১৭ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৬ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

মগবাজার ফ্লাইওভার থেকে নামলেই যানজট

নিজস্ব প্রতিবেদক ● যানজটের নগরী ঢাকায় ভোগান্তি কমানোর প্রত্যাশা নিয়ে সপ্তাহখানেক আগে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের সব দ্বার খুললেও নতুন নতুন জায়গায় যানজটে হতাশা দেখা দিয়েছে চলতি পথের যাত্রীদের। রাজারবাগ, শান্তিনগর, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, ওয়্যারলেস গেইট ও বাংলামোটরে খোলা নতুন র‌্যাম্পগুলো দিয়ে উঠে অন্য কোনো র‌্যাম্প দিয়ে নামার সময়ই পড়তে হচ্ছে যানজটে। যানজট তৈরি হচ্ছে ফ্লাইওভারের নিচের সড়কেও। মগবাজার থেকে বাংলামোটর সিগন্যালের পথে এতদিন অফিস ছুটির সময় যানজট দেখা গেলেও ফ্লাইওভার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার পর সেখানে সারাদিনই গাড়ির জট লেগে থাকছে।

গত বুধবার বিকাল ৫টার দিকেও বাংলামটর মোড় থেকে গাড়ির সারি ফ্লাইওভারের উপরে অনেকটা পথে যানবাহনকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। ওই সড়কে নিত্য যানজটের এই চিত্র দেখে সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন, মালিবাগ, মৌচাক ও মগবাজারের যানজট ফ্লাইওভারে চড়ে এখন চলে আসছে বাংলামটরে।

যানজটে ক্ষুব্ধ অটোরিকশা চালক আবদুল কাইয়ুম বলেন, ফ্লাইওবার তো আর আমারে জিগায়া বানায় নাই। আমারে জিগাইলে কইতাম ফ্লাইওভারটা বাংলামটর সিগন্যালটা পার কইরা দিত। হেইপারে নিয়া এট্টা মুখ সোজা সোনারগাঁও রোড আরেকটা মুখ ডানে হোটেল সোনারগাঁওয়ের দিকে দিবার কইতাম। এইপারে আইটকা থাকা লাগত না। এইখানে নামাইয়া কোনো কাম হয় নাই।

ফ্লাইওভারে এসে বাংলামটরে নামলে যানজটে পড়তে হয় বলে এখন আর ফ্লাইওভারে ওঠেন না বলে জানান গোড়ানের বাসিন্দা মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ ভূঁইয়া।

বাংলামটরের একটি ব্রোকারেজ হাউজের এই কর্মকর্তা বলেন, সবগুলো র‌্যাম্পের মুখে সিগন্যাল এ ফ্লাইওভারের একটি বড় দুর্বলতা। আমি যেখানে নামব সেখানেই জ্যাম লাগে, যেদিক দিয়ে উঠব সেখানেও জ্যাম লাগে। এ কারণে উঠি না। এই ফ্লাইওভারটার মূল সমস্যা হলো যেসব জায়গায় ওঠা-নামার ব্যবস্থা সেসব জায়গা খুবই ক্রাউডি। নেমেই সিগন্যালে পড়তে হয়।

ফ্লাইওভার দিয়ে আসা গাড়ির চাপের পাশাপাশি সড়কের পাশের গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানগুলোতে আসা যানবাহন সড়কে পার্ক করার কারণে এই এলাকায় যানজট বাড়ছে। বাংলামটর ও তেজগাঁও থেকে ফ্লাইওভারে ওঠা যানবাহনকে মগবাজার ওয়্যারলেসে নেমেই যানজটে পড়তে হচ্ছে।

এখানে সড়কে দুটি ময়লার কন্টেইনার রয়েছে। মধুবাগ থেকে আসা যানবাহন ও রিকশাও সড়কে জটলা তৈরি করে। অনেক সময়ই র‌্যাম্প থেকে নামার পথেই যানবাহনের আটকে থাকতে হচ্ছে।

গত সোমবার সন্ধ্যায় ওয়্যারলেসমুখী র‌্যাম্পে যানজট থাকায় ফ্লাইওভারের উপরে কিছু যানবাহনকে ঘুরিয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের দিকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল সংলগ্ন র‌্যাম্প দিয়ে নেমেও যানজটে আটকা পড়তে হয়। বেইলি রোড সিগন্যালে আটকে থাকা যানবাহনের সারি চলে ফ্লাইওভার থেকে নামার র‌্যাম্প পর্যন্ত চলে আসে অনেক সময়।

রামপুরা ও মগবাজার থেকে এসে রাজারবাগে নেমেও পড়তে হয় যানজটে। রাজারবাগ সিগন্যালের কারণে আটকে যেতে হয়।

এই এলাকায়ও ফুটপাতের দোকানপাট, সড়কে রাখা যানবাহন যানজট বাড়িয়ে দেয়। ফ্লাইওভারের র‌্যাম্পের কাছেই গ্রিনলাইন পরিবহনের বাস ঘোরানোয় ব্যাহত হয় যান চলাচল।

উঠা-নামার পথের এই প্রতিবন্ধকতায় মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার কোনো উপকারে আসছে না বলে মনে করছেন ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী মাহমুদ। তিনি বলেন, আগে যানজট তৈরি হত মৌচাকে, এখন রাজারবাগে এসেছে। বাসাবোয় আমার অফিসে যাওয়ার জন্য মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে এসে বাংলামটর বা তেজগাঁও দিয়ে আমি ফ্লাইওভারে উঠি। একবার নামতে, ওয়্যারলেস নেমে যানজটে পড়তে হয়। আবার রাজারবাগে। ফেরার পথে বাংলামটরেরর ইস্কাটনে বসে থাকতে হয়। আবার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে থেকে উঠলে সোনারগাঁও হোটেল বা তেজগাঁও যেখানেই নামি, জ্যামে পড়তেই হচ্ছে। আগে দুই-তিনটা সিগন্যালে যদি আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হত, এখন এক জায়গায় গিয়ে ৪০ মিনিট বসে থাকতে হচ্ছে।

হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের পাশ থেকে ফ্লাইওভারে ওঠা যানবাহন সোনারগাঁও হোটেলের সামনের র‌্যাম্প হয়ে নামতে গিয়েও আটকে যাচ্ছে। কারওয়ানবাজর সিগন্যাল থেকে যানবাহনের সারি বিজিএমইএ ভবনের সামনে পর্যন্ত চলে আসছে।

বেইলি রোড থেকে ফ্লাইওভারে উঠে বেশ দ্রুততার সঙ্গে তেজগাঁওয়ে পৌঁছানো গেলেও এর পরে পড়তে হচ্ছে যানজটের খাঁড়ায়। প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত অব্দি দীর্ঘ যানজট তৈরি হয় তিব্বত, নাবিস্কো এলাকায়। তিব্বত কারখানার সামনে থেকে মহাখালী পর্যন্ত আসতে নিয়মিতই আধা ঘণ্টার বেশি লেগে যায়, আবার কখনও কখনও ঘণ্টা পেরিয়ে যায় তিন কিলোমিটার এই রাস্তায়।

বলাকা পরিবহনের চালকের সহকারী শাহীন আলম লেন, আগে মগবাজার, মালিবাগ আটকায়া যাইতাম। কিন্তুক এখন সব গাড়ি তেজগাঁও আইসা আটকায়া যায়। আমরাও জ্যামে পড়ি।

গুলিস্তান ও সায়েদাবাদ থেকে মহাখালীমুখী অনেক বাস-মিনিবাস মগবাজার হয়ে চলাচল করে। তবে শান্তিনগর ও রাজারবাগ থেকে ফ্লাইওভারে উঠে তেজগাঁওয়ে নামার সুযোগ তাদের নাই।

এ কারণে ফ্লাইওভার কোনো উপকারে আসছে না বলে মন্তব্য করেন শতাব্দী পরিবহনের চালক শহীদ উদ্দিন। আমাগো জন্য তো ফ্লাইওভারে উডার সিস্টেম রাখে নাই। থাকলে তো ভালো হইত। আমাগো গাড়ি সিটিং সার্ভিস, আগে যাইতে পারতাম। এই ফ্লাইওভার কইরা আমাগো সুবিধা হইল কই?

বড় গাড়ি ফ্লাইওভার দিয়ে যেতে না পারায় ফ্লাইওভার চালুর পরও মগবাজার, মৌচাক এলাকার সড়কে যানজট থাকছে বলে জানান ওই সড়ক ব্যবহারকারীরা।

মঙ্গলবার দুপুরে মৌচাক, বাংলামটর থেকে মগবাজারমোড়মুখী সড়কে যানজট দেখা যায়। এছাড়া শান্তিনগর থেকে মালিবাগ মোড় হয়ে মৌচাক আসার সড়কেও যানবাহনের চাপ দেখা গেছে।

গুলবাগ এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বড় বাস উপর দিয়ে যায় না। নিচের সড়কে প্রাইভেটকারও বেশি। এ কারণে মগবাজার এলাকায় যানজট বেশি লাগে। এইটা কইরা আমাদের তেমন উপকার হয় নাই।

চলাচলকারীদের কাছ থেকে ফ্লাইওভার নিয়ে হতাশার চিত্র উঠে এলেও ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মো. মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলছেন, কিছু সমস্যা হলেও ফ্লাইওভার হওয়ার পর উপকারই বেশি। এই ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর সড়কে অনেক ‘স্পেস’ তৈরি হয়েছে। নতুন জায়গা তৈরি হওয়ার পর কোনো কোনো জায়গায় যানবাহন হালকা হয়ে গেছে। এটা একটা সুবিধা। তবে উঠা-নামার সময় কিছু কিছু সমস্যা হচ্ছে। এটা বাস্তবতা। এটা থাকবেই।

ফ্লাইওভার থেকে নামার পর যানজটের কারণ ব্যাখায় তিনি বলেন, ফ্লাইওভার থেকে নামার পর নিচের গাড়ি ওপরের গাড়ি এক হচ্ছে। এছাড়া ইন্টারসেকশনে যাওয়ার কারণে গাড়ির চাপ একটু বেশি থাকায় কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আমরা অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। এজন্য আমরা একটা নীতিমালাও করেছি।

সড়ক ও ফুটপাত দখল করে রাখা স্থাপনার কারণেও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মফিজ বলেন, এদের উচ্ছেদেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাংলামটরের দোকানের সামনে রাখা যানবাহন রাখায় আমরা প্রতিদিনই মামলা দিচ্ছি। নিচের রাস্তার হকার সরিয়ে দেওয়ার পর তারা আবারও বসছে। আমরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিটিং করে বলেছি, এসব হকার তুলে না দিলে জনগণ এই ফ্লাইওভারের সুফল পুরোপুরি পাবে না। এজন্য সিটি করপোরেশনে চিঠিও দেওয়া হবে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com