২৭শে মে, ২০২০ ইং , ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

পালিয়ে যাবেন কই | মুহাম্মদ আইয়ূব

পালিয়ে যাবেন কই

মুহাম্মদ আইয়ূব ❑ ‘সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই হতে,তার মা ও বাবা হতে,তার স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে।সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন গুরুতর অবস্থা হবে যা তাকে সম্পুর্ণরূপে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।’ [সূরা আবাসা- ৩৪-৩৭]

এই আয়াতগুলো নিয়ে এক জুম্মায় যখন বয়ান করছিলাম, তখন সেক্রেটারি সাহেব বয়ানের মাঝেই বলে উঠলেন, আমি আমার বাবা থেকে পলায়ন করব?!! আমি বললাম কুরআন তো তাই বলে। নিশ্চয়ই এমন হবে কেয়ামতের দিন। কেয়ামত আমরা দেখিনি তবে করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় সূরা আবাসার এই আয়াতগুলোর বাস্তবতা ও ভয়াবহতা আজ আমরা স্বচক্ষে  দুনিয়াতে বসেই দেখতে পাচ্ছি। নমুনা হিসেবে কয়েকটা বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

আল মারকাজুল ইসলামীতে আমার এক বন্ধু আছে রুকন মিসবাহ নামে। সে বলল গতকাল আমরা দুইটি লাশ দাফন করেছি অথচ অভিভাবক পাইনি।হাসপাতালে রেখে সটকে পড়েছে। আজ সারাদিন ফেসবুকে একটা ছবি ভাইরাল হয়েছে যে, পুলিশ বাহিনীর কয়েক ভাই মিলে একটা লাশের জানাযা দিয়ে  দাফন সম্পন্ন করছেন। অভিভাবক আর আত্মীয় স্বজনরা লাপাত্তা। কি আশ্চর্য! আল্লাহ পাক সূরা আবাসার উল্লেখিত আয়াতগুলোতে আখেরাতের কথা বলেছেন, অথচ আজ করোনা ভাইরাস দুনিয়াতেই আখেরাত নামিয়ে এনেছে। তাই মসজিদের সেক্রেটারী সাহেবের কথা আজ খুব মনে পড়ছে।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহা পরিক্ষা থেকে মুক্তি দান করুন।

প্রিয় পাঠক! কেয়ামত দিবস কিন্তু এখনো আসেনি অথচ আজ আমরা দেখছি যে, আমরা সবাই কেমন আজিব ধরনের  স্বার্থপর! নইলে অসুস্থ ব্যাক্তিকে আমরা কি করে ভুলে যেতে পারি? তাকে এড়িয়ে চলি? আর যাই বলুন স্বার্থপর যারা তারা কিন্তু কোন মানুষের কাতারে পড়তে পারে না। আবার  কুরআন ও হাদিস পড়লে বুঝা যায়  স্বার্থপরের কোন স্থান আল্লাহ রাসূলের কাছে ও নেই। অসুস্থ ব্যক্তির সেবা শুশ্রূষার কথা স্বয়ং মহানবী (সা.) খুব গুরুত্বের সাথে উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন।

পরবর্তীতে যখন মুসলমানরা বদর যুদ্ধে বিরাট জয় লাভ করলেন তখন হুজুর (সা.) হযরত উসমান (রা.)-কেও বদরীদের মাঝে শামিল করলেন এবং গণীমতের অংশ তাঁকেও দিলেন।

ইসলামের প্রথম জিহাদ বদর। অথচ বদর যুদ্ধের মত আজিমুশ্বান জিহাদে হযরত উসমান (রা.)-এর মত মহান সাহাবী কেন শরীক হতে পারেননি জানেন? তাঁর স্ত্রী হযরত রুকায়্যাহ (রাযি.) অসুস্থ থাকার কারণে। হুজুর (সা.) হজরত উসমান (রা.)-কে বললেন তুমি তোমার স্ত্রীর পাশে থেকে তার সেবা যত্ন কর, এতেই তুমি জিহাদের সওয়াব পেয়ে যাবে। পরবর্তীতে যখন মুসলমানরা বদর যুদ্ধে বিরাট জয় লাভ করলেন তখন হুজুর (সা.) হযরত উসমান (রা.)-কেও বদরীদের মাঝে শামিল করলেন এবং গণীমতের অংশ তাঁকেও দিলেন।

কি বুঝলেন পাঠক? অসুস্থ ব্যক্তিকে ঘরে আবদ্ধ রেখে নিজে এলাকাছাড়া হয়ে যেতে হবে? যদি করোনা ধরে ফেলে?! সুতরাং কারো সংস্পর্শে আসা যাবে না। খুব ভাল কথা, তাই বলে অসুস্থ ব্যক্তির পাশে দাঁড়াতে কে বারণ করল? এবার তাহলে আমার প্রশ্ন, বরিস জনসন, প্রিন্স চার্লস আর সোফিয়া ট্রুডোরা তো ভিভিআইপি ব্যাক্তিবর্গ। তাদের মত সিকিউরিটি ঘেরা আর সতর্ক মানুষ দুনিয়া পাওয়া মুশকিল; তারা তো ধরা খেল করোনার হাতে। তাই তারা যখন বাঁচতে পারলনা, ধরা খেয়ে গেল তখন আমি আপনার মত বদু সদুরা মহান আল্লাহর কৃপা ছাড়া পার পেয়ে যাব  এটা আপনি কি করে ভাবলেন?

ভাই, মালিকের দয়া ছাড়া কেউই আমরা পার পাব না, ঠিক তবে অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করে তাঁর কাছে কিন্তু একটা উসিলা দাঁড় করানোর সুযোগ অবশ্যই আমাদের সামনে আছে। তাই আমরা আতংকিত না হয়ে পরিবার ও প্রতিবেশীর যে বা যারা অসুস্থ হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াই। এতে ফলাফল কি হবে? মহানবী (সা.) অসুস্থ ব্যক্তির সেবা শুশ্রূষার যে ফজিলত ও নেয়ামতের কথা বলেছেন তা সহজেই আমরা পেয়ে যাব ইনশাআল্লাহ। যেমন-

১। হযরত আবু মুসা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,ক্ ষুধার্তকে খাবার দাও,অসুস্থ ব্যক্তির দেখাশুনা কর এবং বন্দীকে মুক্ত কর। [মেশকাত শরীফ,হাদিস নং:১৪৩৭]

২। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল(সা.) বলেছেন, এক মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের জন্য পাঁচটি হক রয়েছে- সালামের উত্তর দেওয়া, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, জানাজার নামাজে শরিক হওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা এবং হাঁচির উত্তর দেওয়া। [বুখারী ও মুসলিম, মেশকাত শরীফ হাদিস নং ১৪৩৮]

৩। হযরত ছাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন কোন মুসলমান যখন তার অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায় তখন সে ফিরে আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল বাগানে বিচরণ করতে থাকে। [মেশকাত শরীফ হাদিস নং ১৪৪১]

সুতরাং এবার সিদ্ধান্ত আপনার। একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে বিলীন করবেন, নাকি চাচা আপন জান বাঁচার মত স্বার্থপর হবেন। অবশ্য পালিয়ে যাবেন কই? আমি এখন মুন্সিগঞ্জ জেলার  টংগীবাড়ির বালিগাঁওয়ে আছি। সুতরাং টংগীবাড়ি বা লৌহজংয়ে এমন কেউ যদি থাকে যে করোনায় আক্রান্ত, অথচ তাকে সেবা দেওয়ার কেউ নাই, ভয়ে কেউ তার আশপাশে যাচ্ছে না, কিংবা কেউ মরে গেছে কিন্তু কেউ ভয়তে তাকে দাফন কাফন দিচ্ছে না। তাহলে দয়া করে আমাকে জানাবেন। [মোবাইল- ০১৭৮২ ৬২৬৬৫৬]

রাত হোক বা দিন ইনশাআল্লাহ আমি যে করেই হোক উপস্থিত হব। দেশ ও জাতীর খেদমতের সুযোগ সব সময় আসে না। যখন আসবে তখন হাসিমুখে ঝাপিয়ে পড়া আমার নীতি। তাই বিপদসংকুল অবস্থা যতই কঠিন হোক আমি আমার নীতিতে অটল থাকতে চাই।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com