৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

মাওলানা মামুনুল হক ও ভেরী ইন্টারেস্টিং পার্সন

মাওলানা মামুনুল হক ও ভেরী ইন্টারেস্টিং পার্সন

মাওলানা আব্দুল্লাহ : বিগত বিএনপি সরকারের আমলে একজন লোক ছিল, তার নাম কৃষক মুহাম্মাদ সাদেক। সে শুধু দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইলেকশন হলে, সেখানে প্রার্থী হত। অবশ্য সংসদ নির্বাচন। সে থাকত ঢাকায়। কিন্তু বাংলাদেশের যে কোন এলাকায় সংসদ উপ নির্বাচন হলে, সেখানে গিয়ে সে ইলেকশন করার জন্য চলে যেত। রীতিমত টাকা দাখিল করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত।

কৃষক সাদেকের কোন লোকজন ছিল না। সে একাই। ওয়্যান ম্যান ওয়্যান পার্টি। ইলেকশনে দাঁড়িয়ে সে এলাকায় বাই সাইকেল চড়ে লিফলেট বিতরণ করে বেড়ানো ছিল তার কাজ।

সাংবাদিকরা একবার জিজ্ঞেস করল, আপনি কেন এভাবে যেখানে সেখানে গিয়ে ইলেকশন করেন? সাদেক সাহেব বলেছিল, আমি ইলেকশনে দাঁড়িয়ে একটা রেকর্ড সৃষ্টি করতে চাই। হয়ত গিনেসবুকে আমার নামটা চলে আসবে।

কৃষক সাদেক পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ঢাকা কাওরান বাজারে তাঁর কাঁচা মালের আড়ত ছিল। মোটামুটি যা ইনকাম হত, সবই এভাবে নির্বাচনী কাজে ব্যয় হয়ে যেত। মানে আজীব ধরনের এক ব্যক্তি ছিল সে। কোন জনবল, কোন কর্মি তার ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের যে প্রান্তে ইলেকশন হোক, সেখানে কৃষক সাদেক প্রার্থী আছেই।

বিএনপি সরকারের আমলে প্রধান নির্বাচনী কমিশনার এম এ আজিজ সাহেব একবার ঢাকার নির্বাচনী অফিসে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটা মিটিং ডাকলেন। সেখানে কিভাবে যেন কৃষক সাদেক উপস্হিত। মিটিং শুরু হল, কিন্তু কৃষক সাদেক সাহেবকে কেউ পাত্তা দেয় না। সাদেক সাহেব অনেক কষ্টে একবার প্রধান নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হলেন, তখন প্রধান নির্বাচন কমিশন কৃষক সাদেক সাহেবকে কিছু বলার জন্য অনুমতি দিলেন। কিন্তু বাঁধ সাধল অন্যান্য বড় বড় লিডারগণ। তাঁরা বলল, কৃষক সাদেক কি বলবে? তার অবস্হান কোথায়?

প্রধান নির্বাচন কমিশন এম এ আজিজ সাহেব তখন কৃষক সাদেকের পক্ষ নিয়ে বললেন, ” হি ইজ ভেরী ইন্টারেষ্টিং পার্সন” সে একজন মজার লোক। তাঁকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হোক।

বহুদিন পরে আজ সেই কৃষক সাদেকের কথা মনে পড়ল। বর্তমান দেশের যে অবস্হা, আমাদের কওমী অঙ্গনের কিছু আলেমদের ভেল্কিবাজি দেখে সেই সাদেক সাহেবের কথা স্মরণ হল।

এক. বর্তমানে আমাদের মাওলানা মামুনুল হক সাহেব যেন সেই কৃষক সাদেকের ভুমিকায় আছেন। নিজেদের দলের কোন অবস্থান নেই। খেলাফত মজলিস বহু আগে ভেঙে চুর্ণ-বিচুর্ণ। ওনারা সেই সাদেকের মত ওয়্যানম্যান ওয়্যান পার্টি। সারাদেশের কোথাও দলের কোন জনসমর্থন নেই। কোন জেলা- উপজেলা কমিটি নেই। কোথাও কমিটি থাকলে,সেটা নামে মাত্র। শুধু আছে মামুন সাহেবের সাউন্ড। যে সাউন্ডে জামাত শিবিরের ক্যাডার এবং অবুঝ কিছু তালেবুল ইলম জমা হয় তার মাহফিলে। সেটাকে পুঁজি করে মামুন সাহেব হুঙ্কার ছাড়েন।

হুঙ্কার ছাড়ারও কিছু নিয়ম আছে। কিন্তু তিনি অযৌক্তিক হঙ্কার দেন। খামাখা মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা গর্জন দেন। আমরা সেই কয়েকবছর ধরে দেখে আসছি, একবার মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সাহেবের ব্যাপারে অহেতুক মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মাঠ গরম করেছিলেন। মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্রদের নিয়ে রাজপথে সেই বয়োজৈষ্ঠ আলেমকে অপমান-অপদস্থ করতে তিনি দ্বিধাবোধ করেন নি। এমনকি মামুনুল হকের উস্কানীতে ফরীদ সাহেবের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিল একদল দুর্বৃত্ত। ফরীদ সাহেবের ছবি পদদলিত করেছিল রাজপথে।

মানে জামাতীদের মদদে মামুন সাহেব মনের খেদ মিটিয়েছিলেন। নিজের যা ইচ্ছা তাই করেছিলেন।

ঠিক, আল্লামা আহমাদ শফি রহ.-এর ইন্তিকালের পূর্বে তিনি আল্লামা শফিকে হুমকি- ধমকি দিলেন। ছাত্রদের বেয়াদবী করার আস্কারা দিলেন। যার ফলশ্রুতিতে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ঘটল। আল্লামা আহমাদ শফিকে অপমান করল ছাত্ররা। মাদ্রাসার সম্পদ বিনষ্ট করা হল। মানে সেই অযৌক্তিক সাউন্ড মেরে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে ফেললেন তিনি।

অথচ মামুনুল হক আল্লামা শফির কাঁধে সওয়ার হয়ে পরিচিতি পেয়েছেন। শফি সাহেবের নাম ভাঙিয়ে তিনি নেতা। বিশেষ করে হেফাজতের সময় যেভাবে লম্ফ-ঝম্ফ করেছিলেন, সেই থেকে মানুষ তাকে চিনেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই আহমাদ শফি সাহেবের সাথে নেমকহারামী করলেন তিনি।

মামুনুল হক ইজ ভেরী ইন্টারেস্টিং পার্সন। তিনি এখন মজার লোক হয়েছেন। নিজের দলের কোন অবস্থান না থাকলেও মানুষকে হুমকি- ধমকি দেওয়ার গুরু সেজেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, বুক- পিঠ নেই ওনার। যার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি লাভ করলেন, আবার তাঁর সাথে গাদ্দারী।

দুই.

তিন. আল্লামা শফির জানাযার খাটিয়া নিয়ে জামাতীদের যে ফটোসেশন হয়েছে, সেখানে সেই ছবির ফ্রেমে মামুনুল হকের ছবি। অর্থাৎ এটা জামাতীদের সাথে তার মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ। আর কোন আলেমকে জামাতীদের সাথে দেখা যায় না, শুধু মামুনুল হক কে দেখা যায়, এর উদ্দেশ্যটা কি? এখানে মামুন সাহেবের কোন দুরভিসন্ধি কাজ করেছে বলে মনে হয়।

আরো একটা বিষয় এখানে থাকতে পারে, সেটা হল মামুনুল হক সাহেব আল্লামা শফির ইন্তেকালের পূর্বে যে সব হুমকি-ধমকি দিয়েছেন, সেটাকে ধামাচাপা দিয়ে অন্য দিকে সবার দৃষ্টি নিতে চেয়েছেন।এ কারণে জেনে বুঝে জামাতীদের সাথে ছবি তুলেছেন, এবং শিবিরের সভাপতি ফেসবুকে নিজেদের ক্রেডিট জাহির করে মামুন সাহেবকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছেন। যাতে পূর্বের সমালোচনা বাদ দিয়ে নতুন আলোচনায় সবাই যুক্ত হয়।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে মওদুদী জামাতের সাথে তার সখ্যতা দেখা গেছে। যারা দ্বারা তিনি বারবার সমালোচিত হচ্ছেন। তারপরেও কিন্তু মামুনুল হক সাহেবের শুভ বুদ্ধির উদয় হয় না। উনি সেই মওদুদীবাদীর সাথেই।

চার. আচ্ছা, জানাযার দিন হাটহাজারীর ছাত্ররা কোথায় ছিল? কোথায় ছিল আল্লামা শফি সাহেবের খোলাফাবৃন্দ? কোথায় ছিল আমাদের আলেম সমাজ?

হাটহাজারীর হাজার হাজার ছাত্র এবং হাজারো খোলাফা এবং আলেম সমাজ থাকতে, মওদুদীবাদী জামাত- শিবির আল্লামা শফির খাটিয়া ধরে কিভাবে? ওরা কিভাবে সেখানে চান্স পেল?

এখানে বোঝা যায়, কোন চক্রান্ত কাজ করেছে। কোন হেভিওয়েট ব্যক্তির ছত্র ছায়ায় মওদুদীবাদীরা সুযোগটা পেয়েছে। তবে এটা হাটহাজারীর ছাত্র এবং খোলাফাদের গাফলতি আছে, সেটাও প্রকাশ পেয়েছে।

পাঁচ. মামুনুল হক সাহেব, শেষমেষ চরমোনাই ওয়ালাদের কাঁধে দোষ চাপাতে চেয়েছেন। বড় দুঃখজনক। দোষ করলেন নিজে। আবার সেটা চাপিয়ে দিলেন অন্যের কাঁধে। মানে পুরানো খাছলত।

কোনদিন চরমোনাই এর মঙ্গল চাননি। এখন সে অভ্যাস সহজে যায়? এখানে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর দোষ না চাপিয়েও তিনি পারতেন। কিন্তু মওদুদী বন্ধুদের খুশি করার জন্য মনে হয়, তিনি চরমোনাইকে শায়েস্তা করতে চেয়েছেন। আল্লাহ সবাইকে সহী বুঝ দিন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট, ধানমন্ডি, ঢাকা

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com