২৩শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১০ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি

প্রকৃত মুসলিম | ফয়জুল্লাহ আমান

ফয়জুল্লাহ আমান ● ইসলাম অর্থ আত্মসমর্পণ। নিজেকে মহান মালিকের কাছে সঁপে দেওয়া। প্রবৃত্তিকে দমন করে পরিশুদ্ধি অর্জন ও শুভ্র শুদ্ধতায় অবগাহন একজন প্রকৃত মুসলিমের কর্তব্য। প্রভাতের নির্মল সূর্য কিরণের মত শুভ্রতা। বছরের প্রথম বৃষ্টিফোটার মত যা হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। বসন্তের দখিনা হাওয়ার মত স্নিগ্ধতায় ঘিরে রাখে সব সময় আত্মা।

আমি মুসলিম, এই অনুভূতি অনেক বড় এক শক্তি। কেবলই প্রত্যাশা আর আলো। এখানে অন্ধকারের ছোঁয়া নেই। নেই কোনো হতাশার কষ্ট। ইসলাম মানে আলোকিত মনন। ইসলাম মানে সচ্ছতা। আবিলতামুক্ত প্রশান্তি। আত্মার সুখ। অন্তরের প্রাচুর্য। উপলব্ধির বিশালতা। ইসলাম মানে জীবনকে অন্যরকম পবিত্রতায় উপভোগ করা।

তুমি অন্ধকার দেখেছ। মেঘে ঢাকা রাত দেখেছ। নক্ষত্র শূন্য রাতের চেয়েও অন্ধকার যে রাত্রি, ইসলাম-শূন্য জীবন সেই তিমিরাচ্ছন্ন পৃথিবীর মতই এক ধ্বংসগহ্বর। যখনই তুমি ইসলামকে ধারণ করতে পারবে, দেখবে কীভাবে চারপাশটা আলোকিত হয়ে যাচ্ছে। গুমোট ভাবটা কীভাবে দূর হয়ে যাচ্ছে। বদ্ধ অর্গলের কপাটগুলো একে একে খুলে যাচ্ছে।

এই উজ্জ্বল আলোয় পৃথিবীর সবার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি মানুষ চাতক পাখির মত চেয়ে আছে পথ। কেউ তাদের কাছে পৌঁছে দিবে এ অমিয় সুধা। শরিক করবে স্বর্গিয় পবিত্র অনুভূতিতে। পবিত্রতা, শুদ্ধতা, শুভ্রতা, শুভতা, সততা ও অপূর্ব এক প্রেমময় জীবনের হাতছানি রয়েছে যেখানে। প্রত্যাশা ও প্রেরণায় পূর্ণ যে জীবন। ভালোলাগা ও ভালোবাসায় ভরে আছে যেখানের মুহূর্তগুলো।

দুঃখ কষ্টে ভরা এ নশ্বর পৃথিবী। পৃথিবীর প্রতিটি আনন্দে রয়েছে কষ্ট। আছে ক্ষয় আর লয়। এই কষ্টের ভেতর আনন্দ সৃষ্টি করতে আর দুঃখগুলো ঘোচাতে মানুষকে আসতে হবে ইসলামে। অবশ্য অধিকাংশ মানুষ নেশার ঘোরে বাস্তব দুঃখগুলোকেই সুখ মনে করে বসে আছে। চির দুখি প্রবঞ্চিত অবোধ মানুষকে প্রকৃত সুখের ঠিকানা দেওয়া মুসলিমের কর্তব্য। কোনো দুখি লোকের দুঃখ দুর্দশা দূর করার মত আনন্দ সত্যি অন্য কিছুতে নেই।

সেজন্য প্রথমে মুসলিমদের নিজেদের উপলবিদ্ধ করতে হবে ইসলামের ভেতরের সেই সুখ। সেই আনন্দ। সেই অনন্য অনুভূতি। শুনতে হবে ইসলামের কথা। জানতে হবে ইসলামের আকুতি ভরা নিবেদন। উপভোগ করা শিখতে হবে ইমানের স্বাদ, আকর্ষণী ক্ষমতা। পবিত্র ইসলাম তোমাকে জানাবে তার স্বভাব প্রকৃতি সক্ষমতা সৌন্দর্য ও উৎকৃষ্ট গুণের বিবরণ। নিজে অন্ধ হলে তো আর অন্যকে পথ দেখাতে পারবে না! ইসলাম কর্মঠ বানায়। সৃষ্টি করে উদ্যোম। বাড়িয়ে দেয় কর্মস্পৃহা। একথা তুমি জানো।

ইসলাম পূর্ব পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখ। তাহলে আরও ভালো করে বুঝতে পারবে। উপলব্ধি করতে পারবে এর সত্যতা। উদ্ভাসিত হবে বাস্তব আরও প্রকটভাবে। সত্যি, ঘুমিয়ে ছিল পৃথিবী। নিদ্রামগ্ন ছিল পৃথিবীর সব সম্ভাবনা। এল এমন এক জিয়ন কাঠি যার ছোঁয়ায় হঠাৎ করেই জেগে উঠল প্রকৃতি। জেগে উঠল মানুষ। জেগে উঠল জীবন। জেগে উঠল সময়। জ্ঞান বিজ্ঞানের সব শাখায় দিনে দিনে হতে লাগল উন্নতি। সবার যেন চোখ খুলে গেল মুহূর্তে।

ঘুম ভাঙল জড় জগতের। আরও অগ্রসরতা খুঁজতে থাকল। প্রগতির পথের প্রতিবন্ধকতাগুলো হটে গেল। একে একে সরতে লাগল পর্দা। শেষ হলো আইয়ামে জাহিলিয়্যাত। ইসলামের অভ্যুদয় ঘটলো রাহমাতুললিল আলামীনের শুভাগমনের মাধ্যমে। স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্থ হলো পৃথিবী। যুগে যুগে এই নতুন দৃষ্টি মানুষের মননকে সজীব করেছে, সবুজ করেছে, প্রাণময় করেছে, আনন্দময় ও গতিময় করেছে। পরিতৃপ্ত করেছে; সাথে সাথে চরম অতৃপ্তিও আচ্ছন্ন করেছে তাকে।

হ্যাঁ, ইসলাম কেবল তুষ্টি আর তৃপ্তি দেয়নি, দারুণ এক অস্থিরতাও পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছে। আরও বেশি জানার এবং আরও বেশি প্রগতি অর্জনের চাহিদা। এই অস্থিরতা মূলত নতুন বধুর উত্তেজনার মতই সুখকর। প্রথম সুখ স্বপ্নের মতই আনন্দঘন রহস্যময় রসময় সুন্দরতায় ঘেরা।

কখনও কালবোশেখি ঝড়ের মত, কখনও শরতের মেঘের মত উদ্দাম এই গতি। সবকিছু ভেঙ্গে চুরে দুমড়ে মুচড়ে ছুড়ে ফেলে আবার ধীরে ধীরে নতুন করে গড়ে তোলে। চরম উত্তেজনা যেমন আছে, শীতের শুষ্কতার মত নির্জিবও করে প্রকৃতি; কিন্তু তারপরই আসে বসন্তের ছোয়া। প্রকৃতির মতই এই জীবন। বিপ্লবাত্মক ইসলাম এমনই অনন্য এক মডিউল।

একজন মুসলিমের জীবনে আসে ঘাত প্রতিঘাত। তবে মচকালেও ভাঙে না, এদিক সেদিক হেলে দুলে গেলেও মূলোৎপাটিত হয় না। বরং এই পরিবর্তনগুলো নতুন উদ্দোম তৈরি করে, দেয় নতুন সঞ্জীবনী শক্তি। মূলত ঐহিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সুসমন্বয় রয়েছে ইসলামে। একদিকে পরকালের শস্যক্ষেত্র বলে পৃথিবীকে গড়ে তোলার নির্দেশ, অপরদিকে অতীন্দ্রিয় জগতের সন্ধান দিয়ে মুমিনের মনের ভেতর সৃষ্টি করা হয়েছে অন্য রকম ত্যাগের স্পৃহা, নির্মোহতা, নির্বেদ ভাব। পৃথিবীতে মন না দিয়ে কেবল অদৃশ্য আরেক পৃথিবীর স্বপ্নের বিভোরতা।

দেহ এখানে পড়ে রইলেও মন তাই উড়ে বেড়ায় কোথায়… কোন অজানায়.. হারিয়ে যায়.. কেবলই দিগন্তের ওইপারে। সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে, অন্য লোকে। অ্যাডভাঞ্চার প্রিয় আত্মাকে পৃথিবীতে বেঁধে না রেখে ভ্রমণ করায় আকাশ ও পৃথিবীর সীমানার বাইরে, মহাশূন্যে, মহাপূর্ণতায়, অবিনশ্বর পবিত্র অনন্ত সত্ত্বায়।

মহাবিশ্ব তখন নিতান্ত ক্ষুদ্র এক কণা। মুসলিমের মন তাই আকাশের মত বিরাট। বরং আকাশও তার তুলনায় অনেক ছোট, সংকীর্ণ। আত্মিক এ সম্পদের তুলনায় সব সম্পদ তার কাছে নগন্য, তুচ্ছ। অঢেল সম্পত্তি সে পায়ে ঠেলে দিবে, নিজের বিশ্বাসকে তবু দূরে ঠেলতে পারবে না। ইমান তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রিয় নবীজীর ভালোবাসা তার মন উজ্জিবিত করে রাখে। অন্তর পূর্ণ হয়ে থাকে আল্লাহ প্রেমে। আখেরাতের কল্পনায় ভুলে থাকে ছোট খাটো অপ্রাপ্তিগুলো।

দৃষ্টি তার বহু দূর প্রসারিত। সিদরাতুল মুন্তাহার ওই পারের দৃশ্যও সে দেখতে পায়। লাওহে মাহফুজের লেখার শব্দও সে শুনতে পায়। আরশের অধিপতিকে সে অনুভব করতে পায়। প্রতি মুহূর্তে তাকে বিমোহিত করে মহাজোতির্ময়তা। তার পৃথিবী লক্ষ্য কোটি নক্ষত্র শোভিত। অসংখ্য চন্দ্রালোকের চেয়েও অধিক সেই জ্যোতির্ময়তা।

বড় মন ও পরিচ্ছন্ন অনুভূতি যার ভেতর নেই সে প্রকৃত অর্থে মুসলিম নয়। একজন মুসলিমের প্রকৃত অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা প্রায় অসম্ভব। বর্ণনাতীত ঋদ্ধ তার অন্তর্লোক। আরও সুন্দর তার ভাবনাসমগ্র। যাবতীয় ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছ চিন্তা থেকে মুক্ত প্রকৃত মুসলিম। সমগ্র মানবতাকে একটি এককের মতই ভাবতে শেখে ইসলামের ধারক, ইমানের বাহক। বিশ্বাস, কর্ম ও আধ্যাত্মিক শক্তি তার সার্বক্ষণিক সাথি। ব্যক্তিক সামাজিক নৈতিক দার্শনিক বৈশ্বিক মহাজাগতিক পরিচ্ছন্ন দৃষ্টি তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। মন মনন চিন্তা চেতনা কর্ম কল্পনা ও পরিকল্পনায় কেবলই কল্যাণকামিতা। কেবলই সকল প্রাণের সাথে একাত্মতা। শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

হে মুসলিম, তোমার ভেতর মুসলিম হিসেবে আত্মগৌরব রয়েছে। কিন্তু এই ইসলামকে কি কখনও অনুভব করার চেষ্টা করেছ? কখনও কি উপলব্ধির চেষ্টা করেছ? ইসলাম তোমাকে কী বলতে চায়, তা কি কখনও শুনতে চেয়েছ? জানতে চেয়েছ?

কানের ভেতর থেকে ছিপিগুলো খুলে ফেল। ইসলামের বিপ্লবাত্মক কথাগুলো শোনার চেষ্টা কর। সে তোমাকে কী বলতে চায়? কী কথা যেন শোনাতে চায়। কী যেন বোঝাতে চায়।

ইসলামকে নিয়ে আজকের মানুষের বেশ আগ্রহ। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ইসলামের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে আত্মস্থ করবে এমন মানুষের বড়ই অভাব। মহান ইসলাম আমাদের কিছু কথা বলতে চায়, জানাতে চায় এবং দাবী করতে চায়। তার সে দাবীগুলো আমাদের শুনতে হবে, জানতে হবে, মানতে হবে এবং সে অনুযায়ী চলতে হবে। তবেই সত্যিকার মুসলিম হতে পারব আমরা। সত্যিকার অর্থে সেই সোনালি বর্ণিল স্বপ্নিল আলোর পথের পথিক হতে পারব।

প্রিয় পাঠক! হৃদয়ের চোখ-কান খুলুন। ইসলামের স্বভাব ও গতি বোঝার চেষ্টা করুন। সত্যিকারের মুসলিম হয়ে উঠুন। সত্যিকার মুমিন হয়ে উঠুন। আল্লাহর খাটি বান্দা হয়ে চলুন। রাহমাতুললিল আলামানের উম্মত হয়ে বাঁচুন।

লেখক: খতিব, শিক্ষক, গবেষক
‘মডারেট মুসলিম’ বই থেকে

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com