সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন

পবিত্র মক্কায় প্রিয়জনের কাছে

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম

পবিত্র মক্কায় প্রিয়জনের কাছে

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আরবীতে একটা প্রবাদ বাক্য পড়েছিলাম,” শেফাউল কুলুবে লেকাউল মাহবুব”। প্রিয়জনের সাক্ষাত অন্তরে প্রশান্তি আনয়ন করে। অন্তরের ব্যাথা বেদনা দূর হয়। হৃদয়ে অনাবিল শান্তিতে ভরে যায়।

বিগত রমজানের আগে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে হসপিটালে ছিলাম, নানান পেরেশানীতে ছিলাম দিশেহারা। কোন কুল – কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।ঠিক সেই মুহূর্তে আমার প্রাণ- প্রিয় শায়েখ, ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ আসআদ মাদানীর খলিফা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেব আমাকে টেলিফোন মারফত সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। সাহস যুগিয়েছিলেন তিনি। বিভিন্ন নসীহতের মাধ্যমে আমাকে ধন্য করেছিলেন সেদিন।

বিগত কয়েকদিন যাবত বিভিন্ন পেরেশানীতে ভুগছি। সেই সাথে আমাদেরই এক আরাফাতী ভাই, আরাফার ময়দান থেকে ফিরে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। যার কারণে আরো বেশী কষ্ট অনুভব করছিলাম। মনটা যেন বেদনায় ভরে গিয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল পাহাড় সম বোঝা আমার মাথায়। বুকটা যেন বেদনায় ভরপুর।

আমার প্রিয় শায়েখ ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন, সেটা জানতাম অনেক আগের থেকে । কিন্তু কোথায় আছেন? সেটা তো ছিল আমার অজানা। মনটা ছটফট করছিল শায়েখের সাথে গিয়ে দেখা করি, কিন্তু মন চাইলে তো সম্ভব হয় না।

একে তো একটা ভিন দেশ। আবার হজ্জের সফরে কেউ বসে থাকে না। সব সময় কিছু না কিছু কাজ থাকেই। সে হিসেবে শায়েখের সাথে সাক্ষাতের সময় হয়ে উঠ ছিল না।

আজ সকালে বাসা থেকে বের হলাম। প্রথমে গেলাম মোয়াল্লিম অফিসে। যে কাজে গিয়েছি, মোয়াল্লিম অফিসে সেটার সমাধা হল না। অফিস কতৃপক্ষ বললেন, মক্কার বাংলাদেশ হজ্জ মিশনে যেতে হবে।

জোহরের আজান হয়ে গেছে। মোয়াল্লিম অফিসে নামাজ আদায় করে চলে গেলাম, বাংলাদেশ হজ্জ অফিসে। হজ্ব অফিসে ঢোকা মাত্রই সাক্ষাত পেলাম, আমার প্রিয় উস্তাদ মাওলানা ওয়াহীদুজ্জামান সাহেবের সাথে।

মাওলানা ওয়াহীদুজ্জামান সাহেব আমার অনেক প্রিয়। আমাকে দেখেই বললেন, আরে তুমি,,,,,,,,,,

আমার আর বুঝতে বাকী রইল না, আমার শায়েখ এখানেই আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, ফরীদ সাহেব হুজুর কোথায়?

ওয়াহীদুজ্জামান সাহেব বললেন, আমি তো হুজুরের পাশের কামরায় থাকি। চলো, চলো , হুজুরের সঙ্গে দেখা করে আসবে।

মনের মধ্যে এক বাড়তি অনুভূতি সৃষ্টি হল, এমনিতে মনটা ছটফট করছে কদিন ধরে। আর আজকে অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা হয়ে যাবে।

চলে গেলাম ওয়াহীদুজ্জামান সাহেবের কামরায়। পাশেই আমার শায়েখ ফরীদ উদ্দিন মাসঊদ কামরা। কিন্তু দরজা বন্ধ। হুজুর কি আছেন? নাকি হারাম শরীফে? তবে দরজা নক করার সাহস আমাদের কারো হল না।

মাওলানা ওয়াহীদুজ্জামান সাহেবের কামরায় বসে আছি, হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ। দেখলাম, শায়েখের রুম থেকে মাকনুন ( হুজুরের ছেলে) বেরিয়ে আসল। উঠে গিয়ে মাকনুন সাহেবের সাথে মোসাফাহা করলাম। বললাম, হুজুর কি আছেন? মাকনুন বললেন, আছে, তবে তিনি বিশ্রামে। দুপুরে খাওয়ার পরে কাইলুলাতে আছেন।

আমি আর বলতে সাহস পেলাম না এখন দেখা করব। কেননা, শায়েখের বিশ্রামের কোন ক্ষতি হোক, সেটা চাই না।

মাকনুন সাহেব আমার হালাত বুঝতে পারলেন, অনুমতি দিলেন। বললেন, ভিতরে যান। এখনো তিনি ঘুমাননি।

প্রথমে কিছুটা ইতস্তবোধ করছিলাম।কেননা একদম অপ্রস্তুত। সারাদিন রাস্তায় রাস্তায়। চেহারা, শরীর কেমন যেন উষ্কুখুষ্কু। আবার ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। নিজস্ব কোন গোছ- গাছ, পরিপাটি নেই। তবুও শায়েখের সাক্ষাতের জন্য মনটা আনচান করছে। আর এত কাছে পেয়েও যদি তাঁর সাথে দেখা না করি, তাহলে আফসোসের মাত্রা যেন আরো বেড়ে যাবে।

অনেক সাহস করে শায়খের কামরায় ঢুকে গেলাম। সালাম দিলাম। উত্তর দিলেন। আমি হুজু্রের খাটের নিচে বসে গেলাম। কিন্তু হুজুর বললেন, খাটের উপর বসুন, নয়তো চেয়ারে বসুন। হুজুরের নির্দেশ রক্ষার্থে রুমের মধ্যে একটা প্লাস্টিকের খালি চেয়ারে বসে পড়লাম।

খানিক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম শায়েখের দিকে। এরপর রুমের ভিতরের দিকে তাকালাম। সব কিছু দেখতে থাকলাম।

একদম সাদামাটা সব কিছু। কোন আড়ম্বরী নেই। সাধারন একটা ষ্টীলের চৌকিতে শুয়ে আছেন তিনি। একজন ইসলামী বিশ্বের স্কলার।অল মুসলিম বিশ্বের একজন স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব হলেন আল্লামা মাসঊদ। তাঁর এই সাদাসিধে জীবন যাপন আমাকে হতবাক করল।

অথচ আল্লামা মাসঊদ সাহেবের যে খ্যাতি, তিনি মক্কার নামী – দামী হোটেলে থাকতে পারতেন। কিন্তু সে সব ত্যাগ করে একদম সাদামাটা হোটেলেই সময় পার করছেন।

হুজুর আমার হালাত জিজ্ঞেস করলেন। খোঁজ খবর নিলেন। আমিও হুজুরের হালাত জিজ্ঞেস করলাম।

কিন্তু বেশীক্ষন আর অবস্হান করতে পারলাম না। আমার মোবাইলে ফোন এসে গেল। এক্ষুণি বের হতে হবে। যে কাজে গিয়েছি, এখন না বের হলে আর সম্ভব হবে না।

মনে চাচ্ছিল না যে, শায়েখের দরবার থেকে বের হই। কিন্তু এক বড় আমানত দারী ছিল আমার কাঁধে। তাই বের হতে হল।

মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের সাক্ষাত। কলিজাটা ভরে গেল আমার। অনেক অনেক গ্লানি দূর হলো অন্তর থেকে। আবার নতুন করে কিছু ভরে গেল। এক অনন্য তৃপ্তি আস্বাদন করলাম।

শায়েখের দরবার থেকে ফিরে মনে পড়ছে শুধু তাঁর কথা। তাঁর হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা। আবেগময়ী প্রেম।

আমি যেন আজ ধন্য।

পরিশেষে শায়েখের জন্য দুআ কামনা করি,আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সুস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ হায়াত দান করেন। তাঁর ছায়া আমাদের মাঝে বুলন্দ করেন।আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com