিনি নাশকতামূলক বলে আশঙ্কা করছেন। পাশাপাশি ঘটনা উর্ধ্বতন পর্যায়ে তদন্তের দাবি করেন তিনি। শনিবার দুপুরে পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেয়ার সময় তিনি এসব কখা বলেন। শামীম ওসমান বলেন, আমি এ ঘটনাটি নাশকতামূলক বলে আশঙ্কা করছি। কারণ গ্যাস জমে ৪৫ জন মানুষ পুড়ে ফেলবে এটা সম্ভব না। এসি আমাদের অনেকের বাড়িতে আছে। এসি বিষ্ফোরণ হলে বাইরে হবে। কারণ এর গ্যাস চেম্বার বাইরে থাকে। দ্বিতীয়ত, গ্যাস সংযোগ দেখলাম গেইটের সামনে। ওটা দিয়ে ভিতরে ঢুকবে না। এখানে খোলা বাতাশ, গ্যাস সেটার সঙ্গে বেড়িয়ে যাবে। ভিতরে যদি কিছু থেকে থাকে সেটা বের করার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। কিন্তু প্রশ্ন হলো স্পার্ক করলে কে? আগুনটা লাগলো কি করে ? এতগুলো মানুষ একসাথে পুড়ে গেল। এভাবে, একই সঙ্গে এতগুলো মানুষ পুড়ে যাওয়া অসম্ভব। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে এ বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন। প্রয়োজনে যারা নিহত, আহত হয়েছে ভবিষ্যতে তাদের জন্য ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। আমরাও বিষয়টা দেখবো। এগুলো ধাপে ধাপে করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবন তো ফিরিয়ে আনা যাবে না। যারা মারা গেল তারা তো শহীদের দরজা পেয়েই গেছেন। কিন্তু যারা এখনো আহত তাদের পরিবারের কি শোক, এটা একমাত্র তারাই বুঝতে পারছে। আমাদের যায় নাই, আমরা বুঝতে পারবো না। আমি দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করবো, যারা বিছানায় কাতরাচ্ছে তাদের জন্য দোয়া করবেন।

তিনি বলেন, আমি তদন্তকারী কর্মকর্তা না। তবে ২০০১ সালে আমার সঙ্গে এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। চুন খেয়ে যার মুখ পুড়ে সে সব জায়গায় চুনের গন্ধ পায়। আমি এখানে চুনের গন্ধ পাচ্ছি। এ ধরণের ঘটনা শাহ জালাল বাবার দরগায়ও ঘটেছে দেখলাম, এ জন্য কয়েকজনকে ধরাও হয়েছে। আমি বলছি না, এটা ওটার সঙ্গে সম্পৃক্ত কিন্তু আমার মনে হয়, তদন্ত আরো গভীরভাবে হওয়া উচিৎ। আমি মনে করি, প্লাস্টিক, রাসায়নিক বা এসকল ঘটনা তদন্তে যারা অভিজ্ঞ লোক তাদের এই ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হোক। ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিজ্ঞ কারা সেটা সরকার নির্ধারণ করবেন। তবে আমি মনে করি এ ঘটনাটিকে আরো নজর দেয়া দরকার।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com