২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

পথশিশুরা সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত হলে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে

নিজস্ব প্রতিবেদক ● পথশিশুদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা সম্ভব হলে এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশ আরও একধাপ এগিয়ে যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, পথশিশুরা সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের শেল্টার হোম ও সঠিক শিক্ষা দিয়ে পরিচর্যা করলে তারা আগামীর যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সবজি তোলা শ্রমিক রবিন মিয়া (১২)। দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। গত বছর থেকে সে একটি শেল্টার হোমে থাকছে। মা-বাবার পরিচয় নেই তার। রবিনের মতো আরো অনেক শিশু অযতœ ও অবহেলায় বেড়ে উঠছে। একটু সুযোগ দিলে তারা নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। এমন কথাই বলছিল রবিন। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় সে। কেননা ডাক্তাররাই কঠিন অসুখ সারিয়ে তুলে সমাজের উপকার করে।

রবিন জানায়, ‘এই শেল্টার হোমে আইসা অনেক আদব-কায়দা শিখছি। কম্পিউটারে গেইম খেলতে পারি। দাবা খেলাও শিখছি।’

বর্তমান সরকার পথশিশুদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় সামজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় তাদের দারিদ্রতা হ্রাস ও সামাজিক সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। এই কার্যক্রমের আওতায় রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কমলাপুরে দুটি শেল্টার হোম নির্মাণ করা হয়েছে। এ দুটি হোমে শ্রমজীবী পথশিশুদের থাকা-খাওয়া, বিনোদন ও শিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা রাখা হয়েছে।

গত এক বছরে প্রায় ৯শ’ শিশু এসব হোমে আশ্রয় নিয়েছে। পথশিশুদের উন্নয়নের মূলধারায় আনতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন এ হোম দুটির কার্যক্রম নিয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা।

২০১১ সালে প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল, সবার জন্য মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টিহীনতা কমানোসহ নানা কার্যক্রম। জাতীয় পুষ্টিনীতি ২০১৫-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সকলের পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়ন, বিশেষ করে শিশু, কিশোর, কিশোরী, গর্ভবতী ও ল্যাকটেটিং মায়েদের পুষ্টির উন্নয়ন। পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শেল্টার হোমগুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পুষ্টিকর খাবার দেয়া হচ্ছে।

পথশিশু পূণর্বাসন প্রকল্পের পরিচালক ড. আবুল হোসেন জানান, জরিপ অনুযায়ী রাজধানীতে প্রায় তিন হাজার পথ শিশু রয়েছে। এরা এক স্থানে থাকে না। স্থান বদল করে এরা বিভন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আমরা চেষ্টা করছি এসব শিশুদের একত্র করে তাদের কল্যাণে কাজ করার। কি কি কার্যক্রম গ্রহণ করলে তারা নিয়মিত শেল্টার হোমগুলোতে থাকবে এবং লেখাপড়া করতে উৎসাহিত হবে। তা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। গৃহীত পদক্ষেপটি সফল হলে দেশে আর কোন পথশিশু থাকবে না।

সম্পতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, দেশের দরিদ্র ছিন্নমূল পথশিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় এনে তার মন্ত্রণালয়ের আওতায় আনতে তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। এর আওতায় সারাদেশে ৯১টি শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। এছাড়া এসব শিশুদের আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করতে প্রাথমিক শিক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ৯টি শিশু কল্যাণ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে এতে। অন্যদিকে সকল উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রিচিং আউট স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে দেশের ১৪৮টি উপজেলায় ২১ হাজার ৭শ’ আনন্দ স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে। এর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী হত দরিদ্র পরিবারের।

তেজগাঁও শেল্টার হোমের পরিচালক ফোয়াদ বাবু বলেন, এ শেল্টার হোমে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন শিশু আশ্রয় ও আতিথেয়তা গ্রহণ করে। তারা কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছে। শৃঙ্খলা বজায় ও নেতৃত্ব শেখাতে তাদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচন করা হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও এসব শিশুদের উৎসাহী করা হচ্ছে।

ড. আবুল হোসেন জানান, কমলাপুরে ৬৬৯ জন এবং কারওয়ান বাজার শেল্টার হোমে ২১৭ জন সরকারের এ সেবা গ্রহণ করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পথশিশুরা অভিশাপ নয়, পরিস্থিতির শিকার। এসব শিশুর যতœ নিলে তারা দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে উৎসাহী হবে। পাশাপাশি মাদক ও নানা অসামাজিক কাজ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে। সঠিক পরিবেশে তাদের বেড়ে উঠতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com