২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং , ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৮শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতা আর নয়

ফিরে দেখা। সেলিনা আক্তার

পরিবারে নারীর প্রতি সহিংসতা আর নয়

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারীর ক্ষমতায়নের ইতিবাচক চিত্র আজ সর্বজনস্বীকৃত। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে শুরু করে শিক্ষা, মহিলা ও শিশু, পররাষ্ট্রসহ আরো কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। মহান জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদের উপনেতা ও বিরোধীদলীয় নেতাও নারী। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সঠিক পদক্ষেপ এবং উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়েছে। কেননা নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু নারীর অধিকারকেই ক্ষুণœ করে না, বরং মানবতা, অর্থনীতি, সমাজসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকেই বাধাগ্রস্ত করে। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণে দেশ-কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তাই এর প্রতিকারও করতে হবে সংস্কৃতি ও মানসিকতার অবস্থাকে লক্ষ্য রেখে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সহিংসতার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে-কোনো প্রকার কাজ বা আচরণ যার ফলে নারী শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা এ ধরনের ক্ষতি সাধনের জন্য হুমকি দিলে, নারীর স্বাধীনতা খর্ব করলে, স্বাধীন মনোবৃত্তির বিকাশ থেকে বঞ্চিত করলে তাকে নির্যাতিত বা সহিংসতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশের নারীর প্রতি সহিংসতার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে-সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্বলতা, দারিদ্র্য ও বাসস্থানের অভাব এবং সহিংসতা প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর ওপর পারিবারিক নির্যাতনকে খুব সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। ফলে বর্তমানে তা সহিংসতার আকার ধারণ করেছে। যৌতুকের জন্য নারীর ওপর নির্যাতন; বাল্যবিয়েতে বাধ্য করা; স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা সহ; স্বামী, শাশুড়ি ও পরিবারের অন্যদের নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা; শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাসহ আরো নানাভাবে নারীরা নির্যাতিত হয়ে থাকে। গৃহ-রাস্তাঘাট-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শপিংমল, অফিস এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে না। শিক্ষিত-অশিক্ষিত অধিকাংশ নারীই কোনো-না-কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

নির্যাতনের পরিণতি হচ্ছে পঙ্গুত্ব। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, লজ্জা ও অপমানে আত্মহত্যা, সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অনেক ক্ষেত্রে চরম পরিণতি মৃত্যু। এটা যে-কোনো জাতি ও সমাজের পক্ষে শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথেও অন্তরায়। অতীতের চেয়ে দিনে-দিনে নির্যাতনের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এতটাই অমানবিক ও পৈশাচিক যে, ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। মানুষ তার রূপ এতটাই আক্রমণাত্মকভাবে প্রকাশ করে, যা আদিম যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। পত্রিকা খুললেই প্রতিদিন চোখে পড়ে নারী নির্যাতনের ঘটনা। ঘরে বাইরে কোথাও নারী আজ নিরাপদ নয়।

পারিবারিক নির্যাতনের কারণ আমাদের সংস্কৃতি-যা কখনোই নারীকে পুরুষের সমান ভাবতে দেয়নি। পরিবারে মানিয়ে চলা, নানা বিষয়ে সহ্য করা পরিবারের সম্মান রক্ষা করা-এসব কিছু নারীকেই করতে হয়। শিশু বয়স থেকেই অত্যাচার, লাঞ্চনা, অপমান ও অবহেলা সহ্য করার মতো অনেক বিষয়কেই তাদের নিয়তি বলে মেনে নিতে হয় আর এই দুর্বলতার সুযোগে পুরুষরা তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি তিনজনের একজন নারী তার সঙ্গীর দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত নারীর প্রতি সহিংসতা সর্বশেষ জরিপ ২০১৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে শতকরা ৮২ ভাগ বিবাহিত নারী তাদের স্বামীর হাতে কোনো-না-কোনো সময়ে কোনো-না-কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩ শতাংশ নারী স্বামী ব্যাতীত অন্য কারো মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বিবাহিত নারীর চেয়ে অবিবাহিত নারীরা এ নির্যাতনের শিকার হন বেশি। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের প্রায় ৪০ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৭ শতাংশ নারী জানিয়েছেন নির্যাতনের কারণে ৫৬ শতাংশ নারীই আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৬১ জন নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। লোক লজ্জার ভয়, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি কারণে নারী মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করে। গর্ভবতী নারীও এ রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন থেকে মুক্তি পায় না। এতে মা ও শিশু উভয়েই মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার শিকার হন। একটি জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি চারজনে একজ মহিলা গর্ভকারীন নির্যাতনের শিকার হন। ১৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর কারণ গর্ভকালীন নির্যাতন, ৫০ শতাংশ হত্যার কারণ হলো যৌতুক। সেবাদানকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, গর্ভকালীন অনেক নারী কোনো-না-কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয় যা সত্যিই দুঃখ ও লজ্জাজনক।

এই ধরনের অত্যাচার থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে সচেতনভাবে। অত্যাচারিত নারীর পাশে নারীদেরই দাঁড়াতে হবে। নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষাগ্রহণ করা, স্বাবলম্বী হওয়া নারীকে সাহস ও শক্তি জোগাবে। প্রতিদিন নিজেকে অপমানিত হতে দেওয়া, অন্যায় সহ্য করা, জীবনকে অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করা নয়। সমাজের কুসংস্কার উপড়ে ফেলতে হবে। এসব পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হতে হবে নারীদের।

নির্যাতন বন্ধে নারীর পাশাপাশি পুরুষদেরও নিতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। নারীর প্রতি সকল প্রকার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। নারীর প্রতি পুরুষদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন করতে হবে। নারীদের সহযোগী ও বন্ধু ভাবতে হবে। ধর্মীয় গোঁড়ামী ও ভুল ধারণা দূর করতে হবে। বিষয়গুলো পুরুষরা যদি ভালোভাবে মেনে নেয় তাহলে সহিংসতা অনেক কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০ অনুযায়ী পারিবারিক সহিংসতা বলতে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন কোনো ব্যক্তির দ্বারা পরিবারের ওপর কোনো নারী বা শিশু সদস্যের ওপর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন অথবা আর্থিক ক্ষতি সাধন করাকে বুঝায়। এই আইনের কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট অপরাধী ছয় মাসের কারাদ- বা ১০ হাজার টাকা অর্থ দ- বা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা দমনে সরকার বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার নিরলসভাবে নারীদের মূলধারায় আর্থসামাজিক কর্মকা-ে সমান এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ করানো এবং ক্ষমতায়নের অন্তরায়সমূহ দূর করার মাধ্যমে নারীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছে। নারীর প্রতি সব রকমের বৈষম্য দূরীকরণের নিয়মপত্র (CEDAW) এবং বেইজিং প্লাটফর্ম ফর অ্যাকশন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর।

কন্যা, জায়া, না হয় জননী, যে-কোনো নারীর পরিচয়ই এই তিনটি সূত্রে গাঁথা। নিজ গৃহে কিংবা কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। সহকর্মী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাবতে হবে। যে-কোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবশ্যই নারীর মতামত বিবেচনা করতে হবে। সহিংসতার আকার যেমন হোক না কেন, তা প্রকৃত অর্থে সমগ্র মানবতার জন্য কলঙ্ক। আমাদের প্রত্যাশা, যথার্থ সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং সুশীল সমাজের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হোক। কেননা সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা সম্ভব বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com