মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৬:৪৮ অপরাহ্ন

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ 

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ 

সিদ্দিকুর রহমান : সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মুশতাক আহমেদ বসে পড়েন রাষ্ট্রপতির চেয়ারে। তিনি ডাকেন মন্ত্রিসভার বৈঠক। জেলখানায় শহাদাত বরণকারী জাতীয় চার নেতা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রায় সবাই সেদিন উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। তবে জোর করেও উপস্থিত করা হয়েছে কাউকে কাউকে। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রবীণ সদস্য ফণি ভূষণ মজুমদারকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে সরাসরি তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গভবনে। সেদিন সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে কথা হয়নি মন্ত্রিসভায়। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরা জাতির জনক হত্যাকা- নিয়ে জানতেও চাননি।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক-বেসামরিক পাল্টা আঘাতের শঙ্কায় ছিল খুনিরা। ৩২ নম্বরে হত্যাকা-ের পর প্রতিআক্রমণ মোকাবিলার জন্য তারা প্রায় ঘণ্টা চারেক প্রস্তুতি নিয়ে বসে ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। কিন্তু রাত পেরিয়ে দিন গড়ালেও প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগ।

বরং খুনিদের নতুন সরকারে যোগ দিয়েছেন একদল তথাকথিত রাজনীতিক ও কর্মকর্তারা। নিয়েছেন তারা আগের চেয়ে বড় পদ ও সুযোগ-সুবিধা। মন্ত্রিপরিষদ গঠনের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন প্রভাবশালী আমলারা। জানা যায়, জাতির জনককে হত্যার আগে টানা তিন দিন গভীর রাতে কুমিল্লার বার্ডে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসআইর প্রধান এবিএস সফদারের সঙ্গে বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুশতাক আহমেদ, তথ্যপ্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও সাবেক আমলা মাহবুব আলম চাষী। এই কয়েকদিন তাদেরকে দেখা যায়নি প্রকাশ্যে। কিন্তু ১৫ আগস্টে আওয়ামী লীগের এই তিন নেতাকে ঢাকায় হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় দেখা যায়।

১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। প্রতিবাদে তারা জাতীয় সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু সেই জেনারেল ওসমানীই আবার বিবেকের দংশন ছাড়াই মুশতাকের নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে ৮ আগস্ট বঙ্গবন্ধু তার মন্ত্রিসভায় স্থান দেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তাকে রাষ্ট্রপতিও বানিয়েছিলেন। সেই আবু সাঈদ চৌধুরীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন খন্দকার মুশতাক। আবু সাঈদ চৌধুরী পরবর্তীতে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তাকে জোর করে নেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ১৫ আগস্টের আগে সরকারি কাজে বিদেশ সফরে ছিলেন। জাতির জনককে হত্যার খবর পাওয়ার পর তিনি দেশে আসতে অস্বীকৃতি জানান।

তবে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার কোনো তৎপরতা ছিল না। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও স্পিকার নির্বাচিত হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদউল্লাহকে ১৯৭৩ সালে এক দফায় রাষ্ট্রপতি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরে ১৯৭৫-এর শুরুর দিকে মোহাম্মদউল্লাহকে মন্ত্রী হিসেবে নিজের মন্ত্রিসভায় স্থান দেন বঙ্গবন্ধু। সেই মোহাম্মদউল্লাহ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর পরই খন্দকার মুশতাকের সরকারে যোগ দেন। তিনি মন্ত্রী ছিলেন জিয়ার সরকারেও। জিয়া হত্যাকা-ের পরে সাত্তার সরকারের একদিনের উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন মোহাম্মদউল্লাহ। একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের ঘোষণাপত্র পাঠ করা অধ্যাপক ইউসুফ আলী বঙ্গবন্ধু সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৫ আগস্টের পর তিনিই আবার খুশি মনে যোগ দিয়েছেন খুনি মুশতাকের সরকারে। ইউসূফ আলী পরে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন।

ছাত্র নেতা থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া কে এম ওবায়দুর রহমান দলীয় এমপি ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সরকারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনিই ১৫ আগস্টে মুশতাক সরকারের মন্ত্রী হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদে আওয়ামী লীগের হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনও যোগ দেন মুশতাকের সরকারে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, খুনিরা ১৫ আগস্ট রাতে ট্যাংক নিয়ে সশস্ত্র অবস্থায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে আক্রমণ চালালে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে ফোন করেন বঙ্গবন্ধু।

রাষ্ট্রপতির বাসভবনে যাওয়ার জন্য আদেশ পান সেনাপ্রধান। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সেই রাতে ৩২ নম্বরে যাননি কে এম শফিউল্লাহ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনি মুশতাকের সরকারের প্রতি তিনি সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে আনুগত্য প্রকাশ করেন। বিমান বাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার ও নৌবাহিনী প্রধান এম এইচ খানও মুশতাক সরকার গঠনের প্রথম দিনেই আনুগত্য প্রকাশ করেন। পরে অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যেই কে এম শফিউল্লাহ ও এ কে খন্দকারকে যথাক্রমে জিয়াউর রহমান ও এম জি তায়েবের কাছে সেনা ও বিমান বাহিনী প্রধানের পদ ছাড়তে হয়েছে। এর কয়েকদিন পরই কে এম শফিউল্লাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নিয়ে চলে যান বিদেশে।

জিয়া ও এরশাদ সরকারের পুরোটা সময় তিনি বিভিন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। সেই কে এম শফিউল্লাহ আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন। প্রায় একইভাবে এ কে খন্দকারও বিদেশে বাংলাদেশের মিশনে দায়িত্ব নেন। প্রথমে অস্ট্রেলিয়া ও পরে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের দায়িত্ব পালন করেন। ফিরে এসে এরশাদ সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কিছুদিন কাজ করে দায়িত্ব নেন পরিকল্পনা মন্ত্রীর। পরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন প্রথম মেয়াদের সরকারে যোগ দিয়ে এমপি হন ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পান এ কে খন্দকার। মহান মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খন্দকার জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে নিজের বইতে বঙ্গবন্ধুর মুখে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বসাতে গিয়ে বিতর্কে পড়েন। সেইসাথে পরিকল্পনা মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। বাধ্য হন সেক্টর কমা-ারস ফোরামের পদও ছাড়তে।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে পরিবারসহ হত্যার পর ২৩ আগস্ট মুশতাক সরকার গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, হাশেম উদ্দিন পাহাড়ীসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে। ৩ নভেম্বর কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।

এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর জিল্লুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে আমির হোসেন আমু, গাজী গোলাম মোস্তফা, এম এ জলিল, এম এ মান্নান, সরদার আমজাদ হোসেন, নুরুল হক, এম শামসুদ্দোহা, এম মতিউর রহমানসহ বেশ কিছ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তার অনেক অনুসারীসহ মেঘালয়ে আশ্রয় নিয়ে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ ও খুনিদের বিতাড়িত করার জন্য প্রতিরোধের ডাক দেন। জিয়াউর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে তিনি কয়েক বছর ধরে সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র যুদ্ধ করেন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের প্রায় তিন বছর পর ১৯৭৮ সালের ৩-৫ মার্চ ঢাকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে কারাগারে আটক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মুক্তি এবং ১৫ আগস্টের হত্যাকা- এবং জেলহত্যার বিচার দাবি করা হয়।

১৯৭৫ সালের মতো রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নেই সেটি সত্য। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৪৭ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ভিন্ন আঙ্গিকে তাদের অপতৎপরতা, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। তাদের এখন প্রধান লক্ষ্য বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো। সেইসাথে সম্ভব হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবন নাশ করা। তাই আজ দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সরকারের সকল অর্গান ও মুক্তযুদ্ধের চেতনাধারী বাঙালি জাতিকে সদা-সতর্ক থাকতে হবে।

১৯৭৫ এর মতো কোনো কিছুকে আর এখন হেলাফেলা করার অবকাশ নেই। কোনো অসাংবিধানিক বা অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দেশকে যাতে আর কোনোদিন যেতে না হয় সেই বিষয়ে জাতিকে আরও সচেতন থাকতে হবে। সাংবিধানিক ও সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে আবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সপক্ষে নিরঙ্কুশ গণরায় দিতে হবে। শোকাবহ আগষ্টে এই হোক আমাদের প্রত্যয়। সেইসাথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে তাদের ভুল-ভ্রান্তি-বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে হবে। আত্মশুদ্ধি করতে হবে। ভোগের জন্য আওয়ামী লীগ নয়। তাদেরকে গণ-মানুষের কল্যাণ ও ত্যাগের রাজনীতির অনুশীলন বাড়াতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com