১৫ই জুলাই, ২০২০ ইং , ৩১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

বাংলাদেশে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

ফিরে দেখা। মো: তৌহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও নিপীড়নের শিকার হয়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশন অনুসারে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এবং রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে নির্যাতিত হয়ে নিজের বাড়ি ও দেশ থেকে নির্বাসিত হওয়া ব্যক্তিরা শরণার্থী। সারা পৃথিবীতে এই শরণার্থীরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত (ঠঁষহবৎধনষব) অবস্থায় আছে। করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীরা আরো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এ ছাড়া দারিদ্র্যের কারণে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে গমণকারী ব্যক্তিদের অনেকে চাকুরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেক মানুষ মানবপাচারের শিকার হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অসহনীয় কষ্ট ভোগ করছে। মানব পাচারের বিপক্ষে বাংলাদেশ সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও কিছু বাংলাদেশি মানব পাচারের শিকার হচ্ছে।

ইউএনএইচসিআর এর হিসেব মতে, বিশ্বে প্রায় ৭ কোটি আট লক্ষ জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের অর্ধেকেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২ কোটি ৫৯ লক্ষ শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত। এ শরণার্থীদের মধ্যে রয়েছে প্যালেস্টাইনের ৫৫ লক্ষ জনগোষ্ঠীও। বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা শরণার্থীদের আর্থিক ও খাদ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তা দিয়ে থাকে। পৃথিবীতে অসহিষ্ণুতা, হিংসা, বিদ্বেষ এবং অন্যের ন্যায়সঙ্গত অধিকার হরণ করার প্রবণতার কারণে জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

বাংলাদেশ ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। তারপরও বাংলাদেশ সবসময় বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকতে অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর পররাষ্ট্রনীতিতে সবসময় বিশ্বের নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছিলেন। এখনও বাংলাদেশ এ নীতিই অনুসরণ করে চলেছে। আর এ বিষয়টি বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ ধারায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণ শরণার্থী হিসেবে জীবনযাপনের তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল। প্রায় ১ কোটি জনগণ শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এদেশের সরকার ও জনগণ শরণার্থী এবং নির্যাতিত মানুষের প্রতি অধিক সমব্যাথী ও সবসময় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সম্পূর্ণ মানবিক কারণে মিয়ানমারের ১১ লক্ষ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ মিয়নমারের বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে প্রথম আশ্রয় নিয়েছিল ১৯৭৮ সালে। সে সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সবাই স্বদেশে ফেরত গিয়েছিল। তারপর থেকে কয়েকবার তারা মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সর্বশেষ তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ২০১৭ সালে। ইতোপূর্বে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মিয়ানমারে ফেরত গেলেও ২০১৭ সালে এ দেশে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাউকে মিয়ানমার সরকার ফেরত নেয়নি। রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরত নেওয়ার বিষয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার সে চুক্তি উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছে। পরবর্তীতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে চীনসহ অন্যান্য দেশ সম্পৃক্ত হলেও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দৃষ্টিগোচর হয়নি। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার প্রত্যাশা করে খুব শীঘ্রই মিয়ানমার সরকার সে দেশের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগণকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাসহ এ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া চলমান আছে। এ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে দেশের সরকার ও নির্যাতনকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ হতে পারে।
মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা উন্নয়নশীল এবং ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা কক্সবাজারের পরিবেশের ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। রোহিঙ্গাদের বিপুল সংখ্যক উপস্থিতিতে এ অঞ্চলের স্থানীয়রা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক কর্মকা-েও রয়েছে এর নেতিবাচক প্রভাব। কিছু এনজিও ও আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের সাহায্য করলেও এ সংস্থাগুলো থেকে এখানকার স্থানীয় দরিদ্র জনগণ কোনো ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছে না। রোহিঙ্গারা কম মজুরিতে কাজ করায় স্থানীয়রা চাকুরি হারাচ্ছে। দেশের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়কে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কাজ করতে হচ্ছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি রোহিঙ্গাদের তদারকিতে সরাসরি কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এতে দেশের জনবলের পাশাপাশি সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সম্প্রতি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার কারণে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ইনচার্জসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণ করে। তারা মাদকব্যবসা, চোরাকারবারিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের নিজ ভূমি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন না হলে এবং এ প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে তারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে জড়িয়ে পড়বে। ফলে তারা এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠতে পারে।

রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানামারের সরকার ও জনগণের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সে দেশের জনগোষ্ঠীর নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের। এ সমস্যা সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার এবং এর সমাধান করতে হবে সে দেশের সরকার ও জনগণকে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের দেশে ফেরত নেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে বাধ্য করার বিষয়ে আান্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশ ও সংস্থা মানবাধিকার বিষয়ে সোচ্ছার থাকলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষায় এবং তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। রোহিঙ্গারা মিয়ামারে নির্যাতিত হয়ে গভীর সমুদ্রে নৌকায় ভাসমান থাকলেও কোনো দেশ তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি। তাদের মানবাধিকার রক্ষায় এবং তাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হতে থাকলে তারা তাদের স্বদেশ থেকে পালিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রবেশের চেষ্টা করবে। এছাড়া তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা এ অঞ্চলসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরিয়ে দিতে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও প্রভাবশালী দেশগুলোর আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রত্যাশা করে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ। আন্তর্জাতিক ফোরামে সবসময় পৃথিবী থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক বৈষম্য দূর করার বিষয়ে বাংলাদেশ সোচ্চার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জাতিগত সংঘাত বন্ধে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় এবং অসামরিক মানুষকে রক্ষায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রেখে চলেছে। এসংস্থায় বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল থেকে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের ৪২টি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ১ লক্ষ ৭০ হাজার ২২১ জন শান্তিরক্ষী এ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমানে ৬ হাজার ৫শত ৪৩ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের ৯টি মিশনে দায়িত্ব পালন করছে।

শরণার্থী সৃষ্টির মূল কারণ যুদ্ধ, নির্যাতন, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসা উচিত। দারিদ্র ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য ক্ষেত্রেও ন্যায়পরায়ণতা অত্যাবশ্যক। ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে বাস্তচ্যুত না হতে হয় সে বিষয়ে এখনই বিশ্বনেতৃবৃন্দের ঐকমত্য প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে শরণার্থী ও জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবেতর জীবনের সমাপ্তী ঘটাতে পারে। শীঘ্রই বিশ্ব থেকে সব ধরনের নির্যাতন ও বৈষম্যের অবসানের পাশাপাশি সাত কোটির অধিক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসবে- শরণার্থী দিবসে এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : কলামিস্ট
১৫.০৬.২০২০

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com