মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৪৮ অপরাহ্ন

বক্তাদের উদ্দেশে পাঁচ পরামর্শ

ওয়ায়েজীনদের ইখলাসই আসলকথা

বক্তাদের উদ্দেশে পাঁচ পরামর্শ

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ওয়ায়েজীন ভাইদের সংগঠন অনেকদিন ধরে চলছে। ফেসবুকে আসলে বিভিন্ন সংগঠনের নাম নজরে আসে। সর্বশেষ সেদিন দেখলাম, ‌‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’ নামে এবার নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছে। এর আগে ফেসবুকে ইত্তেফাকুল ওয়ায়েজীন নামে সংগঠনের প্রচার প্রসার ছিল। সেটারই এখন নতুন নাম, ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’।

ধন্যবাদ ওয়ায়েজ ভাইদের। আপনাদের সংগঠনের মঙ্গল কামনা করি। এগিয়ে চলুন। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে ছড়িয়ে পড়ুন দেশ থেকে দেশান্তরে।
দেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর নামে সংগঠন রয়েছে। একদম রিকশা ওয়ালা – কুলি – মুজদুর থেকে নিয়ে বিভিন্ন পেশার মানুষের সমিতি বা সংগঠন রয়েছে। সমাজে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম ও চলছে। সে হিসেবে এদেশের দ্বীনের দায়ীদের একটা সংগঠন থাকুক এবং তারা সামাজিকভাবে খেদমতে এগিয়ে যাক, এটা সকলেই চায়।

তবে এখানে কিছু কিছু বিষয়ের প্রতি ওয়ায়েজীন ভাইদের একমত হওয়া প্রয়োজন মনে করি। আর সেগুলো এমন বিষয়, ওগুলো থেকে যদি আমরা পরহেজ না করি, তাহলে আলেম -উলামার মর্যাদা বিলীন হয়ে যাবে।

প্রথমত: চুক্তিভিত্তিক ওয়াজ মাহফিলকে না বলুন

দেশে অনেক ওয়ায়েজীন আছেন, যারা চুক্তি করে ওয়াজে যেয়ে থাকেন। এসব ওয়ায়েজদের ব্যাপারে সতর্ক হওয়া চাই।
আবার অনেকে সরাসরি চুক্তি করেন না ঠিকই, তবে এমন পন্থা অবলম্বন করেন, যেটা সরাসরি চুক্তি করার থেকে কম নয়। জায়গায় জায়গায় প্রতিনিধি নিয়োগ করে রেখেছেন, যাদের মাধ্যমে আয়োজক কমিটির কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়।
এক বছর ওয়াজের টাকা কম হলে পরবর্তি বছর সেখানে আর প্রোগ্রাম দেওয়া হয় না। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করা হয়। এ ব্যাপারে ওয়ায়েজীনদের সংগঠনকে খেয়াল রাখা জরুরি।

দ্বিতীয়ত: মূর্খ ওয়ায়েজীন থেকে সাবধান থাকতে হবে
ওয়াজের ময়দানে মূর্খ বক্তার সংখ্যাধিক্য। কোন ইলম নেই। চাপার উপর চলছে। কোরআন – হাদীসের অপব্যাখ্যা দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করে যাচ্ছে। এসব বক্তা দেশ ও জাতির জন্য অকল্যাণকর।

তৃতীয়ত: বক্তাদের আচার-ব্যবহার ভাল হওয়া চাই

অনেক বক্তা আছেন, যাদেরকে দাওয়াত দিয়ে আয়োজকদের ঘাম ছুটে যায়। বক্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার মত অবস্থা কারো থাকে না।
মাহফিলে আয়োজকদের দৌড়ের উপর রাখেন। মেহমানদারী নিয়ে, থাকার জায়গা, বসার জায়গা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাদের অভিযোগের শেষ নেই। কাউকে তো খাওয়া- দাওয়ার সময় জমিদারী ভাব দেখাতে দেখা যায়। এটা খাব না! অমুক জিনিস রান্না করেন নি কেন? এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আয়োজক কমিটিকে অস্থির করে রাখেন। এমনকি এক বক্তা বিমানের বিজনেস ক্লাসে আসন না পাওয়ায় মাহফিল বর্জনেরই হুমকি দিয়ে বসলেন।
দেখুন! ওয়াজ মাহফিলের যারা আয়োজক, তারা অধিকাংশ লেখাপড়া না জানা অতি সাধারণ মানুষ হয়ে থাকেন। মানে সাধারন মানুষ। বক্তাদের এসব হম্বি- তম্বি দেখে তারাই হতবাক হয়ে যায়। আর এসব বদনাম হয় আলেম সমাজের।

চতুর্থ: বক্তাদের অগ্রিম টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা চাই

বহু ওয়ায়েজীন ভাই আছেন, যারা মাহফিল করার আগে এ্যাডভান্স নেন। এ ক্ষেত্রে মুরব্বী আলেমদের থেকে নির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে। বিষয়টা কতটুকু শরীয়ত সম্মত, সেটা তাহকিক করা প্রয়োজন।

যদি কোন কারণে রাহা খরচ বাবদ অগ্রিম নিতে হয়, তাহলে তিনি যদি মাহফিলে যেতে না পারেন, তাহলে সে টাকা কি করা হবে? এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। রাহা খরচ নিয়ে মাহফিলে আসেননি, এমন বক্তার খবরও আছে আমাদের তালিকায়।অনেক বক্তাকে দেখি, মাহফিলে টাকা অগ্রিম নেওয়ার পরেও মাহফিলে যান নি। এমনকি তিনি সে অগ্রিম নেওয়া টাকাটা ফেরতও দেননি। এ সকল কার্যকলাপ খুবই দৃষ্টিকটু হচ্ছে সমাজে।

পঞ্চম: বক্তাদের ইসলাহী প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন মনে করি

অধিকাংশ বক্তার চাল-চলন, উঠা- বসা আপত্তিকর। আখলাক- চরিত্র এখন মার্জিত নয়। বে- আমল তারা। অনেকে তো নামাজ- কালাম ঠিকমত পড়ে না। নিজে মানুষকে ওয়াজ- নসিহত করে, কিন্তু নিজের আমলের খবর নেই।

এসব বক্তাদের ইসলাহী প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কোন হক্কানী আলেম,বুজুর্গ ব্যক্তির সোহবতে পাঠানো সময়ের দাবি।

বক্তার নিজের আমল- আখলাক সহী না হলে তার দ্বারা শ্রোতাদের কোন ফায়দা হবে বলে মনে হয় না। এজন্য সাংগঠনিকভাবে এসব বক্তাদের নিয়ন্ত্রণে এনে ইসলাহী কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।

আমি যে সব সমস্যার কথা লিখলাম, এ সমস্যাগুলো প্রায় অধিকাংশ বক্তাদের মাঝে। তবে ভাল আখলাক চরিত্রের বক্তা যে নেই তা নয়। ভাল মানুষও আছে। তাদের আচার- আচরণ আসলেই সুন্দর। হৃদয় ভরে যায় তাদের ব্যবহারে।

কিন্তু কিছু বক্তাদের আখলাক- চরিত্র এমন অবনতি হয়েছে, যার দ্বারা পুরো আলেম সমাজের মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এজন্য সতর্ক হওয়া চাই। পরিশেষে এটা কামনা করি, ওয়ায়েজগণ মাঠে- ময়দানে ইখলাসের সাথে কাজ করুন। তাদের এই খেদমত আল্লার কাছ কবুল হোক। তাদের খেদমতের পরিধি আরো বেড়ে যাক।

আল্লাহ আমাদের সকলকে বিশুদ্ধ বুঝ দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com