৭ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

নিরবেই চলে গেল কবি নজরুলের জন্মজয়ন্তী

নিরবেই চলে গেল কবি নজরুলের জন্মজয়ন্তী

আমিনুল ইসলাম কাসেমী ❑ এবার নিরবে চলে গেল জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্ম দিনের কথা। ফেসবুকের বন্ধুরা যেন একদম খামোশ। কারো কোন লিখনী পেলাম না। দু একজন বন্ধু কিছুটা লিখেছেন। বাকি আর কারো থেকে কোন কলাম দেখতে পেলাম না।

অথচ কবি নজরুল মুসলিম জাগরণের কবি। শুধু জাতীয় কবি নয়। তিনি বিদ্রোহী কবি। তাঁর দ্রোহের কবিতাগুলো এখনো শিহরিত হয়। সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নজরুলের যে কি সীমাহীন অবদান, বলে শেষ করা যাবেনা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখে কারাবরণ করেছেন।নির্যাতিত হয়েছেন তিনি। বহু জুলুমের শিকার ছিলেন কবি নজরুল।

‘কারার ঐ লৌহ কপাট/ ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ এখনো যে গা শিউরে ওঠে। তাঁর প্রত্যেকটা কবিতায় এমন স্পিরিট ছিল, যেন স্বৈরাচারের মসনদ থরথর করে কাঁপত। ব্রিটিশ-বেনিয়াদের গায়ে যেন আগুনের লেলিহান শিখা গিয়ে আঘাত হানত। যার কারণে তিনি ব্রিটিশ সরকারের রোষানলে পড়ে ছিলেন। নির্যাতনের খড়গ সহ্য করতে হয়েছে। তবুও কবি নজরুল ছিলেন দুর্দমনীয়। কোন অপশক্তির কাছে তিনি মাথানত করেন নি। চালিয়ে গেছেন।

মুসলিম জাগরণের কবি তিনি। তাঁর কবিতা গুলো আজো হৃদয় ছুঁয়ে যায়। একজন পাক্কা মুসলিমের অন্তরের কথা গুলো কবির মুখ থেকে নিসৃত হয়েছে। ‘খোদার প্রেমে শরাব ও পিয়ে/ বেহুঁস হয়ে রই পড়ে হায়’। খোদা প্রেমের এক জাজ্জল্য প্রমাণ ওঠে এসেছে নজরুলের কবিতায়। খাঁটি মুমিনের চরিত্র ফুটে ওঠেছে কবিতা রচনায়। অত্যান্ত সাবলীল ভাষায় তাঁর এই কবিতা মানুষের হৃদয় কেড়ে নিয়ে ছিল।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশি ঈদ’ কালজয়ী এক ইসলামী সংগীত। যুগ যুগ ধরে স্রোতাদের পাগল করে আসছে। তাঁর এই ইসলামী সংগীত যেন বারবার শুনতে মন চায়। কবি নজরুলের ইসলামী ভাবধারার কবিতা গুলো মুসলিমদের হৃদয় জয় করেছিল। এখনো পর্যন্ত যেন তাঁর গান, কবিতা, ছড়া, গল্প, গীত, সবকিছু অনন্য-অতুলনীয়।

‘মসজিদের পাশে কবর দিও আমায়/ যেন মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই’। হর লাইনে তিনি লিখে গেছেন। অতি অল্প সময়ে তিনি অনেক উচ্চতায় উঠে ছিলেন। সাহিত্যের চুড়ায় বিচরণ করেছিলেন তিনি।

একজন ফিতরি (স্বভাবজাত) সাহিত্যিক-কবি ছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি যেন জন্মগত ভাবেই কবি। তা নাহলে সেই আসানসোলের রটির দোকানে চাকুরী করার সময়, যখন তিনি ছোট্ট। পুঁথি পড়তেন, ছড়া, কবিতা লিখতেন। ঢের লেখাপড়া ছিল তাঁর? তারপরেও তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটেছে ছেলেবেলা থেকেই।

কবি নজরুল ১১ জৈষ্ঠ পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতার নাম ফরিদ আহমেদ, মাতার নাম জাহেদা। নজরুলের ডাক নাম ছিল দুঃখ মিয়া। নজরুলের পুর্বে আরো তিন ভাই ছিল, যারা একে একে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর নজরুলের জন্ম। মাতা পিতা তাই তাঁর নাম রেখে ছিলেন দুঃখ মিয়া।

এই দুঃখ মিয়াই আমাদের জাতীয় কবি। এমন প্রতিভা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, যার রচনা আজো ভাস্বর হয়ে আছে। কাল থেকে মহাকাল চলছে নজরুলের কবিতা। দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত হওয়া মানুষটি জয় করেছেন বিশ্ব। কবিতা রচনা করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন পুরো জগৎ বাসীর মাঝে।

একজন অসাম্প্রদায়িক কবি ছিলেন তিনি। শুধু মুসলিম আর ইসলাম নিয়ে লেখেন নি। হিন্দুদের নিয়ে লিখেছেন। সকল সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয়। সবচেয়ে বড় ভাল লাগে দ্রোহের কবিতা। জালিম শাহীর বিরুদ্ধে তাঁর কলম গর্জে ওঠেছে বারবার। অথচ সমকালিন অন্য কবিদের থেকে সে রকম বিদ্রোহী কবিতা দেখা যায়নি। ইনআম আর খ্যাতির আশায় তাঁরা কখনো জালিম শাহীর বিরুদ্ধে মুখ খোলেন নি কেউ। এব্যাপারে নজরুল ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর কবিতা, গানে বেজে ওঠেছে দেশ প্রেম, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের কথা আর পরাধীনতার জিন্জির ছেঁড়া গল্প।

জাতীয় কবির জন্ম পশ্চিম বঙ্গে হলেও তাঁর বিচরণ ছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশের বহু জায়গায় তাঁর গমনাগমন ছিল। বাংলাদেশের মাটি মানুষের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠেছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সনে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। কবির ইচ্ছা ছিল মসজিদের পাশে কবর হোক। সেই ইচ্ছে অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়লের মসজিদের পাশেই তাঁর সমাধি।

প্রিয় কবির জন্য দুআ কামনা। আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবান্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com