শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর ইসলামী কীর্তি চেপে রাখা হয়েছিল

বঙ্গবন্ধুর ইসলামী কীর্তি চেপে রাখা হয়েছিল

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : আগস্ট মাস চলছে। এ মাস এলেই বঙ্গবন্ধুর কথা বেশী মনে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি। যাঁর ডাকে এ দেশের মুক্তিপাগল লাখো মানুষ দেশকে স্বাধীন করতে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন।জীবনবাজী রেখে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রক্ত আর তীব্র বেদনার পিচ্ছিল পথ পেরিয়ে আমরা এই স্বাধীন সার্বভৌম ভূমি অর্জন করেছিলাম। যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল প্রায় ত্রিশ লাখ আদমসন্তান, যাদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম। সেই সাথে বর্বরদের দ্বারা ইজ্জত লুণ্ঠন হয়েছিল লক্ষ লক্ষ মা-বোনের।

বড় পরিতাপের বিষয়, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট এক শ্রেণীর বিপদগামীর দ্বারা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন। যা ইতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায়।বেদনার্ত বিষয় হচ্ছে, যে মানুষটি এই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য আজীবন লড়াই করেছিলেন।কারা ভোগ করেছিলেন বহুবার। যার জীবনের বৃহৎ অংশ কেটেছিল জালিমের কারাগারে, শুধু মাজলুম মানুষের মুক্তির জন্য, পরাধীনতার জিঞ্জির থেকে এ দেশকে মুক্তি দেওয়ার জন্য। সেই মহান ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল ১৫ আগস্ট। এ কারণে আগস্ট মাস এলে বড় স্মরণ হয়, সেই নির্মমতার কথা। মনে পড়ে সেই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের কথা।

বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ দরবেশ শেখ আউয়াল, এই বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ)-এর অন্যতম প্রিয় সঙ্গী ছিলেন। ১৪৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি বাগদাদ থেকে বঙ্গে আগমন করেন বলে জানা যায়। পরে তাঁরই বংশধরগণ অধুনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। জাতির জনক হচ্ছেন ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম অধঃস্তন বংশধর।

পূর্বসূরীদের ঐতিহ্য-অনুগামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন ইসলাম প্রিয় ব্যক্তি। ইসলামকে তিনি মনে-প্রাণে ভালবাসতেন। নিজে ইসলামী বিধি-বিধান মেনে চলতেন। আলেম-উলামাদের সাথে তাঁর আন্তরিক উঠা-বসা ছিল। তৎকালীন সময়ের আলেমদের সাথে তাঁর বেশ সখ্য ছিল।

বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় আজো শোনা যায়, আমি বাঙালী, আমি মুসলমান। সত্যি বঙ্গবন্ধু একজন খাঁটি মুসলমান ছিলেন। তিনি যে রাজনীতি করেছেন, একজন মুসলমান হিসেবে রাজনীতি করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন কমিটির দিকে নজর করলে দেখা যায়, এ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন একজন আলেম। এমনিভাবে বহু বছর ধরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন একজন প্রতিভাবান আলেম, যার নাম মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। এরপর ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন আরেক মাওলানা মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ সাহেব।

আলেমদের সাথেই রাজনীতি করতেন বঙ্গবন্ধু। কোনো বিপদগামী মানুষের সাথে তিনি রাজনীতি করেন নি। তিনি ছিলেন ইসলামপ্রেমী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে বেতার ও টেলিভিশনে প্রদত্ত ভাষণে তাঁর উন্নত মনোভাব স্পষ্টরূপে প্রকাশ পায়। তিনি সেদিন বলেছিলেন, আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। এ কথার জবাবে আমার সুস্পষ্ট বক্তব্য, আমরা লেবাস সর্বস্ব ইসলামে বিশ্বাসী নই। আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসূলে করীম (সাঃ)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের ‘প্রবক্তা’ সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বার বার যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে।

রাজনীতির বাইরে আলেম-উলামার সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক ছিল। মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহঃ)-এর সাথে তিনি উঠা-বসা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ নিয়েছেন। এ রকম বহু নজির রয়েছে আলেমগণের সাথে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর যখন ক্ষমতায় ছিল, এ দেশে ইসলামের জন্য বহু কাজ করেছিলেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যখন দ্বীনী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়েছিল, তখন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই এ দেশে মাদ্রাসাগুলো পুনরায় খোলা হয়। তিনিই মাদ্রাসাগুলো চালু করে দ্বীনী শিক্ষা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনিই মাদ্রাসা বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা । মাদ্রাসা বোর্ডকে অন্যান্য বোর্ডের মতো স্বায়ত্ব শাসন দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা, যেটা আমাদের বাংলাদেশের মানুষের গর্ব। এই বিশ্ব ইজতেমার জায়গা বরাদ্দ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। কাকরাইল মসজিদের জায়গা সম্প্রসারণেও তিনি অবদান রেখেছিলেন।

হজযাত্রীদের জন্য পাকিস্তান আমলে কোনো সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম হজযাত্রীদের জন্য সরকারি তহবিল থেকে অনুদানের ব্যবস্থা করেন। শুধু তা-ই নয় তিনি হজভ্রমণ কর রহিত করেন। তবে বঙ্গবন্ধু শাহাদাতের পরের সরকার হজে সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেয়। সরকার প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুই প্রথম বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বরে মাহফিলের শুভ উদ্বোধন করেন।
বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়কালে তাঁরই নির্দেশে সর্ব প্রথম বেতার ও টেলিভিশনে পবিত্র কোরআন ও তার তাফসীর এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রচার করার সুব্যবস্থা করেন। তাঁর আমলেই শবে কদর, মিলাদুন্নবী (সাঃ), শবেবরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং উল্লিখিত দিবসসমূহের পবিত্রতা রক্ষার্থে সিনেমা হল বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করেন।

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। যে কারণে ওই দেশে বিদেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য কেউ অনুমতি পেত না। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশটি সহযোগিতা করেছিল। ফলে, সে সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সে দেশের নেতৃবৃন্দের একটি সুদৃঢ় বন্ধুত্বের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম তাবলীগের জামায়াত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
এমনিভাবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এ দেশে ইসলাম প্রচার-প্রসার এবং এ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ইসলামের প্রশান্তিময় স্রোতধারায় পরিচালিত করতে কাজ করে চলছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে পবিত্র কুরআনের তরজমা, তাফসীর, হাদীস গ্রন্থের অনুবাদ, রাসূলে করীম (সাঃ)-এর উপর রচিত বই, সাহাবী (রাঃ) জীবনী, ইসলামী বিশ্বকোষ, সীরাত বিশ্বকোষসহ সাড়ে তিন হাজারেরও বেশী বই প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে বহু ইসলামী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিজে ইসলামপ্রিয় ছিলেন, এবং ইসলামী ভাবধারার বহু কাজ তাঁর হাতেই হয়েছে।

বড় দুঃখের বিষয়, বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর, যারাই পরে ক্ষমতায় এসেছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর ইসলামী কীর্তিগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কোনো সরকার বঙ্গবন্ধুর সেসব অবদানের কথা মানুষের সামনে তুলে ধরেন নি। এমনকি, বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সংগঠনকে অন্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পঁচাত্তর এর পরবর্তী সময়, আশির দশক, নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ের প্রজন্মের সামনে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর দলের ভালো কোনো দিক জাতির সামনে তুলে ধরা হয় নি। সে সময়ের ক্ষমতাসীন দল এবং কিছু কিছু সংগঠন, যারা ক্ষমতায় না থেকেও বঙ্গবন্ধু ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়িয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধুর ইসলামী কার্যক্রমকে চেপে রেখেছিল।

তবে সত্য কখনো গোপন থাকে না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার বঙ্গবন্ধুর সে সব ইসলামী কীর্তিগুলোকে জাতির সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছে তিনি ইসলামের জন্য কত কিছু করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী), তিনি পিতার মতো ইসলামী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। দেশব্যাপী ইসলামী কীর্তি এখন তাঁর। এ দেশের অবহেলিত কওমী মাদ্রাসার উন্নয়নে এবং সনদের স্বীকৃতিতে তিনি বড় অবদান রেখেছেন। এবং দেশব্যাপী মসজিদ মাদ্রাসার ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছেন।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় দৃষ্টি নন্দন মসজিদ নির্মাণ করে যাচ্ছেন। যেটা এই সরকারের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই মসজিদ নির্মাণ হলে, এ দেশের মুসলমানদের বড় উপকারে আসবে। দ্বীন -ইসলামের তরক্কি হবে। আম-জনতা বড় ফায়দা হাসিল করতে পারবে।
পরিশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের জন্য আন্তরিকভাবে দুআ রইল। ইসলামের জন্য তিনি যে সকল কাজ করেছেন, সেগুলো যেন সদকায়ে জারিয়া হয়ে যায়। মহান আল্লাহতা’য়ালা তাঁদেরকে ক্ষমা করুন, রহম করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com