২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

বঙ্গদেশের কুরআন ব্যবসায়ী

বঙ্গদেশের কুরআন ব্যবসায়ী

মুহাম্মাদ আইয়ুব :: শাকির সাহেব মসজিদের তাকে থরে থরে সাজানো কুরআন থেকে আকর্ষণীয় মলাটের এক জিলদ কুরআন শরীফ সসম্মানে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ভক্তিভরে চোখেমুখে লাগিয়ে কুরআন শরীফ পড়তে যেই খুললেন অমনি চক্ষু ছানাবড়া। রাগে ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়ার উপক্রম। নিয়মিত জিম, মার্শাল আর্ট শিখেন, শিখান বিধায় তার বডিটা সবসময় স্ট্রং।

আদি এমদাদিয়া নামে যে প্রকাশনী থেকে এই কুরআন ছাপা হয়েছে তার প্রকাশককে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতেন। ব্যবসার নামে কুরআন অবমাননা মেনে নেওয়া যায় না। অথচ বঙ্গদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে বছরের পর বছর জঘন্য এই কাজ দেদারসে করে যাচ্ছে।

আকর্ষণীয় মলাটের নিচে ঝালমুড়ির ঠোঙ্গার চেয়েও বাজে কাগজ দিয়ে কুরআন ছাপা! ‘উপর দিয়ে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট’ নীতি কুরআনের সাথে লাগিয়ে দেওয়া! কি ভয়ংকর মুসলমান এরা। একদিকে কুরআনের সাথে ঠগবাজী অপরদিকে আল্লাহর সাথে ডিগবাজী। আদি এমদাদিয়া, নিউ এমদাদিয়া, সনাতন এমদাদিয়া, আসমানী এমদাদিয়া, লওহে মাহফুজের এমদাদিয়া আরো কত নামে বেনামে এদের কারবার!

কুরআন অবমাননা করে যারা ব্যবসা করে তারা যে খুব ভাল আছে বিষয়টা এমন নয়। বাংলাবাজার এমন কুরআন ব্যবসায়ী অহরহ দেখা যায় যাদের দেখলে মনে হারু ঘোষের বজ্র এদের উপরও নিয়মিত পড়ে। হারু ঘোষ মরেছে কিন্তু এসব বাজারি ব্যবসায়ীরা মরেও মরেছে না।

শাকির সাহেব দেখলেন আরবের লোকেরা আলিশান জীবনযাপন করছে। মনে মনে ভাবলেন এটা কুরআনের বরকত। বর্তমান আরবের লোকেরা যতই পাঁজি হোক কুরআনকে তারা মন দিয়ে ভালোবাসে। এখনও এদের সামনে কুরআন পড়লে গণ্ডদেশ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প ‘বাদশাহ ফাহাদ কোরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স’ সেই সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত। এটি একটি কুরআনের ছাপাখানা। এখানে আরবিসহ ৩৯টি ভাষায় কোরআন ছাপানো হয়।

প্রকাশনাটি বছরে প্রায় ১০ লক্ষ কপি ছাপায় করে। এখানে ১,৭০০ জন কর্মচারী রয়েছেন কুরআন প্রকাশনীর কাজে। প্রকল্পটি ৩৯টি ভাষায় কুরআনের ৫৫টি অনুবাদ প্রকাশ করে। এর ওয়েবসাইটটিতে আরবি কুরআন, আবৃত্তি, পাঠ্য অনুসন্ধান, অনুবাদসমূহ, প্রাথমিক কোরআনের পান্ডুলিপির চিত্র এবং ব্যাখ্যামূলক আলোচনা পাওয়া যায়। ১৯৮৫ সাল থেকে এটি কোরআনের ১২৮ মিলিয়নেরও বেশি অনুলিপি তৈরি করেছে, ইসলামী বিশ্বে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে।

এই কমপ্লেক্সের ছাপা কুরআন হাতে নিয়ে দেখলে প্রাণটা জুড়িয়ে যেতে বাধ্য হয়। ঝকঝকে ছাপা, আকর্ষণীয় প্রিন্ট, মনোমুগ্ধকর ক্যালিগ্রাফি। সবখানে পূর্ণতার আর মুগ্ধতার ছাপ স্পষ্ট। এক জিলদ কুরআন হাতে নিলেই বুঝা যায় এর সাথে আরবের মানুষের ভালোবাসা,আবেগ,কুরআন প্রীতি গভীরভাবে জড়িত।

আরব প্রসঙ্গ বাদ। প্রতিবেশী ভারতের কথাই ধরা যাক, শাকির সাহেব নিজামুদ্দিন মার্কাজ ঘুরে দিল্লির ফরীদ বুক ডিপোর ছাপানো কুরআন দেখেছেন। ছাপার মানে আরবের কুরআনকে টেক্কা দিতেও পিছপা হয়নি এ প্রকাশনীটি। চড়ামূল্য হলেও বিক্রিতে কোনভাবেই পিছিয়ে নেয় ফরীদ বুক ডিপো। বঙ্গদেশের অসাধুরা ভাবে বাঙালীরা অধিক দামে কুরআন কিনবেনা। যদিও বিষয়টা সম্পূর্ণ ভুল ও নিচু মানসিকতার পরিচয়। বাংলাদেশের মানুষ সে যত বড় পাপী কিংবা দরিদ্র হোক না কেন কুরআন ক্রয়ের ক্ষেত্রে তার কোন কার্পণ্যতা নেই। এক হাজার টাকা দাম হলেও সে কিনে ছাড়বে। ঝালমুড়ির ঠোঙ্গা দিয়ে যারা অদম্য বাঙালিদের কুরআন প্রেম ঠেকিয়ে রাখে তাদের পরিণতি হারু ঘোষের চেয়ে সামান্য যাতে কম না হয়।

পরিশেষে শাকির সাহেবের মনে বারবার উঁকিঝুঁকি দেয় একটিমাত্র প্রশ্ন। আচ্ছা! আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো প্রত্যহ কুরআনের সাথে দিন শুরু করেন, তাহলে তিনি কোন প্রকাশনীর কুরআন পড়ে দিন শুরু করেন? যদি ভিনদেশী ছাপার কুরআনে তার দিন শুরু হয় তাহলে এটা তো তার জন্য লজ্জাষ্কর বিষয়। দেশপ্রেমি, কুরআনপ্রেমির হাতে বিদেশি ছাপার কুরআন! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি পারেন না তাঁর প্রত্যক্ষ তদারকিতে বিশ্বমানের কুরআন শরীফ মুদ্রণ করে জগদ্বাসীকে উপহার দিতে….।

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com