২৩শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং , ৯ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৯ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

পাকিস্তানি সেনা অপসারণ চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী

মহান বিজয়ের মাস

পাকিস্তানি সেনা অপসারণ চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী

সিদ্দিকুর রহমান : বছর পরিক্রমায় আবারও এসেছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। কোটি মানুষের হৃদয়ে এই ডিসেম্বর আসে অফুরন্ত প্রেরণা, প্রতিজ্ঞার বার্তা নিয়ে। প্রতিকূল পরিস্থিতিকে পরাজিত করে সুন্দর, সত্যের পথে লড়াইয়ের সঞ্জীবনী শক্তি লুকিয়ে রয়েছে এই ডিসেম্বরে। ‘বাংলাদেশ’ রাষ্ট্রের পরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার চূড়ান্ত বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। সেই অনন্য অর্জন অন্যদিকে এই ডিসেম্বর স্বজন হারানোর মাস। ৩০ লাখ প্রাণ ও অসংখ্য নারীর সম্ভ্রম হারানোর বেদনা মিশে আছে এই বিজয়ের ক্ষণে।
আজ পহেলা ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই সময়ে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সর্বাত্মক রূপ পায়। পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। সারাদেশে চলতে থাকে ব্যাপক যুদ্ধ।

১৯৭১ সালে এই দিনে নিউইয়র্ক টাইমসের পত্রিকার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধি পাবার ফলে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের নির্দেশে সামরিকবাহিনীর লোকেরা পুনরায় গ্রামবাসীদের হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার বর্বর অভিযান শুরু করেছে। গেরিলা সন্দেহে জিঞ্জিরার কতজন যুবককে যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ের এই গ্রামটিতে অন্তত ৮৭ জনকে সামরিকবাহিনীর লোকেরা হত্যা করেছে। এদের অধিকাংশই যুবক। নারী ও শিশুরাও ওদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।

এদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পার্লামেন্টের উচ্চ পরিষদে বক্তৃতাকালে উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণই সমস্যার শ্রেষ্ঠ সমাধান। এই বক্তৃতায় তিনি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের জনসাধারণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ নয় মাস পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। পাকিস্তানি শাসন থেকে মুক্ত হওয়া এই মহান বিজয়ের মাস একদিকে যেমন পরম আনন্দের, একই সঙ্গে স্বজন হারানোর শোকার্ত মাসও। এবারের ডিসেম্বরের মাস উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিজয়ের ৪৮ বছর পূর্ণ হবে। এ মাসেই জাতির বহু ত্যাগের ফসল হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণ হয়। তাছাড়া, ডিসেম্বর মাসেই চূড়ান্ত বিজয়ের দুই দিন আগে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও তাদের দোসর রাজাকার আল-বদরদের হাতে শহীদ হন দেশের বুদ্ধিজীবীরা। বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি সেসব শহীদ বুদ্ধিজীবীর প্রতি এ মাসেই কৃতজ্ঞ জাতি গভীর শ্রদ্ধা জানাবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা আর ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং এর মধ্য দিয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আর জাতি অর্জন করে স্বপ্নের স্বাধীনতা। এর আগে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের সোপান বেয়ে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এ ঘোষণার পরপরই গোটা জাতি মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ‘৭১ -এর ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর অতর্কিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭১’ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হবার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে ১৬ ডিসেম্বর জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com