১লা অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

বেকারত্ব ও লুটতরাজ

মতামত। রিন্টু আনোয়ার

বেকারত্ব ও লুটতরাজ

মাত্র এক বছরে ৬০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে ৩২ হাজার ৫৮২ জন শ্রমিকের চাকরিচ্যুত সেক্টরটির করুণ হাল নির্দেশ করছে। এছাড়া নিট্ওয়্যার খাতের ২৮০টি কারখানা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এই তথ্য দিয়েছেন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী। যিনি নিজে একজন গার্মেন্টস মালিক এবং এক সময় গার্মেন্টস মালিকদের নেতা ছিলেন।

৬০টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়া মনে হয় মামুলি ব্যাপার। ফ্যাক্টরিগুলো নিশ্চয়ই একদিনে বন্ধ ঘোষনা দিয়ে বন্ধ হয়ে যায়নি। ৬০ টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলো অথচ সেগুলো কেন বন্ধ হলো, সমস্যা কোথায় ছিলো তা নিয়ে আলোচনাও নেই তেমন। সব যেন গা সহা। নিট্ওয়্যারের যে ২৮০টি কারখানা ‘নিষ্ক্রিয়’ হয়েছে বলা হচ্ছে সেগুলো তো কার্যত বন্ধই।

ওই ২৮০টি কারখানায় কতো হাজার শ্রমিক ছিল? তারা কি বেতন ভাতা পাচ্ছে? ৩২,৫৮২ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবারের কত সদস্য? চাকরী হারানো মানুষগুলোর এখন জীবন চলছে কিভাবে? গণমাধ্যমেও এ নিয়ে তেমন খবর নেই। মানুষের জীবনের গল্প কাউকে এখন আর ভাবায় না। ভাবনা-আলোচনা বা সংবাদ বেশি অভিজাত বিপনী বিতানের কেনাকাটা, উন্নয়নের রুপকথা নিয়ে। কাঁচামাল সংকট, নতুন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন, ক্রয়াদেশ সংকট, কারখানার ত্রুটি সংশোধন, সর্বোপরি আর্থিক অসচ্ছলতা- এসব কারণে চলতি বছর প্রায় ৬০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। একই সময়ে কার্যক্রম শুরু করেছে, এমন পোশাক কারখানার সংখ্যা ৫৮। এসব তথ্য দিয়েছে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিজিএমইএ।

এর বিপরীতে বাংলাদেশে কাজ করে এখন বৈধ-অবৈধ পথে অনেক টাকা নিয়ে যাচ্ছে বিদেশিরা। গার্মেন্টসসহ কয়েকটি খাতে বিদেশিদের মোটা বেতনে চাকরি দিয়ে আভিজাত্য জানান দেয় কিছু প্রতিষ্ঠান। এই সোনার খণি টের পেয়ে বেসরকারি চাকরির বাজার থেকে তারা সমানে মনের সুখে লুটে নিচ্ছে এ দেশের টাকা। বিশেষ করে পোশাক, বায়িং হাউজ, আইটি খাত তাদেরই কব্জায়। করোনা ভাইরাসের কারণে চীনাদের দাপট কমে যাওয়ার লক্ষণের মধ্যে শ্রীলঙ্কান ও ভারতীয়দের দাপট বাড়তে পারে বলে ধারনা ব্যবসায়ীদের। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে বাংলাদেশে মোট বিদেশি দুই লাখ ৫০ হাজার। তাদের মধ্যে বৈধ ৯০ হাজার বাকিরা অবৈধভাবেই কাজ করছে বাংলাদেশে। বৈধদের মধ্যেও গলদ আছে। তাদের ৫০ ভাগেরই কাজের অনুমতি নেই। টুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশে ঢুকে দিব্যি কাজ করে যাচ্ছে। এরাও বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে বলে তথ্য দিয়েছে টিআইবি।

বিশ্বসেরার খেতাব পাওয়া অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কথাবার্তায় বেসামাল ভাব লক্ষনীয়। দেশের অবস্থা শুধু ভালো নয়, ভীষণ ভালো দাবি করা অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুরের কাছে নিয়ে যান মাঝেমধ্যেই। এখন হঠাৎ স্বীকার করে বসেছেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। সম্প্রতি তিনি জাতীয় সংসদে বললেন ‘একমাত্র রপ্তানী বানিজ্য নেগেটিভ। এটা ছাড়া একটি খাতও নেই যেখানে আমরা পিছিয়ে আছি। পরদিনই আবার আকস্মিক তিনিই বললেন অর্থনীতি ভালো অবস্থায় নেই। আবার বলেছেন চলতি বছর শেষে মন্দাবস্থা থাকবে না। সেইসঙ্গে তিনি বিশ্বসেরা অর্থমন্ত্রী-সেই কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।

এখন লুকানোর আর জো নেই যে, বেশিরভাগ ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। দেশ থেকে প্রতি বছর বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্যের ছড়াছড়ি। বেশ কয়েকটি গবেষণালব্ধ অঙ্ক ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাড়া জাগানো অঙ্কটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি-জিএফআই। তারা ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার (তখনকার বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৭২ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ) বিদেশে পাচার হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে বলে দাবি করেছে। এর আগে আইএমএফ ২০০৯ সালে ৫ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার কথা বলেছিল। সম্প্রতি জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন আঙ্কটাড এই ৫ বিলিয়ন ডলারের অঙ্কটাই আবার উল্লেখ করেছে। পুঁজি পাচারের পরিমাণ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার এই ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান খুবই স্বাভাবিক। কারণ, হুন্ডি প্রক্রিয়াটি একটি গোপন প্রক্রিয়া হওয়ায় এর সঠিক চিত্রটি পাওয়া খুবই দুরূহ। বেনামি ঋণে নাকি সয়লাব হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো- এটিও আর বড় মাপের খবর নয়।

দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে ঘাটতি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত এক বছরে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত লক্ষ্য ৪৫ শতাংশ থাকলেও হয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ফলে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা থাকলেও প্রথম ৭ মাসেই এই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ সরকার নিয়ে নিয়েছে। সরকারের এই ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমিয়ে দেবে, যেটা বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য চরম দুঃসংবাদ।

গত এক দশকে এই বছর প্রথমবারের মতো রফতানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৫.২১ কমেছে। এর মূল কারণ তৈরি পোশাক খাতের রফতানি ৮ শতাংশ হ্রাস পাওয়া। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানের ওপরও। দেশের লেনদেনের ভারসাম্য গত বছরের প্রায় পুরোটা সময়েই ছিল ঋণাত্মক। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমান্বয়ে কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের গড় প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, এরপর ২০১৯ সালে এই গড় ৩২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অনেক বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং এর মধ্যেই বাজারে ডলার সংকট চলছে। অর্থনৈতিক এমন গুরুচরণ অবস্থার মধ্যেই ৫ ফের্রুয়ারি সংসদে পাস হয়ে আইনে পরিণত হলো স্বায়েত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ পাবলিক নন-ফিন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান বিল ২০২০। বিলের মূল বক্তব্য: স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত ৬১টি সংস্থার তহবিলের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে, যার মোট পরিমাণ ২০১৯-এর মে মাসেই ছিল ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এটা জুনে গিয়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ এক মাসে মুনাফা এবং সুদ যুক্ত হয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।

এই আইনের বিরোধীতা করা দুর্বল বিরোধী দলের প্রতিবাদের সময় অর্থমন্ত্রী সংসদে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একমাত্র রফতানি বাণিজ্য ছাড়া আর কোনও অর্থনৈতিক সূচকে দেশ পিছিয়ে নেই। যদিও তার এই বক্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংক, পরিসংখ্যান ব্যুরো, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাদের তথ্য মতে কেবল একটি সূচক, রেমিট্যান্স ছাড়া আর সব সূচকই নিম্নমুখী। তার একদিন পরেই অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের ‘ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের বার্ষিক কার্যক্রম প্রণয়ন সম্মেলন ২০২০’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্বীকার করেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন খারাপ অবস্থায়।’ তিনি স্বীকার করেন আমদানি- রফতানি কমে যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের অবস্থাও ভালো না। দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। আইনটিতে হতবাক অনেকে।

লাগলে টাকা দেবে গৌরী সেন-এমন একটি রসিকতাময় প্রবাদ চালু আছে বাংলাদেশে।। রাজস্ব, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, এই সকল গৌরী সেনের পকেট খালি হওয়ার পর সরকার এখন নতুন গৌরী সেনের খোঁজে হাত বাড়িয়েছে স্বায়ত্তশাশিত প্রতিষ্ঠান গুলোর দিকে। কেউ কারও কাছ থেকে ঋণ করেছে কিংবা কেউ সময়মতো বেতন না পেয়ে দেনায় জর্জরিত হয়ে আছে, এমন খবর পেলেই দেদার সেই অসহায় ব্যক্তিদের অর্থ দান করতেন সপ্তদশ শতকের আলোচিত পৌরাণিক চরিত্র গৌরী সেন। এই ক্ষেত্রে গৌরী সেন তার নিজের সম্পদ স্বেচ্ছায় দিতেন ঋণগ্রস্ত কিংবা বিপদাপন্নদের। এই রাষ্ট্রের সব গৌরীসেনের মালিক রাষ্ট্র অর্থাৎ জনগণ, অর্থাৎ জনগণই প্রকৃত গৌরী সেন। আর সব জবাবদিহিহীনতার মতো এই রাষ্ট্রীয় গৌরী সেনদের কাছে থেকে টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার জনগণের মতামতের ন্যূনতম তোয়াক্কা করছে না।

হঠাৎ শুনলে গাঁজাখুরি মনে হলেও বিরতিহীনভাবে ব্যাংকপাড়ায় ঘটে চলছে অঘটনগুলো। কোনো বিহিত নেই। বেশ মোজেই দিন কাটছে আর্থিক খাতে লুণ্ঠনকারী প্রশান্ত কুমার হালদার মো. আবদুল আজিজ ও আবদুল হাই বাচ্চুগং সম্প্রদায়ের। কিছুই হয় না তাদের। নির্বিঘ্নে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com