২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৫ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

পরিবেশ আন্দোলনের দার্শনিক মাত্রা ও ইসলামপন্থী রাজনীতি

পরিবেশ আন্দোলনের দার্শনিক মাত্রা ও ইসলামপন্থী রাজনীতি

শেখ ফজলুল করীম মারুফ : বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিপদজনক বিষয় হলো জলবায়ুর পরিবর্তন। জলবায়ুর পরিবর্তন মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। এমন অবস্থায় পরিবেশ আন্দোলন অত্যন্ত জরুরী একটি আন্দোলন। বিশ্বের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তির পরিবেশ আন্দোলনে মনোযোগ দেয়া দরকার। বিশেষত ইসলামপন্থীদের পরিবেশ আন্দোলনে গুরুত্ব দেয়া উচিৎ।
পরিবেশ আন্দোলনের অনেকগুলো মাত্রা হতে পারে।

১. প্রাথমিক ও প্রতিরক্ষা মাত্রা। বৃক্ষরোপন, বনায়ন, নদীর আবর্জনা পরিস্কার, দখলকৃত খাল-বিল-নদী উদ্ধার ইত্যাদি। পরিবেশ দূষণকারী যেকোন প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলাও এই মাত্রার অন্তর্ভুক্ত।
২. জনসচেতনতা মাত্রা।

মানুষকে পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সতর্ক করা। যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, Surface Water এ ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, অপ্রয়োজনে গাছ না কাঁটা, কাঁটলেও নতুন একটি লাগানো, পানির ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া, যেকোন শিল্প উদ্যোগে পরিবেশের প্রতি লক্ষ রাখা ও পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বয়কট করা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।

৩. নীতিগত মাত্রা।

রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে পরিবেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ প্রয়োগ করা।

৪. আইনগত মাত্রা।

সুনির্দিষ্টভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধে সুস্পষ্ট ও হালনাগাদ আইন প্রনয়ন ও তার প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্রের ওপরে চাপ প্রয়োগ করা।

৫. দার্শনিক মাত্রা।

বিগত কয়েক শতাব্দিতে বিশ্ব ভয়ংকর পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়ার মুল কারণ এই দার্শনিক মাত্রায় ভুল করা। পশ্চিমা সভ্যতার রাজত্বকালে পৃথিবী পরিবেশগতভাবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় চলে গেছে। পশ্চিমা সভ্যতা দৃশ্যমান উন্নতির নামে পৃথিবীকেই ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে নিয়ে এসেছে।

কেন পশ্চিমা সভ্যতার রাজত্বকালে পৃথিবী এই বিপর্যয়ের শিকার হলো? এর কারণ পশ্চিমা সভ্যতার দার্শনিক ভিত্তি। সবাই জানে পশ্চিমা সভ্যতা হলো প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার উত্তরাধিকারী সভ্যতা। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় প্রকৃতিকে দেখা হতো মানুষের শত্রু হিসেবে। প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক হলো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক। মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হতো। প্রাচীন গ্রিক মিথোলজি পড়লেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে।

যে সভ্যতা প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক সম্পর্কের বিশ্বাস নিয়ে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছে তারা তো তাদের জ্ঞান দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করতে চাইবেই। পশ্চিমা সভ্যতা সেটা করেছেও। তারা নিজেদের কথিত ভালো থাকার জন্য প্রকৃতির ওপরে সীমাহীন নির্যাতন করেছে। তারা আফ্রিকা জয় করার পরে আফ্রিকার বহু বন্য প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কেবল তাদের প্রসাধনীর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে। বর্তমানেও পরিবেশ দুষণকারী শীর্ষ তালিকা দেখলে দেখতে পাবেন তাতে পশ্চিমা দেশ ও তাদের দর্শনে বিশ্বাসী দেশগুলোই শীর্ষে রয়েছে। কারণ তারা তাদের অবচেতনে ও দর্শনে পরিবেশকে শত্রু জ্ঞান করে।

এর সাথে যোগ হয়েছে ভোগবাদী পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ তার পুঁজির স্বার্থে মানুষের মাঝে কৃত্রিম অভাববোধ তৈরি করেছে এবং তা পূরণ করতে গিয়ে প্রকৃতির সর্বনাশ করছে।

পরিবেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পশ্চিমা সভ্যতার এই সর্বনাশা দর্শনের বিপরিতে #ইসলাম দিয়েছে চমৎকার দর্শন।

ইসলাম প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করেছে “প্রতিপালনের সম্পর্ক”। প্রতিপালন হলো, কোন বস্তুকে পর্যায়ক্রমে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর উদ্দেশ্য বর্ণনায় বলেছেন, তিনি মানুষকে তার খলিফা বা প্রতিনিধি করে পাঠাচ্ছেন।

“আল্লাহর প্রতিনিধি” হওয়ার অর্থ কি?

আমরা জানি মহান আল্লাহ তায়ালার অনেকগুলো গুণবাচক নাম আছে। সেই গুণগুলোর কোন কোনটা একান্তই তার জন্য নির্দিষ্ট। আর কিছু গুণ যা তিনি মানুষের মধ্যেও দিয়েছেন। মানুষ সেইসব গুণাবলীতে পৃথিবীতে আল্লাহ প্রতিনিধিত্ব করবে।

আল্লাহর একটি গুণ হলো, তিনি সারা জগতের প্রতিপালক। এই প্রতিপালনের গুণ আল্লাহ মানুষের মাঝেও দিয়েছেন। ফলে বিশ্বকে বা প্রকৃতিকে প্রতিপালন করার ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। ইসলামের বহু নির্দেশনার মাঝে প্রকৃতির প্রতি এই প্রতিপালনের চরিত্র বিদ্যমান।

প্রকৃতির সাথে পশ্চিমা সভ্যতার সর্বনাশা সাংঘর্ষিক সম্পর্কের মোকাবিলায় ইসলামী সভ্যতার এই প্রতিপালনের সম্পর্কই এখন বিশ্বকে রক্ষা করতে পারে।

ইসলামপন্থীদের পরিবেশ আন্দোলনের এই দার্শনিক মাত্রাকে সামনে নিয়ে আসা উচিৎ। এবং পশ্চিমা সভ্যতার খপ্পর থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করতে এখনি প্রতিপালকের ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসা উচিৎ।
#পরিবেশ_আন্দোলন ইসলামপন্থী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠুক এই প্রত্যাশায়…..।

লেখক : সাবেক সভাপতি, ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com