সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন

বাল্যবিয়ে যেন টেকসই অভীষ্ট অর্জনে বাধা না হয়

বাল্যবিয়ে যেন টেকসই অভীষ্ট অর্জনে বাধা না হয়

ম. জাভেদ ইকবাল : সাহিদা তখন দশম শ্রেণির ছাত্রী, সামনে এসএসসি পরীক্ষা। চোখে স্বপ্ন, এসএসসি পাস করে শহরের একটি কলেজে ভর্তি হয়ে আরও লেখাপড়া করবে। সাহিদার বাবা-মা হঠাৎ করে তার বিয়ের আয়োজন করলেন। চাকুরিজীবী এমন ভালো ছেলে আর পাওয়া যাবে না, তাই পাত্রটিকে হাত ছাড়া করলেন না সাহিদার বাবা-মা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাহিদাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো। বিয়ের পর স্বামীকে বলেও লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পায়নি সাহিদা। দুই বছরের মাথায় সাহিদা সন্তানসম্ভবা হলো। সন্তানটি ভূমিষ্ট হলো কিন্তু সাহিদাকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো। চিকিৎসক জানালেন, অপরিণত বয়সে মা হতে গিয়েই তার মৃত্যু হয়েছে। সাহিদার মতো এমন ঘটনা অহরহ আমাদের সমাজে ঘটছে, ১৮ বছর বয়সের আগেই মেয়েদের বিয়ের কারণে।

বাল্যবিয়ে কিশোর-কিশোরীর প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য বিরাট হুমকি। গর্ভবতী কিশোরীর উচ্চ রক্তচাপ অথবা খিঁচুনি হয়ে মা ও গর্ভের সন্তানের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় কিশোরী পুষ্টিহীনতায় ভুগলে তার স্বাস্থ্যহানি ঘটা ও কম ওজনের শিশুর জন্মের আশঙ্কা বাড়ে। কিশোরী মায়ের সন্তান পুষ্টিহীনতাসহ নানারকম শারীরিক জটিলতায় ভোগে। এমন কন্যাশিশুর পরবর্তী জীবনে জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাও অনেক বেড়ে যায়।

অল্পবয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়ার কারণে দেশে বিবাহ বিচ্ছেদ, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং পারিবারিক নির্যাতন বেড়ে যায়। নারীর শিক্ষা গ্রহণও বন্ধ হয়ে যায় বাল্যবিয়ের কারণে। উপযুক্ত হওয়ার আগেই সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার কারণে নারী অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে না। পর্যায়ক্রমে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বৈষম্যের শিকার হন। কম বয়সের অজুহাত দেখিয়ে নারীকে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সর্বোপরি, বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েশিশু কেবল পরিপূর্ণভাবে বেড়ে উঠতে পারেন না তা নয় পূর্ণবয়সে পৌঁছেও যোগ্য, দক্ষ ও কর্মক্ষম নারী হিসেবে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে সে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশে মা ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড়আয়ু বৃদ্ধিসহ প্রায় সবসূচকে অগ্রগতি হলেও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা বাল্যবিয়ে। সারাবিশ্বে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন জটিলতা। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে বাল্যবিয়ে সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণও অন্যতম বাধা, কেননা ২০৩০ সালের মধ্যে কিশোরী স্বাস্থ্য উন্নয়নের ওপরেই এসডিজি অর্জনের সাফল্য নির্ভর করছে অনেক খানি। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী দেড় কোটিরও বেশি কিশোরী বাল্যবিয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে (বিডিএইসএস) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী,
১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাল্যবিয়ের কারণে ৮৬ শতাংশ কিশোরী স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং ২১ শতাংশ কিশোরী অপরিকল্পিতভাবে গর্ভধারণ করে। ফলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, দুর্বল স্বাস্থ্য, অপুষ্টি ও অনুৎপাদনশীলতার ঝুঁকি বাড়ে। শহরের তুলনায় পল্লী অঞ্চলে বাল্যবিয়ের প্রভাব আরও বেশি। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণীদের মধ্যে ৩১ শতাংশই বিয়ের প্রথম বছর গর্ভবতী হন। তাদের মধ্যে প্রতি চারজনে একজন প্রথম সন্তানের জন্ম দেয়।

জনবহুল আমাদের দেশের বেশির ভাগ কিশোরী, নারী, মা-বাবা এখনো কৈশোর ও যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার সম্পর্কে শুধু অজ্ঞ নয়, অসচেতনও। তারা নিজের স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্য সর্ম্পকে যেমন জানেন না, তেমনি বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কেও ধারনা নেই। অপ্রাপ্ত বয়সে মা হলে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তা তাদের জানা নেই। তাই ফুল ফোঁটার আগেই কুঁড়িতে অল্পবয়সেই ঝড়ে পড়ে অনেক কিশোরী, কিশোরী মা। দারিদ্র, কুসংস্কার, অশিক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নারীকে বোঝা মনে করা হয়। তাই বাবা-মা ও অভিভাবকরা যত দ্রুত সম্ভব মেয়ের বিয়ে দিয়ে কন্যা অন্যের হাতে সম্প্রদান করে দায়মুক্ত ও ভারমুক্ত হতে চান। সামাজিক নিরাপত্তা বোধের অভাব ও আর্থিক অভাব-অনটন এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সমাজের বিজ্ঞজনেরা।বাল্যবিয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয় নারীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর অধিকাংশ মেয়েরই আর স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় না। বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার বিস্তার ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মক্ষেত্রে অবাধ প্রবেশ ও নীতি নির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।

বর্তমান সরকারের গত ৯ বছরের নিরন্তর প্রচেষ্টায় দেশে নারী শিক্ষার হার ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ছাত্রছাত্রীর প্রায় ৫১ শতাংশ, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫৪ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ ছাত্রী। বিগত সময়ের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি), জেএসসি-জেডিসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় সাফল্য ও জিপিএ-৫ অর্জনের দিক থেকেও নারীরা এগিয়ে রয়েছে। শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে একজন নারীও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকবে না। শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা সমাজ ও জাতিকে আলোকিত করবে এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নারী উন্নয়নে সার্বিক সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশ ৬৪তম অবস্থানে থাকলেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত ২৪টি দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার পরেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাংলাদেশে ক্রমান্বয়ে কমেছে। কিন্তু এখনও সেটা ৫০ শতাংশের উপরেই রয়ে গেছে। জাতিসংঘের মতে, বিশ্বে বাল্যবিবাহের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে পৃথিবীতে আড়াই কোটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। বাল্যবিয়ের হার বাংলাদেশেও খুব বেশি ছিল, সর্বশেষ ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫২ শতাংশ মেয়ে বাল্যবিয়ের শিকার হতো। কিন্তু বর্তমানে এই হার কতো নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এক ধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অল্পবয়সী মেয়েরাও এখন নিজেদের বিয়ে প্রতিরোধে এগিয়ে আসছেন।

‘বাল্যবিবাহ নিরোধকল্পে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা-২০১৮’তে বলা হয়, সরকার কিংবা শুধু আইন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকার ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বিবাহের সংখ্যা শূন্যে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৮ বৎসরের নিচে বিয়ের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার অভিপ্রায় প্রকাশ করেছেন। বাল্যবিয়ে বন্ধে সরকারের ব্যাপক তৎপরতা সত্বেও এখনও শতকরা ৪৭ ভাগ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে ১৮ বছরের নিচে। তাই বাল্যবিয়ে রোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা মতে, বাল্যবিয়ে বন্ধ করার জন্য অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সমাজের অগ্রসর নাগরিকদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বাল্যবিয়ে রোধে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি এবং সামাজিকভাবে আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বাল্যবিয়ের অভিশাপ থেকে দ্রুত মুক্তি না মিললে শত উন্নয়নেও সুফল আসবে না। দেশের জনসংখ্যার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। সংখ্যায় এরা ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৮০ হাজার। এর অধের্ক কিশোরী। অল্পবয়সে বিয়ে, গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কারণে কিশোরীদের একটা অংশ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকছে। এদিকে ইউএনএফপি এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই পুরোদেশকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী দেখতে হলে বাল্যবিয়ে কমাতে হবে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল কথা হলো, কাউকে পিছনে ফেলে নয়, সকলকে সাথে নিয়ে এগিয়ে চলা। জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) একাধিক লক্ষ্যের সঙ্গে বাল্যবিয়ের প্রভাব সম্পৃক্ত। তিন, চার ও পাঁচ নম্বর লক্ষ্য যথাক্রমে সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষা এবং জেন্ডার সমতা নারী অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত। বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েরা অকালে গর্ভবতী হয়। মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু এবং অপুষ্ট ও বিকলাঙ্গ শিশু জন্মদানের মতো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। এসডিজি বাস্তবায়নে বাল্যবিয়ে যাতে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় তার জন্য সকলকে যার যার অবস্থানে থেকে কাজ করা প্রয়োজন।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com