২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা সফর, ১৪৪২ হিজরী

মাতৃদুগ্ধপানে শিশুর অধিকার

ফাইল ছবি

শিশুর যত্ন। সাজিয়া হাফিজ

মাতৃদুগ্ধপানে শিশুর অধিকার

মায়ের দুধ শিশুর জন্মগত অধিকার। জন্মের পর একটি শিশুর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে পুষ্টি দরকার তার সবই মায়ের দুধে আছে। তাই মায়ের বুকের দুধই শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার। শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও দৈহিক গঠনে মায়ের দুধের গ্রহণযোগ্যতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। শিশু বিশেষজ্ঞগণের মতে, অন্য যে কোনো বিকল্প দুধের চেয়ে মায়ের দুধের পুষ্টিগুণ বহুলাংশে বেশি। পরিমিত প্রোটিন, ভিটামিন ও রোগ প্রতিরোধ উপাদানের সংমিশ্রণে বুকের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে আদর্শ খাবার। মায়ের বুকের দুধে ল্যাকটোজ নামক এক বিশেষ ধরণের শর্করা আছে, যা শিশুর শরীরের ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে সহায়তা করে।

মায়ের দুধ শিশুর জন্য আল্লাহতালার আশির্বাদ। শিশুর প্রথম পুষ্টির যোগানও আসে মাতৃদুগ্ধ থেকে। শিশু জন্মের পর মায়ের বুকে প্রথম যে দুধ আসে সেটাকে শাল দুধ বলা হয়। শালদুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধে শক্তিশালী প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। এর ফলে শিশুর শরীরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ ক্ষমতাসহ অন্যান্য রোগ-জীবাণু প্রবেশ করতে পারে না। এন্টিবডিতে পূর্ণ শালদুধ শিশুর বুক ও কানের প্রদাহ, ডায়রিয়া, এ্যাজমা, একজিমা ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করে এবং শিশুর দাঁত ও হাড় মজবুত রাখে।

জন্মের পর শিশুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে। একজন নিকটাত্মীয় বা একজন নার্স এ ব্যাপারে সহায়তা করতে পারেন। নবজাতক ও মাকে একই বিছানায় থাকতে দিতে হবে যাতে শিশু তার মায়ের সান্নিধ্য পায়। মায়ের পর্যাপ্ত দুধ আসার জন্য অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশি পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কারণ শিশুর সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার সব কিছুই মায়ের দুধে আছে। বুকের দুধ খেলে শিশুর বৃদ্ধি বাড়ে, সুস্থ থাকে ও সহজে রোগাক্রান্ত হয় না। তাই আসুন আমরা সবাই শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে সাহায্য করি।

শিশুকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ সময় অন্য কোন খাবার এমনকি পানিও দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শিশুর বয়স ছয়মাসের পর থেকে দু’বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার খাওয়াতে হবে। সবজি দিয়ে খিচুড়ি, ডিম, মাছ, মাংস ও বিভিন্ন ধরনের ফলমূল শিশুর চাহিদা মতো খাওয়াতে হবে।

মাতৃদুগ্ধপানের সুফল সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। কারণ এখনো কিছু মায়েরা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যপারে উদাসীন রয়েছের। জন্মের পর থেকে প্রথম ছয় মাস যে শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করে, তাদের জীবনের হয় শ্রেষ্ঠ সুচনা। শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করলে শিশুরা পায় সঠিক পুষ্টি ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য সব ধরনের পুষ্টি উপকরণ। শিশুরা পায় শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা। শ্বাসনালি সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জীবনঘাতী রোগ থেকে রক্ষা পায়।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করালে মা ও শিশু উভয়েই উপকৃত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্তন্যদানকারী মা প্রসব পরবর্তী বিষন্নতায় কম ভোগেন। জন্মের পরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের শরীর থেকে অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয়। এই অক্সিটোসিন জরায়ু এবং এর রক্তনালিকে সংকুচিত করতে সাহায্য করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মায়ের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ কমে আর জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকি ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে যায়। তাই মা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ ও সবল জাতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিশুর মাতৃদুগ্ধপান করাতে মায়েদের উদ্বুদ্ধকরণ ও এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।

জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুকে শুধু মায়ের দুধ পান করাতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরও অনেক শিশুবান্ধব আন্তর্জাতিক সংস্থার উদ্বেগ ও উদ্যেগ সত্বেও এখনও আমাদের দেশের শতভাগ শিশু মায়ের বুকের দুধ পান থেকে বঞ্চিত। মাতৃদুগ্ধপানের হিতকারী ফল অপরিসীম। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মায়ের বুকের দুধের সব ধরনের বিকল্পের বিজ্ঞাপন ও বিপণন সীমিত করতে এবং বিপণনের আন্তর্জাতিক বিধির মনিটরিং ও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের সব প্রতিষ্ঠানে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারি কর্মজীবী মায়েদের মত বেসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী মায়েরাও যাতে ছয় মাস বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। জনাকীর্ণ স্থান এবং কর্মস্থলে মায়েরা যাতে শিশুকে বুকের দুধ দিতে পারেন, সে লক্ষ্যে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার করা হয়েছে। সব অফিস আদালতে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। দেশের সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র মা ও শিশুবান্ধব করার ব্যাপারে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ল্যাকটেটিং মাদার ভাতাভোগীদেরকে প্রতিমাসে ৮০০ টাকা হারে ২,৫০,০০০ জনকে ২৪০ কোটি টাকা ভাতা বিতরণ করা হয়েছে। দরিদ্র মাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচির মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে ৭ লক্ষ দরিদ্র মা’কে ৮০০ টাকা হারে মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান করা হয়েছে।

মা-বাবা, পরিবারের বয়জ্যেষ্ঠ সবাই মিলে শিশুকে মায়ের দুধ পানে সংশ্লিষ্ট মায়েদের উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে হবে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ছয়মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ পান করে আমাদের দেশের ৬৪ শতাংশ শিশু। ২০২১ সালের মধ্যে এ হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার জোর প্রচেষ্টা চলছে। এ ব্যপারে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি মায়েদেরও এগিয়ে আসতে হবে।

আমাদের সুস্থ শিশু ও উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সকল শিশুকে মায়ের দুধ পান করানো ও ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি করতে হবে। সেই সাথে গুঁড়াদুধ বা কৌটাজাত শিশুখাদ্যের ব্যবহার ও বিজ্ঞাপন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। ইলেক্ট্রোনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার গুড়া দুধের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা তৈরিতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মায়ের বুকের দুধ শিশুর অমৃত, সঞ্জীবনী। শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর জন্য মাকে পরিবারের সবাই মিলে সহযোগিতা করতে হবে।

এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলি মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। ধর্মীয় নেতাগণ, স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও মাতৃদুগ্ধের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে শিশুদের সচেতন করতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে আরো অধিক সচেতন হবে। সরকারসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা শিশুর মাতৃদুগ্ধ পানের অধিকারকে নিশ্চিত করতে পারে। বিশ্বের প্রতিটি শিশু বেড়ে উঠুক মাতৃদুগ্ধের আর্শিবাদ ও নিরাপদ ছায়াতলে- এমন স্বপ্ন আমরা দেখতেই পারি।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com