মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় কোনোবাহিনী এগিয়ে আসেনি

বঙ্গবন্ধুকে রক্ষায় কোনোবাহিনী এগিয়ে আসেনি  

সিদ্দিকুর রহমান : ঐতিহাসিক নানান বক্তব্য ও গ্রন্থ থেকে এটা পরিষ্কার যে, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রায় চার মাস আগেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করেছিলেন। এরপর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ আর সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করেছিল কিন্তু এ সতর্ককে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

কোনো বাংলাদেশি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে না এমন আত্মবিশ্বাস থেকেই এই শঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কিন্তু কথা উঠেছে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর তৎকালীন গোয়েন্দা বাহিনী কী করেছে, তাদের ভূমিকা কি ছিল? কারণ সাধারণভাবেই সামরিক গোয়েন্দাদের কাছে নিজস্ব বাহিনীর আগাম তথ্য ভান্ডার থাকার কথা। অথচ অন্তত দুই ডজন আত্মজীবনীতে এ তথ্য পাওয়া গেছে যে, খুনি ডালিম ও রশীদ চক্র প্রায় এক বছর আগে থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করে আসছিল এবং এই পরিকল্পনা নিয়ে তারা তৎকালীন সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পরবর্তীতে খুনি ফারুক, রশীদ ১৯৭৬ সালে সানডে টাইমস ও বিদেশি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জে. জিয়ার মদদ দেওয়ার কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার ৯ দিন পর খুনি চক্র জিয়াকে সেনাপ্রধান হিসেবে পদোন্নতি দেয়।

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সম্পর্কে লেখা এক বইয়ে গবেষক অলোক রায় লিখেছেন, সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের খবর পাওয়ার পর র-এর প্রধান কাও এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলেছিলেন। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, খুনিদের এত প্রস্তুতির বিষয়গুলো সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দাদের ও সেনাবাহিনীর তৎকালীন নেতৃত্বের অজানা থাকার কথা নয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান শফিউল্লাহর সঙ্গে ১৫ আগস্টের সেই নির্মম হত্যাকান্ডের আগ মুহুর্তে বঙ্গবন্ধুর কথাও হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই ১৫ আগস্টের চরম শোকাবহ ঘটনা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড আটকানো যায়নি।

যার হাত ধরে বাংলাদেশের জন্ম সেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন দেশে এদেশীয় খুনিদের হাতেই জীবন দিতে হলো। চার দশক পরও মীমাংসা হলো না, জাতির জনককে রক্ষা করতে না পারার দায় আসলে কার। সেনাবাহিনী, রক্ষীবাহিনী, গোয়েন্দা নাকি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা ছিল- তা এখনো স্পষ্ট নয়। নাকি আন্তর্জাতিক কোনো চক্রান্তের দোসর হয়েছিল এখানকার কিছু সুবিধাভোগী, সেটাও ইতিহাস পরিষ্কার করতে পারেনি। খুনিরা যে বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই তাদের পরিকল্পনা করে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, এটা পরিষ্কার। কিন্তু শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের ভূমিকা কি ছিল, বিপথগামীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার দায় সত্যিকার অর্থে কার তা নিয়েও পাওয়া গেছে শুধু পরস্পরকে দায়ী করা কিছু বক্তব্য। ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে জাতির, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ হারিয়েছে তার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, হত্যাকান্ডের আগের দিন ১৪ আগস্ট বিকাল ৪টায় খুনি ডালিমকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে মোটরসাইকেলে চড়ে ঘুরতে দেখা গেছে। ডালিম চলে যাওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৫টায় খুনি ক্যাপ্টেন হুদাকেও বঙ্গবন্ধুর বাড়ির পাশে মোটরসাইকেলে ঘুরতে দেখা গেছে। অর্থাৎ হত্যা মিশনের সদস্যরা কিভাবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঢুকবে, কিভাবে অপারেশন শেষ করবে তা ঠিক করতেই তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির অবস্থান এবং আশপাশ রেকি করে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটা কেউ ঊর্ধ্বতনদের জানালেন না কেন? না সেনাবাহিনী, না রক্ষীবাহিনী, না পুলিশ না রাজনৈতিক কেউ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার মতো কাউকে জানালেন না কেন?

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্যে একাধিক সাক্ষী জানান, সেদিন ৩২ নম্বরে দায়িত্বে থাকা সুবেদার মেজর আবদুল ওয়াহাব জোয়ার্দার ১৫ আগস্ট ভোর সোয়া ৪টার দিকে এসে গার্ড পরীক্ষা করার পর প্রত্যেকের কাছ থেকে অস্ত্রের গুলি নিয়ে যান। পুরান গুলির বদলে নতুন গুলি দেওয়ার কথা বলে সবার গুলি একত্র করেন কিন্তু আর নতুন গুলি দেওয়া হয়নি।

ওয়াহাব জোয়ার্দার তার জিপে উঠে চলে যান। প্রশ্ন হলো, সামরিক- বেসামরিক দায়িত্বশীল কেউই এটি দেখল না কেন? নাকি সেই সময় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে দায়িত্বে থাকা পাকিস্তান ফেরত সব কর্মকর্তার সমন্বয় হয়েছিল পরিকল্পিত ভাবেই? বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের জন্য বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জামিল ছাড়া আর কারও দায় এড়ানোর সুযোগ আছে কিনা সেটাও বড় ধরনের প্রশ্ন। কারণ রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে।

১৯৭৫ সালের স্বরাষ্ট্র সচিব আবদুর রহিম ও পুলিশের আইজি তছলিম উদ্দিনের ভূমিকা নিয়েও আছে প্রশ্ন। বঙ্গবন্ধুর আশপাশে থাকা রাজনৈতিক নেতৃত্ব এত বড় চক্রান্ত কিছুতেই রুখতে পারবেন না, এটা মানা যায় না। এত নামি রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রক্ষীবাহিনীর প্রতিক্রিয়া না থাকাও অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বলা হয়ে থাকে, নানান অপকৌশলে রক্ষীবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, রক্ষীবাহিনীর মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রধারী বাহিনীকে এত সহজে শুধু কথার কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা কি সত্যিই সম্ভব? নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রিত রেখেছিলেন? গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি হিসেবে খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ আর একদলীয় শাসন বাকশালকে দায় দেওয়ার এক ধরনের প্রয়াস আছে অনেক দিন ধরেই। সে সময় একটি দৈনিকে খাদ্য সংকটের বিশাল হেডলাইনের খবর প্রকাশ হতে হতে একদিন উত্তরবঙ্গের বাসন্তী নামের এক নারীর ছেঁড়া জাল পরা ছবি ছাপা হয়। অর্থনৈতিক অবস্থার দুর্দিনে রোল তুলে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তিলক পড়ে বাংলাদেশের ওপর। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কয়েক দিন পর সেই ছবির ফটোগ্রাফার নিজেই স্বীকার করেন, ছবিটি ছিল সাজানো এবং ওই নারীর মস্তিষ্ক ছিল বিকৃত। তাহলে প্রশ্ন হলো, ওই পত্রিকার সম্পাদকও কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির দায় এড়াতে পারেন?

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪৪ বছরে এসে আজও কি বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত হয়নি এবং হচ্ছে না? বিভিন্ন ইস্যুতে কোন অশুভ শক্তি সন্তর্পনে ঢুকে পড়ছে ও নাশকতা করছে? এদের সম্পর্কে জাতিকে সদা সতর্ক থাকতে হবে। যে কারনেই হোক অমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারিনি। পারিনি অশুভ শক্তিকে নির্মূল করতে।

’৭১ ও ’৭৫ এর অশুভ শক্তির উত্তরসূরীদের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত থেকে জাতির আশা-আকাঙ্খা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এখন সুরক্ষার দায়িত্ব জাতির। জাতি তার অগ্রযাত্রার পথে আর হোচট খাবে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে।

লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com