২১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

মাদরাসায় বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হোক

ডাক দিয়ে যাই । লাবীব আব্দুল্লাহ

মাদরাসায় বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হোক

এই যুগের বিজ্ঞানমনা বা বিজ্ঞানভক্তরা ধর্মবিরোধী৷তবে সবাই নয়৷ অনেক বিজ্ঞানী ধর্মের ভক্ত ও অনুসারী৷ ইতিহাস বলে এক শ্রেণির ধার্মিকরা ইউরোপে বিজ্ঞানীদের নির্যাতন করেছে মধ্যযুগে৷ ধর্মের নানা বিষয় বিজ্ঞানের বিরোধী এই কথা বলে ইউরোপের কিছু কিছু মানুষ ধর্মবিরোধী হয়েছে৷ কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধর্ম কোন ধর্ম যেটি বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে৷ বিজ্ঞানীদের হত্যা করেছে৷ সেটি কি ইসলাম? না, ইসলাম কখনই প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত বিজ্ঞানের বিরোধিতা করেনি৷ ইসলাম পার্থিব জগতে মানুষের জন্য কল্যাণকর আবিষ্কারের পক্ষে৷ মানুষের জীবন সহজতর করেছে বিজ্ঞান৷ বিজ্ঞান মানুষের আবেগের গতি কমালেও নানা ক্ষেত্রে প্রগতির সাক্ষর রেখেছে৷

পৃথবীতে নানা ধর্ম রয়েছে৷ শত শত ধর্ম৷ প্রতিনিয়ত রাম রহিম সিং-এর মতো বকধার্মকেরাও ধর্মের জন্ম দিচ্ছে আধুনিক পৃথিবীতে৷ বিবর্তণবাদীরা যাই বলুক কুরআনের ভাষ্যমতে হযরত আদম আলাইস সালাম হলেন প্রথম মানুষ এই পৃথিবীতে৷প্রথম মানুষ প্রথম নবী ছিলেন৷সেই আদম থেকে শেষ রাসূল হযরত মুহাম্ম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত নবী- রাসূলগণ সভ্যতার নির্মাতা৷ নবীগণ মানুষের পশু স্বভাব থেকে মুনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়ে উন্নত সভ্যতা উপহার দিয়েছেন৷

ইসলাম সব নবীর ধর্ম ছিলো৷ পূর্ণ হয়েছে কুরআনের মাধ্যমে৷ ইসলাম ফিতরাতের ধর্ম৷মানুষের জন্মগত স্বভাবের সঙ্গে ইসলামের মিল রয়েছে৷ প্রতিটি সন্তান ফিতরাতের উপর জন্ম গ্রহণ করে৷ পিতা মাতা ও পরিবেশ তাকে নানা ধর্মে আবদ্ধ করে৷ প্রভাবিত করে৷ আল্লাহর অস্তিত্বকে স্বীকার করা মানুষের ফিতরাতের মধ্যে লোকায়িত রয়েছে৷ এটি আবিষ্কার করতে হয়৷ এক আল্লাহকে মানতে পারা একটি আবিষ্কার৷ বিস্ময়কর আবিষ্কার এই আল্লাহর কুদরতকে চিনতে পারা এবং কাজে লাগাতে পারা৷ বিজ্ঞান কোনো কিছুকে সৃজন করে না৷ বিজ্ঞান সৃষ্টিকুলের কোনো কিছু সৃষ্টি করেনি৷বিজ্ঞান আল্লাহর স়ৃষ্টিকুলের ভেতরে লোকায়িত শক্তিকে আবিষ্কার করে৷ বিজ্ঞানীরা স্রষ্টা নয়, আবিষ্কারক৷ তাখলিক করে না৷ ইকতিশাফ করে বিজ্ঞান৷ ইসলাম মানুষের কল্যাণের জন্য যা আবিষ্কার করে তার বিরোধিতা করে না৷ অন্যান্য ধর্ম যদি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানের বিরোধিতা করে তাহলে ধর্মটিকি বিকৃত কি না তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেতে হবে৷ ডক্টর মরিস বোকাইলি কুরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো বৈপরিত্য দেখেননি তবে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে বিজ্ঞানের সংঘাত রয়েছে বলে তিনি প্রমাণ পেয়েছেন৷

আজকের বিজ্ঞানভক্তদের এই বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে৷ ইসলাম উলূমে নকলিয়াকে গুরুত্ব দেয়৷ উলূমে আকলিয়ারও গুরুত্ব দেয়৷ নকল ও আকলের সমন্বয় করার চেষ্টা করেছেন অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ৷ তবে ইসলামের কিছু বিষয় গায়েবের সঙ্গে সম্পৃক্ত৷ ঈমানবিল গায়েবের একটি বিষয় রয়েছে৷ এইগুলোকে বিশ্বাস করতে হবে৷ এই ক্ষেত্রে ওয়াহীর নির্দেশনা মেনে চলতে হবে৷ বৈষয়িক বিষয়গুলো যদি শরীয়াবিরোধী না হয় তাহলে ইসলামে সেগুলো অনুমেদিত৷ একুশ শতকের বিজ্ঞানভক্তদেরকে সরাসরি কুরআন সুন্নাহর আলোকে ভাবতে হবে তাহলে সৃষ্টিকুলের বৈচিত্র্যের মাঝে আল্লাহর অস্তিত্বের সন্ধান পাবে৷ আল্লাহর পরিচয় পাওয়া বড় আবিষ্কার৷পরকালের পরিচয় একটি আবিষ্কার৷ নবীদের নির্দেশনায় বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো ব্যবহার করলে তা হবে মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে কল্যাণকর পদক্ষেপ৷

দুই
এই যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ৷ মানুষ সবকিছু চিন্তা করে বিজ্ঞানের আলোকে৷ ধর্মকে সেকেলে মনে করে৷ কিন্তু ধর্মের গভীর পাঠ না করেই ধর্মের বিরোধিতা করে৷ আরেকটি সমস্যা ইসলামকে অন্যধর্ম থেকে পৃথক করে না দেখে অন্যান্য বিকৃত ধর্মের মতো ভাবতে থাকে৷ ইসলাম সবযুগের জন্য৷ সব মানুষের জন্য৷ ইসলামের বিধানগুলো বিশ্বজনীন৷ মানব কল্যাণের জন্য এরচে কোনো উন্নত বিধান হতেই পারে না৷ শরীয়ার বিধানগুলো প্রয়োগ করলে সমাজ হবে উন্নত সভ্য সমাজ৷ আধুনিক পৃথিবীর অরাজকতা, অসভ্যতা, অমানবিকতা, দুর্নীতি, অশান্তি, বৈষম্যের মূল কারণ ইসলামের শরীয়াহ সম্পর্কে অজ্ঞতা বা তা প্রয়োগ না করা৷ ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা, অসম্পূর্ণ ধারণা, খণ্ডিত ধারণা, অনুমান নির্ভরতা নানা সমস্যার জন্ম দিয়েছে৷ এর থেকেই পশ্চিমা জগতে জন্ম ইসলামোফোবিয়া৷ আধুনিক যুগের দাঈ ও মুবাল্লিগদের দায়িত্ব এই ফোবিয়া দূর করতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা৷

তিন
স্কুল কলেজে কিছু বিজ্ঞান পড়ানো হয়৷ কোথাও কোথাও চর্চাও হয়৷ কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলো একজন মুসলিম শিক্ষার্থী কীভাবে পড়বে তার নির্দেশনা নেই৷ ইউরোপীয় চিন্তার আলোকে বিজ্ঞান পড়ানো হয়৷ বিজ্ঞান নিয়ে ইসলাম কী বলে তা জানানো হয় না বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদেরকে ফলে মুসলিমরাও বিজ্ঞানকে ইসলাম থেকে পৃথক করে দেখার প্রবণতা লালন করে বেড়ে ওঠে৷এক্ষেত্রে ইসলামী চিন্তাবিদদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে৷দায়িত্বে অবহেলাও আছে৷

মাদরাসার কথা বলে কী হবে? এক সময় মাদরাসায় বিজ্ঞানচর্চা হলেও আধুনিক যুগে তা প্রায় নিষিদ্ধ বিষয়! বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞানের পাঠ, চর্চা থেকে বিরত থেকে অনেক ক্ষতি হয়েছে মাদরসা পড়ুয়াদের৷ বিজ্ঞান নিয়ে সব তালেবে ইলম পড়বে তা সম্ভবন নয় কিন্তু যুগের চাহিদা বিবেচনা করে এক ঝাঁক মেধাবীকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে এগিয়ে আসতে হবে বিজ্ঞান চর্চার সাধনায়৷ এই সাধকরা ইসলামের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেবে বিজ্ঞানজগতে৷ বিজ্ঞানীদের দাওয়াত দেবে৷ সময়ের পরিভাষা সময়ের স্পন্দন উপলব্ধি করে বিশ্বময় দাওয়াত দেবে ইসলামের৷

হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে বিজ্ঞানের ভাষা কিন্তু ইংরেজি। মাদরাসাপড়ুয়া তালেবে ইলম জেগে উঠুক৷ নতুন চেনায়৷ আবার জেগে ওঠো হে আসহাবে কাহাফে বসবাসরত সাত যুবক৷ বিজ্ঞানকে গাইড করতে প্রয়োজন ওয়াহীর ইলমের৷ এই ইলম চর্চা হয় মাদরাসায়৷

প্রস্তাবনা
১) কুরআন ও হাদীসে বিজ্ঞানময় আয়াত ও হাদীসগুলোকে আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করে পড়ানোর জন্য কিছু শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে৷ দীনি পরিবেশে দীনি চেতনায় তালেবে ইলমদেরকে এই বিষয়গুলো তাঁরা পড়াবেন৷

২) কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত বিজ্ঞানের নানা শাখার দিকে ঈঙ্গিতবাহী আয়াত ও হাদীসগুলোর একটি সংকলন করা যেতে পারে যা পাঠ্যতালিকাভুক্ত হবে৷

৩) দীনদার বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষক, গবেষকদের মাধ্যমে মাদরাসায় বিজ্ঞান ও ইসলাম বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে যাতে মাদরাসার তালেবে ইলমরা প্রশ্ন করার সুযোগ পাবে৷ সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের বিষয়গুলো তাদেরকে জানানো যেতে পারে৷

৪) মুসলিম জাহানে মুসলিম বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানের কোন কোন শাখায় কী ধরনের অবদান রেখেছেন তা একটি বইয়ে সংলন করে মাধ্যমিক শ্রেণিতে পাঠ্য করা যেতে পারে৷

৫) বিজ্ঞানে কে কে নোবেল পেয়েছে এবং কোন কোন শাখায় তাদের জীবনী ও অবদানও পড়ানো যেতে পারে৷

৬) নবীজীর হাদীস আনতুম আলামু বিউমুরি দুনয়াকুম-এর বিষয়টি ( انتم اعلم بامور دنياكم)
তালেবে ইলমদের সামনে স্পষ্ট করা যেতে পারে এবং ওলা তানসা নাসিবাকা মিনাদ দুনিয়া-র চেতনায় উজ্জীবিত করে পার্থিব জগতে কীভাবে অবদান রাখা যায় তার প্রস্তুতি নেবার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে৷

মনে রাখতে হবে কুরআন কোনো বিজ্ঞানের কিতাব নয়৷ তবে কুরআনে বিজ্ঞানের নানা শাখার আলোচনা রয়েছে৷ সে আয়াতগুলো ভালোভাবে বোঝতে হলে বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞান জানা থাকতে হবে৷

ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ থেকে।

02

মাদরাসা দারুর রাশাদ ঢাকায় শিক্ষাবিষয় একটি বৈঠকে মাওলানা লিয়াকত আলী ও শায়খ আহমাদুল্লাহ, লেখক লাবীব আবদুল্লাহ এবং অন্যান্যদের মতবিনিময়

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com