শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯, ০৭:১৯ পূর্বাহ্ন

বাইতুল্লাহর প্রেমিক মুসাফির

বাইতুল্লাহর প্রেমিক মুসাফির

১ম পর্ব

নূরুল ইসলাম শ্রীপুরী : প্রিয়ার প্রিয় নগরী মক্কা যতই নিকটবর্তী হচ্ছে, প্রেমের বহ্নি শিখা, প্রাণের দুঃসহ জ্বালা ও স্মৃতি ততই তীব্র হয়ে উঠছে। ক্রমশ সে যখন উপস্থিত হয় প্রেমাস্পদের লীলা নিকেতনের সিংহদ্বারে “বাবে বাইতুল্লাহ” কা’বা ঘরের দরজা পাশে, তখন প্রেমিক হাজি স্মৃতির পাতায় মন্থন করতে থাকেন, এই সেই ঘর, সেই মোবারক ভূখণ্ড যার তাওয়াফ করেছেন সকল নবী ও ফিরিশ্তাকুল।

আদিকাল থেকেই শুরু হয়েছে এ বরকতময় তাওয়াফ। আর তা পৃথিবীর লয় অবধি চলবে ইনশাআল্লাহ। এ রাজতোরণ থেকেই বিশ্বময় হেদায়াতের নুর বিচ্ছুরিত হয়েছে। এই ঘরের ঐশী আলোকরশ্মি জগৎকে চমকে দিয়েছে।এ নূরের আবহ থেকে আপামর জনতা এ শিক্ষা অর্জন করেছে, মানুষের এবাদত নয় বরং মানুষের রবের এবাদত করতে হবে। এটি সেই ঘর যা, কলহময় ও বিবদমান পৃথিবীকে ঐক্য – সংহতি, মিল-মহব্বত ও প্রেম-প্রীতির অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। এ ভূমি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমময় ভূমি।

আল্লাহর হাবিব, রহমতে আলম, শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ভূমি। এখানেই রুহুল আমিন, জীব্রাঈল আঃ অহী নিয়ে অবতরণ করেছেন। এ ঘরের মহিমান্বিত আঙ্গিনা থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিখাদ তাওহীদের মর্মবাণী আবিশ্বের হেদায়াতের জন্য প্রচার করেছেন। প্রেমিক মুসাফির তোমাকে সহস্র অভিনন্দন। শুভকামনা, শান্তি সওগাত তোমার জন্য। আহলান সাহলান ! বাইতুল্লাহর প্রেমভক্ত মুসাফির, প্রেমময়ের স্মৃতিস্মারক বাইতুল্লাহকে দেখে আত্মসংবরণ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ প্রণয়-ভালবাসায় আত্মহারা হয়ে প্রসন্ন বদনে সে প্রদক্ষিণ করতে থাকে লীলাময়ের লীলা নিকেতন। প্রেমভক্ত হৃদয় প্রেমাস্পদকে পাবার গুমরেমরা কান্নায় নয়নমণি থেকে ভালবাসার নুনা অশ্রু ঝরে কপোল ভিজে যাচ্ছে। সজল আঁখিদ্বয় আকুল আগ্রহে অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইতুল্লাহর দিকে। ওয়াসিং মেশিনে ঢিটার্জেন পাওডার দ্বারা সাত পাক দিলে মলিন পোশাক হয়ে যায় ঝকঝকে সাদা। তাহলে আমার গুনাহের কালো কালিমা, পাপ-পঙ্খিল হৃদয় পুণ্যময় বাইতুল্লাহর তাওয়াফের দ্বারা স্বচ্ছ সুনির্মল হবেনা? অবশ্যই এই ঘর গুনাহকে মিটিয়ে দেয় যে ভাবে সাবান ও কলরক্স দাগ দূর করে দেয়। ইরশাদ হচ্ছে এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়। তাদের মানতপূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে ( সূরা হজ্জ -২৯)। বার বার কা’বা ঘরের চতুর্দিকে ছুটে যায়। কিন্তু তার মন ভরেনা। অতৃপ্ত হৃদয় তৃপ্ত হতে চায়না।

এবার সে প্রেমময় রাব্বুল আলামীনের ঐশী চাদরের আঁচল (কা’বার গিলাফ) ধরে গুমরে কাঁদে। উত্তাল হৃদয়ের উত্তাপ ও ব্যাকুল আকুতি জানিয়ে আপন ইপ্সিত দাবি দাওয়া পেশ করতে আরম্ভ করে। এখানে দৃশ্যমান হচ্ছে জাগতিক দুনিয়ার একটি দৃশ্য। যেমন ছোট্ট সোনামণিদের বায়না পিতার নিকট, পিতাপুত্রের মধুর অভিমানের দৃশ্য। পিতার ছায়ায় কায়ায় লেগেছে এমনকি সন্তান বাদুড়ের ন্যায় পিতার পরিধেয়ের আঁচল ধরে লটকিয়ে হলেও তার দাবি দাওয়া আদায় করবে। আমার সেই বায়না চাই ই চাই। অনুজের অনুযোগ অগ্রজের কাছে এমনি হয়। সন্তানের প্রতি পিতার স্নেহ মায়ার চেয়ে আল্লাহর মায়া তাঁর বান্দাদের প্রতি বহুগুণ বেশি। নয়ণপুত্তলি সন্তানের মায়ায় পিতা যদি বায়না পুরা করে দেয় তাহলে মাওলা কেন বান্দার বায়না পুরা করে দেবেনা? অবশ্যই দেবে। বিধায় বান্দা কা’বার গিলাফ ধরে ফুপাইয়া ফুপাইয়া কাঁদতে থাকে।

ব্যাকুল মুসাফির এবার রাজকুমারী বিবি হাজেরা আঃ ও নবী ইসমাঈল আঃ এঁর স্মৃতি রোমন্থন করে উষ্ণ আবেগে দৌড়ে চলে জাবালে ছাফা ও জাবালে মারওয়াতে। ইরশাদ হচ্ছে, নিশ্চয়ই সাফা মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত (সূরা আলবাকারা ১৫৮)। মহান রাব্বুল আলামীন বিশ্ব প্রেমিকের অগ্রদূত হযরত ইব্রাহীম আঃ উপর সন্তুষ্ট হয়ে পিতা পুত্রকে মহান রবের চিরন্তন স্মৃতি এবং নিখিল প্রেমিকের কেন্দ স্বরূপ প্রেমের স্মৃতি নিকেতন নির্মাণ করতে আদেশ করেন। পিতা পুত্র মিলে প্রেমময়ের লীলা নিকেতন “কা’বা” নির্মাণ করেন। ইরশাদ হচ্ছে, নিশ্চয়ই মানব জাতির জন্য সর্ব প্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা ছিল মক্কায়, যা বিশ্বজগতের দিশারী, এতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে। যেমন মাকামে ইব্রাহিম আঃ। আর যে ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ (আলইমরান ৯৬)।

আরও ইরশাদ হয়েছে যে, স্মরণ কর যখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আঃ কা’বা গৃহের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তখন তাঁরা দু’আ করেছেন, হে আমাদের রব, আমাদের থেকে কবুল কর নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণ কারী, সর্বজ্ঞ। হে আমাদের রব, আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহ কর এবং আমাদের বংশধর থেকে ও একটি অনুগত দল সৃষ্টি কর। আমাদের হজ্জের রীতি নীতি বলে দাও এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি তাওবা কবুলকারী, দয়ালু (বাকারা ১২৯)। ভক্ত প্রেমিকের জন্য রাব্বুল আলামীন বলেন, নিখিল প্রেমিককে প্রেমের অভিযানের (হজ্জের) আমন্ত্রণ জানাও, দূর দূরান্ত হতে তারা পা পিয়াদা কিংবা আরোহী অবস্থায় উপস্থিত হবে (হজ্জ ২৬)।

পিতা পুত্র উভয় মিলে প্রেমের লীলা নিকেতন “কাবা”গৃহ নির্মাণ করলেন। আজ বিশ্বময় কীর্তিত হচ্ছে তাঁদের সেই নির্মাণ কীর্তি। পৃথিবী লয় অবধি অক্ষয় হয়ে থাকবে এ মহতি স্মৃতি। প্রেমময়ের ঘরের ধূলোবালি ও মাটি পর্যন্ত আজ তাঁর কাছে অতি আদরের, প্রাণাধিক প্রিয়। এ মাটি যেনো মাটি নয় এ হচ্ছে তাঁর চোঁখের জ্যোতি ও সুরমা। ধুসর মরুর এ ধূলি পরিনত হয়েছে প্রেমিক চোঁখের জোনাকি হয়ে। যে জোনাকি পথিক মুসাফিরকে পথ দেখায়। যার হিরণ্বময়ী আলোকচ্ছটায় প্রতিফলিত হয় মহান রবের ঐশী সৌন্দর্য। কা’বার মুসাফির আজ সৌন্দর্যময়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে উম্মুখ ও দিশেহারা। প্রেমের ভ্রমর আজ প্রেমময়কে পাওয়ার জন্য মাতোয়ারা। ঈর্ষণীয় প্রেমের বর্ণিল চশমায় প্রিয়ার মঞ্জিলের প্রতিটি নিদর্শন আজ অনন্য ও অপরূপ দেখায়।

প্রিয় ভূখণ্ডের প্রণয়মাখা বালুকণা ও অনুপরমাণু পর্যন্ত আজ তাকে পুলকিত করে এবং পথিক মুসাফিরের প্রেম সাগরে নতুনভ প্রিয় ভূখণ্ডের প্রণয়মাখা বালুকণা ও অনুপরমাণু পর্যন্ত আজ তাকে পুলকিত করে এবং পথিক মুসাফিরের প্রেম সাগরে নতুনভাবে ঢেউ তুলে। হযরত ইব্রাহীম আঃ এ আমন্ত্রণ বিশ্বের প্রতিটি কোনায় কোনায় প্রতিধ্বনিত হয়। আল্লাহ তায়ালা আপামর মানবের রুহ – আত্মা পর্যন্ত সে আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। যাদের কপালে সৌভাগ্যের অক্ষয় তিলক অবধারিত হয়েছে তারাই সেই ডাকে সাড়া দিয়েছেন “লাব্বাইক” বলেছেন।

প্রিয়তমের অবিস্মৃত মধুর স্মৃতি আজ হাজি সাহেবের স্মৃতির পাতায় ভাসতে থাকে। তার হৃদয় গহীনে সৃষ্টি করে মহব্বতের উষ্ণ প্রস্রবণ। সে ভাব ও আবেগে তন্ময়। স্মৃতির আয়নায় দেখে যে এই পূণ্যময় স্হানে হযরত জিব্রাইল আঃ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রথম বাস্তব চিত্রে নামাজের শিক্ষা দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে জিব্রাইল আঃ বাইতুল্লাহর পাশে দুইবার নামাজ পড়িয়েছেন (তিরমিযী কিতাবুসসালাত)। এটি সেই ঘর যার বাতায়ন পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি, এখান থেকেই আজ হতে চৌদ্দশত বছর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান রাব্বুল আলামীনের দিদার লাভের জন্য স্বশরীরে “মে’রাজ” উর্ধাকাশে গমন করেন। ইরশাদ হচ্ছে, পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্বা তিনি যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমন করিয়েছেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকছা পর্যন্ত (বনী ইসরাইল, ০২)।

কবি সুন্দর বলে জগৎকে চমকে দিয়েছেন,

“হরম থেকে হরম পানে নিশীথ কালে করলে গমন,
আঁধার ভেদি চন্দ্র যেমন দীপ্ত আবায় দেয় দরশন”
“একলা তুমি লাভ করিলে এই মিলনের গোপন বাণী,
সৃষ্টি মাঝে কারও কাছে হয়নি সে সব জানা জানি।

লেখক : শিক্ষক ও বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com