১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১লা সফর, ১৪৪২ হিজরী

নারীর অগ্রযাত্রা এবং আজকের বাংলাদেশ

গৃহশোভা। মনজু আরা বেগম

নারীর অগ্রযাত্রা এবং আজকের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৯ এই ৪৮ বছরে এ দেশের নারী সমাজ অনেকক্ষেত্রে এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। নারীরা অর্থনীতির সর্বক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অন্তর্ভূক্তি তথা উন্নয়নের মূল ¯্রােতধারায় নারীকে অর্ন্তভূক্ত করার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৭২ সালে। সরকারি চাকুরীতে নারীদের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে দিয়ে সকল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অবারিত করে শতকরা দশভাগ কোটা সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে দুইজন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভূক্ত করা হয় এবং একজন নারীকে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক নিয়োগ করা হয়। এর পর থেকে পর্যায়ক্রমে নারীরা ঘরের বাইরে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য চেষ্টা চালাতে থাকে।

বর্তমান সরকার ২০১১ সালের ৭ মার্চ জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করে। কিন্তু এ নীতিমালা ঘোষণার সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত শুরু হয়ে যায়। সমাজের একটি অংশ এ নীতি মেনে নিতে না পাড়ায় সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করে। কিন্ত বর্তমান সরকারের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নারী জাতিসহ সমাজে সমাদৃত হয়। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিরসনের জন্য একটি সনদ তৈরি করা হয়, যা সিডও সনদ হিসেবে গৃহীত হয়। এ সনদটি বিশে^র ১৮৭টি রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশ ১৯৮৪ সালের ৬ ডিসেম্বর কিছু ধারা সংরক্ষণ সাপেক্ষে অনুমোদন করে। আমাদের সংবিধানের ২৮(১)অনুচ্ছেদে নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার বিধানাবলির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব আইনকে ২৬(১) অনুচ্ছেদ বাতিল বলে গণ্য করে । সিডও একটি মানবাধিকার সনদ। যা নারী জাতির সব ধরনের মানবাধিকার ভোগের নৈতিক দর্শনের দলিল।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, এনজিও সর্বোপরি সরকার নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সার্বিকভাবে বলা যায় বর্তমান সরকারের নারী উন্নয়নের বিভিন্ন ইতিবাচক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সেবা এবং কর্মসংস্থানসৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলেও মানবিক মূল্যবোধের দিক থেকে বাংলাদেশের নারীরা এখনও পুরোপুরি মূল্যায়িত হয়নি। নারীর ও শিশুর প্রতি সহিংসতা সমাজে এখনো বিদ্যমান। নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করার জন্য ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হয় বিশ^ মানবাধিকার সম্মেলন। এই সম্মেলনে নারীর সমতার অধিকারকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে মাবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর ১৯৯৫ সালের বেইজিং সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে এ ধারণা আরও শক্তিশালী হয়।

আমাদের নারী সমাজ অসীম সাহসের অধিকারী, আতœবিশ^াসী ও পরিশ্রমী। দেশের রপ্তানি শিল্পের ৯০ শতাংশ আয়ই নারী শ্রমে অর্জিত। এ জন্য নারী সমাজকে এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি বলা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, কৃষি প্রধান বাংলাদেশে জিডিপি’র ৩০ শতাংশ আসে কৃষিখাত থেকে। এ কৃষি কাজের বীজ বপন থেকে শুরু করে ধান কাটা মাড়াইসহ অধিকাংশ কাজই সম্পন্ন করে গ্রামের নারী সমাজ। তারপরও কৃষিতে নারীর অবদান এখনও স্বীকৃত হয়নি। বাংলাদেশের নারীরা পরিবারে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত মজুরীবিহীন কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে তাদের মজুরীবিহীন শ্রমের কোন মূল্যায়ন করা হয়না। এ মজুরীবিহীন শ্রম অর্থনীতিতে যুক্ত করা হলে দেশের জিডিপি’র পরিমাণ আরও বেশি হারে বৃদ্ধি পেত।

নারীর ক্ষমতায়তনের কথা বলা হলেও পুরুষশাসিত সমাজে নারীর ক্ষমতায়নকে অনেক পুরুষই মেনে নিতে পারে না। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা নারী উন্নয়ন নীতিকে যুগোপোযোগী একটি নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। নারীর প্রতি সহিসংতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, ২০১০ ও জতীয় শিশুনীতি ২০১১ প্রণয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে নারীর অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশে^ শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় সংসদে প্রথম নারী স্পিকার, সংসদ নেতা, উপনেতা ও বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে নারীরা দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান সংসদে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৭২ জন নারী সাংসদ সদস্য রয়েছেন। মন্ত্রী পরিষদে ৫ জন নারী মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে শিক্ষার মত একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ পদে একজন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। মন্ত্রী সভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ সরকার নারী ক্ষমতায়নের অগ্রদূত হিসেবে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রদূত, সেনা, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগে, হাইকোর্ট বিভাগে নারী বিচারপতি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নারী পুলিশ ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী রয়েছেন। এক কথায় বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, আইন সভাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ৫০ এ উন্নীত করা হয়েছে। প্রথমবারের মত একজন নারী অধ্যাপককে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে প্রোভিসি পদে একজন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ইউএন উইমেন প্লানেট ৫০:৫০ চ্যাম্পিয়ন ও গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম কর্তৃক এজেন্ট অব চেঞ্জ এওয়ার্ড-২০১৬ প্রদান করা হয়। নারী ক্ষমতায়ন ও নারী শিক্ষার অঙ্গিকারের জন্য ২০১৪ সালে ইউনেস্কোর ’পিস ট্রি’ পুরস্কার ও গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ এ্যাওয়ার্ড-২০১৮ এ ভূষিত করা হয়। এ ছাড়াও কর্মজীবী নারীদের সুবিধার্থে মাতৃত্বকালীন ছুটি পূর্বের চার মাসের স্থলে বৃদ্ধি করে ছয় মাস করা হয়েছে। বিগত কয়েক দশকে পুরুষের চেয়ে নারীদের স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে। ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে নারীরা ৮৫ শতাংশ ঋণ সুবিধা পাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির গতি সঞ্চারে ক্ষুদ্র ঋণের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৪.২ শতাংশ পরিবার নারী প্রধান। যেটা গত শতকের শেষ দশকে ৫ শতাংশের বেশি ছিল না। আর্থ সামাজিক, নারী পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিগত তিন দশক ধরে ভাল করছে। ১৯৮১ সালে নারীর গড় আয়ু ছিল ৫৪.৫ বছর আর পুরুষের ৫৫.৩ বছর। ৩৬ বছর পর এ চিত্র পাল্টে গেছে। ২০১৭ সালে নারীর গড় আয়ু ছিল ৭৩ .৫ বছর আর পুরুষের ৭০.৬। প্রতি বছর নারীর গড় আয়ু বেড়েছে ০.৫৩ বছর আর পুরুষের ০.৪৩ বছর। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম – জেন্ডার গ্যাপ ২০২০ প্রতিবেদনে নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশংসা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৮ বছরে পদাপর্ণ করলেও নারী অগ্রগতি বা নারীর অগ্রযাত্রায় তাদের অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী দেশের অর্থনীতিতে া অনেক অবদান রেখে চলেছে। বলা যায় নারীরাই অর্থনীতি চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তাই দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারী নেতৃত্বসহ নারীদের অংশগ্রহণ এবং উচ্চ পদসমূহে নারীদের পদসংখ্যা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। তাহলে দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং উত্তরোত্তর আরও এগিয়ে যাবে একথা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com