মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৪১ অপরাহ্ন

পরিবর্তন চাই ওয়াজ মাহফিলের আয়োজকদের মানসিকতাও

পরিবর্তন চাই ওয়াজ মাহফিলের আয়োজকদের মানসিকতাও

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : সেদিন এক জায়গায় ওয়াজ শুনতে গেলাম। ঢাকা থেকে অনেক নামী- দামী বক্তা এসেছেন। মাশাআল্লাহ, ওয়াজ মাহফিল ও বেশ ভাল জমে ছিল। ময়দান ভরে গিয়ে ছিল স্রোতাদের আগমনে।

আয়োজকগণ তো অনেক খুশি। চেহারার মধ্যেই খুশি প্রকাশ পাচ্ছে। কিছু পাবলিক তো সভাপতি সাহেবের ভুয়সী প্রসংসা করলেন। সভাপতি সাহেব প্রসংসায় যেন আরো একটু উপরে উঠে গেলেন!

আগামী বছর ওলীপুরী সাহেবকে আনতে চাই, হেলিকপ্টারে আসবে, আবার হেলিকপ্টারে চলে যাবে!

পাবলিক তো আরো কিছু প্রশংসার বানী ছুড়ে দিলেন, সভাপতি সাহেব টাকা- পয়সা যা লাগে সব দিতে প্রস্তুত। শুধু বক্তা চাই। যাতে অত্র জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রোগ্রাম হয়!

এরকম সভাপতির মত বহু মানুষ ছড়িয়ে- ছিটিয়ে আছেন দেশব্যাপী। তাদের বক্তব্য টাকা কোন ফ্যাক্টর না, বক্তা চাই। কত টাকা লাগবে? সব দেব, তবু অমুককে চাই! অমুককে চাই!

যারাই আজকাল ওয়াজ মাহফিল এর ব্যবস্হা করছেন, অধিকাংশ আয়োজকগণের নিয়তের ভিতর গড়বড়ি। সবার মধ্যে এখন লৌকিকতা কাজ করছে।
কেউ যদি কোথাও ওয়াজ মাহফিল দেয়, সঙ্গে সঙ্গে পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকদের মধ্যে জযবা ওঠে। আমরাও বিশাল এক মাহফিল দেব। যাতে ওদের থেকে লোক বেশী হয়।

অধিকাংশ আয়োজকগণের এখন শোডাউন উদ্দেশ্য। লোক জড়ো করা। বাহবা কুড়ানো! আমরাও পারি! ওরা আর কি? ওদের থেকে আমাদের মাহফিলে শ্রোতা বেশী হয়েছে।

আল্লাহর সন্তুষ্টি, হেদায়েত পাওয়ার নিয়ত, ইসলাহ হওয়ার নিয়ত, মানুষকে সহী পথে আনার মন- মানসিকতা, এসব চিন্তা- চেতনা খুঁজে পাওয়া দুস্কর।
আমরা বক্তাদের দোষারোপ করি, অমুক বক্তা হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। কারো নাম তো আমরা হেলিকপ্টার হুজুর রেখে দিয়েছি! আবার বলি, অমুক বক্তা এত টাকা নেয়। এর কম তাকে দেওয়া যায় না।

দেখুন! বক্তাদের এসব চরিত্রেরর পিছনে আয়োজকগণেরই সবচেয়ে বেশী অবদান। কোন বক্তাই কিন্তু বলে না আমাকে হেলিকপ্টার দিতে হবে। বরং আমরা শোডাউন করার জন্য বক্তা খুঁজতে থাকি।

বেচারা বক্তার তো কিছু নিয়ম আছে। সে তো একা মানুষ। কয়টা প্রোগ্রাম বা করবে?।

বক্তা যখন রাজি না হয়, তখনই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অফার করা হয়। হেলিকপ্টারে আনা- নেওয়া কথা বলা হয়। আবার তাকে বিভিন্ন ভাবে প্রেসার দেওয়া হয়ে থাকে। অথবা কোন উপরস্হ ব্যক্তি বর্গের মাধ্যমে করা হয় সুপারিশ। পরিশেষে নিরুপায় হয়ে বক্তা দাওয়াত কবুল করেন।

হেলিকপ্টার দেয় পাবলিকে। আর নাম পড়ে যায় বক্তার। টাকা দেয় মাহফিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বদনাম গিয়ে পড়ে বক্তার ঘাড়ে।

মানে যত দোষ হুজুরদের। পাবলিক যে লোক দেখানোর জন্য বক্তাকে হণ্যে হয়ে খুঁজে বেড়ান আর বিভিন্ন লোভনীয় অফার দেন, সে কথা কিন্তু কেহ বলেন না।

বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিলকে আমরা ব্যবসা বানায়ে ফেলেছি। এখন ওয়াজ মাহফিল হয়, কালেকশনের নিয়্যতে। ওয়াজ মাহফিলটা কালেকশনের একটা মাধ্যম।

ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা চাষ দেওয়া হয়ে যায়, আবার কোন কোন বক্তা আনা হচ্ছে শুধু কালেকশন করার জন্য। ওসব বক্তাদের নামই কালেকশনের বক্তা। ওনারা মঞ্চে উঠে যেন স্রোতাদের জাদু করে ফেলেন! কেউ তো এমন এমন আজগুবি কেচ্ছা- কাহিনী বলে টাকা আদায় করেন, যা বড় দুঃখজনক। অনেক কথা এবং কাজ তারা করেন, যা কুরআন হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক।

এসব লাইন ছাড়া কথা- বার্তা, আর সুরের মোহনা দিয়ে, এবং বিভিন্ন ফজীলতের বানী শুনায়ে স্রোতাদের বশে এনে টাকা চাওয়া হয়। কালেকশন হয়ে যায় জবর কালেকশন। লক্ষ লক্ষ টাকা, জমি,ইট, সিমেন্ট – বালু, এমনকি স্বর্ণালাংকার পর্যন্ত কালেকশন হতে দেখা যায়। এসব কালেকশনের বক্তাদের কর্তৃপক্ষ মোটা অংকের হাদিয়া দেন।

এরকম নানাবিধ ফায়দা হাসিলের জন্য এবং প্রভাব বিস্তারের জন্য আজকাল ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। আয়োজকগণের বিশুদ্ধ নিয়্যাত পাওয়া মুশকিল। অধিকাংশ জায়গাতেই নিয়্যাতে ঘুন লেগেছে। হেদায়েতের নিয়্যাত, ইসলাহের নিয়্যাত এখন আর দেখা যাচ্ছে না কারো। যার কারণে ওয়াজ মাহফিল থেকে আজ যেন রুহানিয়্যাত উঠে গেছে।

ওয়াজ মাহফিল আছে আগের মতই। কিন্তু মাহফিলে কি যেন নেই। স্রোতাদের উপকারে আসছে খুবই কম।

আয়োজকদের নিয়্যাত উল্টা – পাল্টা, সেই সাথে কিছু বক্তার তো আছেই।

এজন্য আয়োজকগণের নিয়্যাত পরিশুদ্ধ হওয়া চাই। লৌকিকতা নয়। মানুষকে দেখানোর জন্য ওয়াজ মাহফিল নয়। কোন শোডাউন নয়। ওয়াজ মাহফিল হেদায়েতের উদ্দেশ্যে হোক, এটাই কামনা।

আল্লাহ আমাদের সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com