১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৬ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

বাকৃবি গবেষকদের ইলিশের স্যুপ ও নুডলস উদ্ভাবন

পাথেয় ডেস্ক ● ভৌগোলিক নির্দেশক বা জি আই পণ্য হওয়ায় ইলিশ বলতেই বিশ্বের দরবারে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের নাম। ভোজনে ও বিলাসে পটু এই জাতির খাদ্য তালিকায় প্রথম পছন্দ যে মাছ তা হচ্ছে ইলিশ। বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জোর চেষ্টা করে আসছে দেশের মৎস্য অধিদফতর। গত কয়েক বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। ২০১৫-১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৪ লক্ষ মেট্রিক টন। জিডিপিতে অবদান ১ শতাংশ।

ইলিশের মৌসুম ছাড়া অন্যান্য সময়ে আহরণ কম হয় এবং বাজারে দাম অনেক চড়া থাকে। ফলে সারা বছর ইলিশের স্বাদ কিভাবে পাওয়া যায় এ নিয়ে কাজ শুরু করেন গবেষকরা।

মুরগির গোশত দিয়ে বিভিন্ন রকম পণ্য তৈরী করে দেশের অসংখ্য রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করে যাচ্ছে। তেমনি ইলিশ দিয়ে কিভাবে অন্যান্য খাদ্য পণ্য তৈরী করা ও ইলিশের পুষ্টি পাওয়া যায় সে বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের মৎস্য প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রন বিভাগের প্রফেসর ড. এ কে এম নওশাদ আলম ও তাঁর গবেষক দল।  তারা দেড় বছর গবেষণা করে ইলিশের স্যুপ ও নুডলস উদ্ভাবন করেছেন। ফলে ইলিশের স্বাদ ও পুষ্টি এখন সারা বছরই পাওয়া যাবে।

ড. নওশাদ আলম জানান, লোনা ইলিশ ব্যতিত ইলিশকে সারাবছর সংরক্ষনের আর কোন পদ্ধতি চালু নেই। ফলে সারা বছর ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন মানুষ।

এছাড়া ইলিশ মাছ পুষ্টিমানেও অনন্য। ইলিশ একটি চর্বিযুক্ত মাছ আর ইলিশে প্রচুর পরিমানে প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড (ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড) রয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে, এই এসিড কোলেস্টোরেল ও ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দিতে সাহায্য করে।

কিন্তু ইলিশের মাংসল অংশে অসংখ্য ছোট ছোট কাটা রয়েছে। ফলে বিদেশীরা এ মাছ ইচ্ছে থাকা সত্বেও খেতে পারেন না। ইলিশের মজাদার এই স্যুপ ও নুডলস দেশের এবং দেশের বাইরের সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবে বলে দাবি করেন তিনি।

বিদেশে রপ্তানী করে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। দেশে মৎস্যজাত পণ্যেও বিভিন্ন রেস্টুরেন্টও গড়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি। তবে বাণিজ্যিক কারণে নুডুলস ও স্যুপ তৈরীর কলা-কৌশল এখনই প্রকাশ করছেন না উদ্ভাবকরা। তাদের এ গবেষণা পরিচালনায় অর্থিক সহায়তায় দিয়েছে ওয়াল্ড ফিশ সেন্টারের ইকোফিশ প্রকল্প। ইলিশ পণ্য উদ্ভাবন ও বাজারজাতকরণ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ইলিশের এই দুটি পণ্য একটি বেসরকারী কৃষি সংস্থার সহায়তায় বাজারজাত করা হবে বলে জানান উদ্ভাবকরা।

গবেষক অধ্যাপক ড. এ কে এম নওশাদ আলম জানান, এক কেজি ইলিশ মাছ হতে প্রায় ২৫০টি ব্লক তৈরী করা সম্ভব। প্রতিটি ব্লকের ওজন ১২ গ্রাম। প্রতিটি ব্লক থেকে একজন মানুষের খাওয়ার উপযোগী ৭০ গ্রাম নুডলস অথবা ১৬০ মি.লি স্যুপ তৈরী করা সম্ভব।

ইলিশ অধিক আমিষ ও চর্বিযুক্ত মাছ। ইলিশের চর্বি ওমেগা-৩ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মানুষের রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টরলের পরিমাণ কমিয়ে উপকারী কোলেস্টরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ইলিশ মাছ ভক্ষনের ফলে মানুষের হৃদরোগের ঝুকি কমে এবং সুস্থ, সবল ও সতেজ রাখে।

ইলিশের দাম খুব বেশি বলে বর্ষাকাল ছাড়া মানুষ বছরের অন্যান্য সময় এটা তেমন খেতে পারে না। ইলিশ পণ্য ঘরের তাপমাত্রায় (২৫-৩০ ডিগ্রী সে.) অথবা ফ্রিজে (-২০ ডিগ্রী সে.) সংরক্ষণ করাও কষ্টসাধ্য। লোনা ইলিশে লবনের ব্যবহারের জন্য উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এটি ক্ষতিকর। এছাড়া এতে ইলিশের সেই স্বাদও পাওয়া যায় না। তবে ইলিশের মজাদার স্যুপ ও নুডলসে ইলিশের স্বাদ ও গন্ধকে অুঁট রাখা হয়েছে। যা ভোজন বিলাসী বাঙালি ও বিদেশীদের কাছে লোভনীয় হবে। এছাড়াও পুষ্টিমানও ঠিক রাখা হয়েছে।

দীর্ঘ দেড় বছর নিরলস গবেষণা করে ড. নওশাদ আলম ও তাঁর গবেষক দল ইলিশের মজাদার এ স্যুপ ও নুডলস করতে সক্ষম হন। এতে ইলিশের আমিষ, অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ও ভিটামিনের কোন ঘাটতি না ঘটিয়ে মাছের কিমা, মাথা, নাড়ি-ভূড়ি ও ডিম থেকে আলাদাভাবে ফ্রিজে সংরক্ষণযোগ্য ছোট আকৃতির ব্লক তৈরী করা হয়েছে। এই ব্লক থেকে ইলিশের স্যুপ ও নুডলস তৈরী করা যাবে। ফলে তা যারা কাটার জন্য খেতে পারতো না তারাও অনাসয়ে খেতে পারবেন। মূল্য হাতের নাগালে হওয়ায় সবাই সারাবছর ইলিশের স্বাদ পাবে বলেও জানান গবেষকরা। বিদেশে রপ্তানির দ্বারও উন্মোচিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উদ্ভাবকরা।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com