২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

নৌযান চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক ● দেশের নৌপথে নৌযান চলাচলে কোনো মনিটরিং নেই। ফলে বিভিন্ন নৌরুটে বেপরোয়াভাবে নৌযান চলাচল করছে। মূলত নৌযান মালিকরা ইচ্ছে অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণভাবে নৌযান পরিচালনা করছে। ১৫ মার্চের পর মেঘনার ডেঞ্জার জোনে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নিয়ম থাকলেও লঞ্চ মালিকরা তার তোয়াক্কা করে না। বরং দৌলতখান-আলেকজান্ডার, মনপুরা-হাতিয়া, বেতুয়া-তজুমদ্দিন-ইলিশা-মজু চৌধুরীর হাট মীর্জাকালু ও হাকিমউদ্দিনসহ বিভিন্ন রুটে অবৈধ একতলা লঞ্চ চলছে। ওসব রুটে এই মৌসুমে বিআইডব্লিউটিসির সি-ট্রাক চলাচলের কথা থাকলে কৌশলে তা বিকল দেখিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে একতলা লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। ফলে প্রায় প্রতি বছরই বর্ষা ও ঈদ মৌসুমে নৌ-দুর্ঘটনা ঘটছে। আর দুর্ঘটনার পর পরই বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরসহ নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় নানা তৎপরতা শুরু করে। পরবর্তীতে সবকিছু থমকে যায়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র মতে, ইতোপূর্বে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলকারী বড় নৌযান হিসেবে পরিচিত কেয়ারি সিন্দাবাদ, সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া জাহাজগুলো দক্ষিণাঞ্চলের ডেঞ্জার জোনে পরিচালনা করা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত ওসব নৌযান দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে দেখা যাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিসি ওসব রুটে পর্যাপ্ত সি-ট্রাক সচল থাকার দাবি করলেও বাস্তবে ইজারাদার তা বিকল দেখিয়ে ইচ্ছামাফিক ছোট নৌযান পরিচালনার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়েই অবৈধ নৌযানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় না থাকার সুযোগে প্রভাবশালী নৌযান মালিকরা ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুমে যাত্রীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। শুধু মেঘনার ডেঞ্জার জোন নয়, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করে ঢাকা-বরিশাল রুটে রোটেশন পদ্ধতিতেও চলাচল করছে প্রভাবশালী মালিকদের দোতলা লঞ্চ। ঢাকা ও বরিশাল উভয় প্রান্ত থেকে বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট অনুযায়ী প্রতিদিন ৭টি করে লঞ্চ ছাড়ার কথা থাকলেও যাত্রীদের জিম্মি করে ঢাকা ও বরিশাল প্রান্ত থেকে ৪ থেকে ৫টি লঞ্চ পরিচালনা করা হয়। তাতে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি দক্ষ মাস্টার, সুকানি ও ড্রাইভার ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে ওই অঞ্চলের নৌপথে লঞ্চ চলাচল করছে।

সূত্র জানায়, বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নৌ-রুট ৮৮টি। তার মধ্যে ঢাকার সাথে সরাসরি নৌযান চলাচল করে ৪২টি রুটে। বাকি অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে চলে এমএল টাইপের একতলা ছোট লঞ্চ। সরকারি হিসাবে প্রতিদিন নৌপথে ওই অঞ্চল থেকে যাতায়াত করে প্রায় ২ লাখ যাত্রী। ওসব রুটে মাত্র শতাধিক লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে। তবে সেখানেও ট্যাক্স ফাঁকির জন্য যাত্রী পরিবহন কম দেখানো হয়। ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচলকারী সুরভী-৭ লঞ্চে বয়া আছে ১০৭টি। যাত্রী ধারণক্ষমতা ১ হাজার ২৫০ জন। কীর্তনখোলা-১ লঞ্চের ধারণক্ষমতা ৭১৫ জন। বয়া আছে মাত্র ১০০টি। নিয়ম অনুযায়ী ৪ জন যাত্রীর জন্য একটি করে বয়া থাকার কথা। কাগজে-কলমের হিসেবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল নেই। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে এমএল টাইপের একতলা লঞ্চগুলো চলাচল করছে দক্ষিণাঞ্চলের বড় নদীতে। তাছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী শতাধিক লঞ্চের মধ্যে অর্ধেক লঞ্চেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাস্টার-ড্রাইভার নেই। লঞ্চগুলো চালায় খালাসি ও হেলপাররা। অথচ ফিটনেস নেয়ার সময় অভিজ্ঞ চালক ও মাস্টারদের সনদ দেখিয়ে রুট পারমিট নেয়া হয়। খালাসি ও হেলপাররা লঞ্চ পরিচালনা করায় একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি লঞ্চের নির্মাণ ত্রুটি ও অদক্ষ মাস্টার-ড্রাইভার দ্বারা লঞ্চ চালাতে গিয়ে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটলেও কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। নেভিগেশনের অনুমোদন না থাকলেও রাতের অন্ধকারে নৌপথে বেপরোয়া পণ্যবোঝাই নৌযান চলাচল করতে গিয়ে দুঘর্টনা ঘটছে।

এদিকে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি (এনসিপিএসআরআর) হিসাবে বিগত ৫০ বছরে দেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী মিলিয়ে ২ হাজার ৫৭২টি অভ্যন্তরীণ নৌ দুর্ঘটনায় ২০ হাজার ৫০৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৬৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সংঘটিত ওসব নৌ দুর্ঘটনায় মানবসম্পদ ছাড়াও অস্থাবর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ২০ লাখ টাকার। মূলত নিরাপদ নৌপথ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হচ্ছে অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা। নৌ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে গঠনমূলক ও প্রত্যাশিত উন্নয়ন হচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনাও কমছে না। তবে লঞ্চ দুর্ঘটনার হার গত দু’বছরে কমলেও নিরাপদ আধুনিক নৌ পরিবহন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এখনো অনেক দূর। নৌ দুর্ঘটনা বৃদ্ধিও ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ হচ্ছে নদী খনন ও নৌপথের পলি অপসারণ। কিন্তু সেখানে চলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বিআইডব্লিউটিএর পুকুরচুরি।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com