২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

বিপন্ন রোহিঙ্গা ও নির্বিকার বিশ্ব বিবেক

জহির উদ্দিন বাবর ● চরম ভাগ্যবিড়ম্বিত এক মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। কিছুদিন পরপর তথাকথিত নিরীহ জাতি বৌদ্ধরা তাদের কচুকাটা করে। কিন্তু সারা বিশ্ব তখন নীরবতা পালন করে। ‘টু’ শব্দ নেই তথাকথিত মানবাধিকারের ফেরিওয়ালাদের। এমনকি মুসলিম বিশ্বও তাদের নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় না। রোহিঙ্গারা যে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত সে কথা যেন কারোর মনেই পড়ে না। সম্প্রতি রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণহারে নিধনযজ্ঞ চলছে। নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। একটি কুকুর না খেয়ে মারা গেলে তথাকথিত যে সভ্য দুনিয়ায় চোখের পানির ¯্রােত বয়ে যায়, বন্য প্রাণি বাঁচাতে যেখানে কোটি কোটি ডলারের ফান্ড অনায়াসে সংগৃহীত হয়, মিয়ানমারে মাসের পর মাস নির্বিচারে নিরপরাধ নারী-শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করার পরও সেখানে কোনো সাড়া পড়ে না।

কোনো কুলাঙ্গার ইসলামের নবী বা ধর্মকে কটাক্ষ করে প্রাণ বাঁচাতে দেশান্তরিত হলে সভ্য দুনিয়ায় তার আশ্রয়ের অভাব হয় না। তার স্বদেশ ত্যাগের বেদনায় সমব্যথী ব্যক্তি বা দেশের অভাব হয় না। অথচ নিজ দেশে পরবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমদের জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়া হলেও এ নিয়ে কারও কোনো উচ্চবাচ্য নেই। এই বিশ্বে বাঘ সংরক্ষণের আহ্বানে পত্রিকার শিরোনাম করা হয়, সম্মেলন হয় কিন্তু সারাবিশ্বে ৫৭টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের গণহত্যা থেকে রক্ষা করতে কোনো সম্মেলন হয় না। রোহিঙ্গাদের ‘অপরাধ’ তারা মুসলমান। তবে তাদের দুর্ভাগ্য, মুসলমান নামধারীদের কাছ থেকেও তারা সুবিচার পাচ্ছে না। মুসলিম দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় প্রতিষ্ঠিত ওআইসি পর্যন্ত ‘টুটো জগন্নাথের’ ভূমিকায় অবর্তীণ। মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শাসকরা।

রোহিঙ্গাদের অতীত
মিয়ানমারের আরাকানে (বর্তমানে রাখাইন প্রদেশ) হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলমানদের বাস। ওই অঞ্চলে নৃতাত্ত্বিক ও স্থানীয় কিছু ঐতিহ্যের কারণে তারাই রোহিঙ্গা নামে খ্যাত। বেশ কয়েকবার এ এলাকাটি আক্রান্ত হয়, স্বাধীনতা হারায়, নির্যাতিত হয়। সে হিসেবে আরাকানে মুসলিম নিধন ও নির্যাতন অনেক পুরানো একটি বিষয়। তবে গত পৌনে এক শতাব্দীকালে এই নির্যাতনের মাত্রা অনেক বেড়েছে। ১৯৩৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত মুসলিমদের টার্গেট করে শতাধিক ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা ও সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে। এ কারণে বহু রোহিঙ্গা স্বদেশত্যাগে বাধ্য হয়। আরাকান সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে এসেও বহু রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হয়ে ১৯৭৮ ও ১৯৯১ সালে শরণার্থী হিসেবে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা এদেশে আসে এবং শরণার্থী শিবিরে বসবাস করে। তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি।

জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ‘বিশ্বের অন্যতম নির্যাতিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বড় দেশগুলোর ভূমিকা মুখের বুলির ওপরই সীমাবদ্ধ। ২০১৩ সালের জুনের দাঙ্গার সময় বড় কয়েকটি দেশ ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রতি বারবার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আহ্বান জানালেও মিয়ানমার সরকারের ওপর কোনো চাপ দেয়নি। কেন মিয়ানমারের মতো দেশে এতবড় ও দীর্ঘ সময় ধরে বর্বোরোচিত পন্থায় মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে-এ নিয়ে তারা কোনো কথাই বলছে না। এবারও যখন রোহিঙ্গাদের ওপর চলছে বর্বর নির্যাতন তখনও জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা খুবই হতাশাজনক।

নিপীড়িত-নিগৃহীত রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের সরকারি হিসাব মতে, প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা আরাকানে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। কয়েক দশক ধরে আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমরা নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকছে। রোহিঙ্গাদের জোর করে বৌদ্ধধর্ম পালনে বাধ্য করা হয়। মুসলিম স্থাপনাসমূহ রাখাইন বৌদ্ধরা দখল করে নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্ত রক্ষীবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বৌদ্ধদের আক্রমণে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলিমরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। অধিকাংশ মুসলিমের জীবনের নিরাপত্তা নেই। তারা চরম নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে অসহায় জীবনযাপন করছে। মিয়ানমারে মিডিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর সিকিভাগও আমরা জানতে পারছি না।

রোহিঙ্গারাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি দেশটির সরকার। ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গারা এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। মিয়ানমার সরকারের দাবি, রোহিঙ্গারা হলো ভারতীয়, বাঙালি ও চাটগাঁইয়া সেটলার, যাদেরকে ব্রিটিশরা আরাকানে এনেছে। যদিও ঐতিহাসিকভাবে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, ব্রিটিশরা বার্মায় শাসক হিসেবে আসার কয়েক শতাব্দী আগে থেকেই রোহিঙ্গারা আরাকানে আসে এবং জাতি হিসেবে বিকশিত হতে থাকে।

নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করায় সবকিছু থেকেই বঞ্চিত রোহিঙ্গারা। মিয়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয়পত্র থাকাটা খ্বু জরুরি বিষয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র ইস্যু করে না। ফলে এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরও পিছিয়ে পড়েছে। মিয়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইন অনুসারে বিদেশিরা কোনো সম্পত্তি ও ভূমি মালিক হতে পারে না। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা বিদেশি। তাই, রোহিঙ্গারা কোনো ভূমি বা স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। বর্তমানে যেসব ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, মিয়ানমার সরকার যেকোনো মুহূর্তে সেগুলো দখল করে নিতে পারে।

রোহিঙ্গারা সরকারি চাকরি করতে পারে না, সরকারি কোনো দপ্তরের সেবা তারা পায় না। এমনকি ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না। সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করতে পারে না, উপযোগ সেবার (বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি) জন্য আবেদন করতে পারে না, স্বপরিচয়ে শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। প্রায় ৮০ ভাগ রোহিঙ্গা বাস্তবিক অর্থে অশিক্ষিত। শিক্ষার আলো তাদের ওপর পড়ে না। মিয়ানমারের প্রশাসন রোহিঙ্গাদের জোর করে শ্রমিক হিসেবে খাটায়। প্রায়ই স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দেয়। শহরের সৌন্দর্যবর্ধন, সরকারি জমি অধিগ্রহণের নামে রোহিঙ্গাদের অনেকগুলো মসজিদ ইতোমধ্যে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাচীন কিছু মসজিদও আছে।

রোহিঙ্গাদের বিয়ে করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেয়া লাগে। এছাড়া দুটোর বেশি সন্তান নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবেতর জীবনযাপন করা এসব রোহিঙ্গা অতিষ্ঠ হয়ে একটু শান্তির সন্ধানে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায়। নৌপথে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা সাগরে ডুবে করুণভাবে প্রাণ হারিয়েছে। বিগত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন করছে। রুটিনমাফিক নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। বর্তমানে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় বসবাস করছে। যদিও রিফিউজি হিসেবে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরও কম। কক্সবাজারে যেসব রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিয়েছে তারা খুবই মানবেতর জীবনযান করছে। কিন্তু তাদের তাদের প্রতি নেই বিশ্বের কারও নজর। এমনকি মিয়ানমারে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেত্রী অং সান সুচি থাকলেও মুসলমানদের মানবাধিকার নিয়ে টু শব্দটিও করছেন না। এখন তার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায়; তবুও থেমে নেই রোহিঙ্গা নিধন।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কোন পথে?
রোহিঙ্গা ইস্যু কোনো সাময়িক সংকট নয়। বছরের পর বছর ধরে নিপীড়িত-নির্যাতিত হচ্ছে একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। বিশ্বের দেড়শ কোটি মুসলমান তাদের পক্ষে কখনও জোরালো ভূমিকা পালন করেনি। মিয়ানমারে যখন রোহিঙ্গাদের কচুকাটা করা হচ্ছে তখনও মধ্যপ্রাচ্যের শাসকেরা ভোগ-বিলাসে লিপ্ত থেকে পশ্চিমাদের তোষামোদি অব্যাহত রেখেছেন। রোহিঙ্গা মুসলিমদের কান্না আরব শাসকদের কান পর্যন্ত পৌঁছেনি। এমনকি মিয়ানমারের আশেপাশের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোও রোহিঙ্গাদের পক্ষে দাঁড়ায়নি। সামরিক শক্তিতে বলীয়ান মিয়ানমারের শাসকদের সবাই একটু সমীহ করেই চলে। তবে নিজ দেশে শত সমস্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। যদিও রোহিঙ্গাদের অভিশপ্ত এই জীবন থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব সারা বিশ্বের।

মিয়ানমারে যখনই রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয় তখনই জাতিসংঘসহ পশ্চিমারা বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানায় তাদেরকে আশ্রয় দিতে। একটিবারের জন্যও তারা মিয়ানমারের শাসকদের জিজ্ঞেস করে না তারা এই গণহত্যা কেন চালালো? বিশাল আয়তনের দেশ মিয়ানমারে কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে জায়গা করে দেয়া কোনো ব্যাপারই না। অভাব শুধু আন্তরিকতার। মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী চাচ্ছে কোনোভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে। এই কৌশলে তারা অনেকটা সফল।

মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের প্রধান আশ্রয়ের জায়গা আমাদের বাংলাদেশ। কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময় মিয়ানমার থেকে চলে এসে ইতোমধ্যে কক্সবাজারসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছে। তারা এখানেও ভালোভাবে নেই। তবে তাদের বিভিন্ন কর্মকা-ে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি অনেক নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে প্রচুর রোহিঙ্গা গেছেন বাংলাদেশি ভিসা নিয়ে। সেখানে তাদের যত অপকর্মের দায় সব বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এমনকি রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশের আয়ের অন্যতম প্রধান খাত জনশক্তি রপ্তানি অনেকটা হুমকির মুখে। এই অবস্থায় অবাধে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেয়া বাংলাদেশের পক্ষে কখনও সম্ভব নয়। মানবিক দিক বিবেচনা করলে অবশ্যই আশ্রয় দেয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবতার কাছে আবেগ অনেক সময় হার মানে।

রোহিঙ্গা সংকটের আসল সমাধান হলো তাদেরকে নিজ দেশে স্বাধীনভাবে বসবাসের সুযোগ করে দেয়া। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশ থেকে কূটনৈতিকভাবে মিয়ানমারকে চাপ দিলে তারা তাদের দেশের নাগরিকদের উপযুক্ত বসবাসের ব্যবস্থা করতে বাধ্য থাকবে। রোহিঙ্গারা তাদের নাগরিক অধিকারসহ মিয়ানমারে বসবাসের সুযোগ পেলে সেটাই হবে তাদের স্থায়ী মুক্তির উপায়। সবার উচিত সে দিকে চেষ্টা করা।

 

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com