২২শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি

নেতার কাজ গা বাঁচানো নয়

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : নেতৃত্ব সংকট আমাদের অনেকদিন থেকে। আমার যতটুকু লেখাপড়া এবং রাজনীতি দেখার বয়স, সেই আশির দশকের শেষ ও নব্বই দশক থেকে ধরা যায়। তখন থেকে দেখে আসছি, আমাদের আসলে কোন নেতা নেই। যা কিছু ময়দান গরম করা পর্যন্ত। এরপর আর কোন নেতাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মিছিল-মিটিং হয়ে গেলে সবাই তখন যার যার মত।

গতকাল একজন দেশের খ্যাতিমান আলেম এর সাথে অনেক কথা হল। তিনি ঢাকা শহরের একটা উল্লেখযোগ্য মাদ্রাসার নায়েবে মোহতামিম এর দায়িত্ব বহুকাল যাবত পালন করেছেন। আবার তিনি একজন সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস। বর্তমান ঢাকা শহরের মধ্যেই তিনি একটি মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

অনেক আফসোসের সাথে, দেশের এই সংকটে, এই অবস্থার আলোকে অনেক কথাই তিনি আমাকে শেয়ার করলেন। তিনি বলেন, আমি নায়েবে মোহতামিম থাকাকালিন, তখন মোহতামিম ছিলেন, সেসময়কার খ্যাতনামা শায়খুল হাদীস এবং প্রসিদ্ধ ইসলামিক নেতা। তিনি মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের ডাক দিতেন। ছাত্ররা তাঁর ডাকে সাড়া দিত। সময়ে-অসময়ে ছাত্ররা গিয়ে সেখানে শরীক থাকত।

একবার এক মিছিল থেকে কিছু ছাত্র পুলিশের কাছে বন্দী হয়ে গেল। হজুর বলেন, আমি তৎক্ষণাৎ সেই ইসলামিক নেতাকে অবহিত করলাম, ‘আমাদের কিছু ছাত্রতো পুলিশের কাছে বন্দী হয়ে জেলহাজতে আছে।’ তাদের ছাড়ানোর ব্যাপারে তো আপনার সহযোগিতা চাই। উক্ত ইসলামিক নেতার সাফ জওয়াব, আমি তো তাদের মিছিলে যেতে বলেছি, পুলিশের হাতে তো বন্দী হতে বলিনি!

বড় অবাক করা কান্ড! তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মিছিলে গেল, অথচ তিনি কোন ধরনের সহযোগিতা দুরে থাক,বরং গা বাঁচিয়ে চলে গেলেন। কখনো তাদের ছাড়ানোর ব্যাপারে কোন চেষ্টা করলেন না। এমনকি আর্থিক ভাবে কোন সহযোগিতার কথাও বললেন না।

এভাবে কিন্তু বিভিন্ন সময়ে মিছিল –মিটিং এ আমাদের ছাত্র পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, কিন্তু আমাদের নেতারা সেদিকে নজর করেন না। নেতারা গা বাঁচিয়ে চলে যান। বহু ছাত্রের জীবন শেষ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে তারা মামলা-মোকাদ্দমা চালাতে পারেন না। এমনিতে সাধারণ দরিদ্র ফ্যামিলির ছাত্ররা বেশী থাকে মাদ্রাসাগুলোতে, তারপরে যদি তাদের কাঁধের উপর মামলার খড়গ থাকে, তাহলে কিভাবে সম্ভব সামনে চলা?

বহু ছাত্র শহীদ হয়েছে আমাদের ইসলামিক নেতাদের ডাকে আন্দোলন-সংগ্রামে গিয়ে। আজো সেই পরিবারে কোন খোঁজ নেওয়া হয় না। এমনকি তাদের বাড়ীতে গিয়ে কোন সান্ত্বনা দেওয়া হয় না।

আমি নিজেও বহু আন্দোলন সংগ্রামে যোগ দিয়েছি, পুলিশের ছোঁড়া কাঁদানি-গ্যাসে এবং পুলিশের লাঠির আঘাতে আহত হয়ে একবার রাস্তায় পড়ে ছিলাম। মানুষ ধরে নিয়ে মাদ্রাসায় পৌছে দিয়েছে। মাদ্রাসাওয়ালারা এবং ছাত্র ভায়েরা চিকিৎসা করেছেন কিন্তু যে সব নেতার আহবানে গিয়েছিলাম, তারাতো একবারও দেখতে আসলেন না।

১৯৯৭, ১৯৯৮, ২০০০ এবং ২০০১ সনে আমাদের বহু ছাত্র ভাই আহত হয়েছেন। সেসময়ে অনেকে জেলে গিয়েছেন। কিন্তু তারা অবহেলার শিকার হয়েছে। অথচ ২০০১ সনে নির্বাচনে আমাদের হুজুরগণ কিন্তু সরকারের অংশীদার ছিল। তারপরেও সেসব ছাত্ররা ছিল অবহেলিত। তাদের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। তাদের কোন প্রকার আর্থিক সহযোগিতা করা হয় নি। চারজন এমপি মিলে কি সেই সব কর্মিদের খোঁজ নেওয়া যেত না ?। বরং ওনারা এমপি হয়ে সাধ মেটালেন, আর রাজপথের কর্মিগুলো চিরদিন অবজ্ঞার পাত্র হয়ে রয়েই গেল।

বিগত হেফাজতের আন্দোলন সংগ্রামে কতগুলো তাজা প্রাণ ঝরেছে, সেটা কিন্তু কারো অজনা নয়। বহু ছাত্র জেল খেটেছেন। বহু ছাত্র ভাই শাহাদাত বরণ করেছেন। আচ্ছা, তাদের ব্যাপারে কি কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছুই করা হয় নি। এখনো শাপলার শহীদ হাফেজ নান্নু মুন্সির স্ত্রী অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না। টাকার জন্য তার পরিবার পাগলের মত দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। যেটা কয়েকদিন আগেও অন লাইন নিউজে দেখা গেছে।

একটা পরিবারের কত স্বপ্ন থাকে, ছেলেকে বড় করবে। তাঁকে বড় আলেম বানাবে।

আমাদের ফরিদপুর এলাকায় বহু আলেম কারাবরণ করেছিলেন হেফাজতের আন্দোলনের সময়। যারা লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে মামলা চালিয়েছেন, এখনো সেই মামলা ঝুলছে। কিন্তু হেফাজতের নেতাদের কোন খোঁজ নেই। বরং সেই জেল খাটা নেতাগুলো এখন চরম ভাবে অবহেলিত। তাদেরকে অর্থের যোগান দেওয়া তো দুরের কথা, তাদেরকে হেফাজতের কমিটিতে রাখা হয় নি। এখন কমিটিতে রাখা হয়েছে, অন্য কিছু লোক। কিন্তু যারা হেফাজতের আন্দোলনের জন্য জান-কোরবান করল, যারা জেল-জুলুমের শিকার হল, তারা কেন আজো অবহেলিত থাকবে?

এবারের আন্দোলনে ১৭ জন কর্মি নিহত হয়েছেন। এর অধিকাংশ মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্র। বলেন তো, এসব নিরীহ–দরিদ্র পরিবারের সন্তানগুলো প্রাণ হারালো, আমাদের নেতারা ওনাদের জন্য এখন কি করবেন? তাদের পরিবারের জন্য কি কোন বাজেট আছে ওনাদের? একটা পরিবারের কত স্বপ্ন থাকে, ছেলেকে বড় করবে। তাঁকে বড় আলেম বানাবে। হয়ত সে ছেলে মা-পিতার খেদমতে নিজেকে সঁপে দিবে। কিন্তু সব স্বপ্নের গুড়েবালি।

ছেলেটাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিল তো আলেম বানানোর জন্য। তাঁকে তো আর মিছিল-মিটিং এ শহীদ হওয়ার জন্য পাঠানো হয় নি। এটা কোন মায়ের ইচ্ছে থাকে না। আমরা জোর করে এখন তাদের সান্ত্বনা দেই, তোমার ছেলে আল্লাহর রাস্তায় চলে গেছে। সে বেচারা ইচ্ছের বিরুদ্ধে গেলেও কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেনে নেয়। কিন্তু আমরা কি করলাম সেই শহীদ পরিবারের জন্য? তাদেরকে কি কোন আর্থিক ভাবে কিছু করতে পারব?

হেফাজতের নেতার জন্য কিছু মানুষ দামী গাড়ী কিনে দিতে রাজী হয়ে যান। নেতাদের তো মাশাআল্লাহ গাড়ীও আছে। এক নেতা আরেক নেতার ব্যাপারে অনলাইনে গ্রুপ খুলে গাড়ী কেনার প্রস্তাবও দিয়ে থাকেন। ঐসব ভাইদের বলছি, নেতাদের জন্য গাড়ী না কিনে এবার শহীদ পরিবারের জন্য গাড়ী ক্রয় করে দিন,নতুবা ঐরুপ একটা গাড়ীর মুল্য এক শহীদ পরিবারকে সাহায্য করুন।

আবার যারা আহত হয়ে আছেন, তাদেরও মোটা অংকের সহযোগিতা করা উচিত। যাতে সুচিকিৎসা তারা গ্রহণ করতে পারে। আমরা প্রতিবারই একটা ধোয়া তুলি, সরকারকে ক্ষতিপুরণ দিতে হবে। এভাবে একটা জোয়ার তুলে দিয়ে পাশ কেটে চলে যাই। শেষমেষ ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের দিকে কেউ আর হাত বাড়ায় না।

আরেকটা কথা, আন্দোলন সংগ্রামে নামার ক্ষেত্রে কি কোন নিয়ম নীতি থাকবে, নাকি নিজের ইচ্ছেমত আমরা যখন মনে চায় নেমে যাব। কেননা, কোন নেতা নেই আমাদের। নেতার কমান্ড মানা হচ্ছে না। গোলমাল হল বায়তুল মোকাররমে। কে বা কাহারা সেখানে তুমুল হট্রগোল শুরু করে দিল। কিন্তু হাটহাজারীতে আমাদের ছাত্র ভায়েরা কার হুকুমে ময়দানে নেমে গেল। সেখানে নেমে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে নিয়ে গেল দেশের অবস্থা। পুরো দেশের পরিবেশটা ঘোলাটে করে ফেলল। অথচ মাদ্রাসাগুলোতে কোথাও পরীক্ষা চলছে। কোথাও পরীক্ষা সমাপ্ত। আর ‘আল হাইয়াতুল উলইয়া’ এর তো পরীক্ষার সময় এখনো হয় নি। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যে ছাত্ররা মাঠে নেমে গেল। এবং ১৭ জন নিরীহ ছাত্রের জীবন চলে গেল। দেশের অগণিত ছাত্র –জনতা আহত হল। দেশের মাল সম্পদের ক্ষতি হল। যেটা চিন্তার বিষয়।

এমন নেতার দরকার, যিনি বুঝে-শুনে নেতৃত্ব দিবেন। তাঁর কর্মসুচিতে দেশের সম্পদ বিনষ্ট হবে না।

এজন্য আমার কথা হলো, আমাদের দেশে একজন যোগ্য নেতার প্রয়োজন। যিনি আসলে দেশপ্রেমিক হবেন। তিনি গা বাঁচাবেন না। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবেন না। কর্মিদের বিপদে ফেলে গা ঢাকা দিবেন না। যিনি কর্মিদের প্রাণ উজাড় করে ভালবাসবেন। যিনি কর্মিদের খোঁজ-খবর নিবেন। নিজে দামী গাড়ী ব্যবহার না করে নিজ দলের নেতা-কর্মিদের কথা চিন্তা করবেন। কোন কর্মি জেলে গেলে বা আহত হলে তাঁর জন্য পাগলপারা হয়ে যাবেন। কর্মিকে জেল থেকে বের করা এবং শহীদ পরিবারের খোঁজ–খবর নিতে কোন ধরনের ছল-চাতুরী করবেন না। এমন নেতার দরকার, যিনি বুঝে-শুনে নেতৃত্ব দিবেন। তাঁর কর্মসুচিতে দেশের সম্পদ বিনষ্ট হবে না। অহেতুক প্রাণগুলো ঝরে পড়বে না। কখনো অতিউৎসাহী হয়ে কোন কাজ করবেন না। যার কথায় কর্মিরা ঝাপিয়ে পড়বে। তাঁর হুকুমের খেলাফ কেউ কিছু করবেন না। এরকম একজন যোগ্য নেতা চাই আমাদের।

কোন হুজুগী হয়ে কাজ নয়। বুঝে-শুনে সামনে বাড়ানো দরকার। মনে চাইল আর সাথে সাথে কর্মসুচি ঘোষনা করে দিলাম, এটা কেমন কথা? হাজার হাজার ছাত্রের পরীক্ষা সামনে, সেদিকে কি লক্ষ্য করতে হবে না? এই যে কত ছাত্রের স্বপ্ন নষ্ট হল, কত ছাত্রের পরিবার জীবনের মত পুঙ্গ হয়ে গেল, এগুলোর দায়ভার কে নিবে?

আমাদের মাদ্রাসাওয়ালাদের কিছু নিয়মনীতি অবশ্যই থাকা উচিত। ছাত্ররা কেন উস্তাদদের কমান্ডের বাইরে যাবে? এটাতো ভার্সিটি নয়। এখানে আমরা আদব শিক্ষা দিয়ে থাকি। তাহলে পরীক্ষার সময় কেন ছাত্ররা ময়দানে নামবে? আর ছাত্ররা কেন উস্তাদদের হুকুম ছাড়া সংগ্রামে অবতীর্ণ হবে?

আরও পড়ুন: ওয়াজের ময়দানে ওয়াজ নেই

একারণে আমাদের এই শুভবুদ্ধির উদয় কবে হবে আল্লাহ ভাল জানেন। গা বাঁচানোর রাজনীতি নয়। রাজনীতি যারাই করেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে করুন। দেশের মঙ্গল হয়,দশের মঙ্গল হয়, সে রকম কিছু করার চেষ্টা করুন। নিরীহ ছাত্রদের ব্যাপারে সতর্ক হোন। আল্লাহ তুমি আমাদের সকলের উপরে রহম কর। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com