২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১০ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় গা জ্বলে কেন?

সময়ের ভাবনা । উজায়ের সিদ্দিক

মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় গা জ্বলে কেন?

কোন ব্যক্তি মাদ্রাসা তৈরী করার উদ্যোগ নিলেই একটা দল ব্যপারটা নিয়ে বেশ কনসার্নড হয়ে যান। এত এত মাদ্রাসা করা হচ্ছে কেন? বা শুধু কুরআন হাদীস পড়ানো হচ্ছে কেন? আধুনিক শিক্ষার প্রতি এত অনীহা কেন মাদ্রাসার ছাত্রদের? এরকম হাজারো প্রশ্ন তাদের মনে ভীড় করে। আমি এখনো পর্যন্ত মাদ্রাসাতেই পড়াশোনা করেছি। তাই আমি নিজের মধ্যে এঁদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার একটা দায়বদ্ধতা অনুভব করি। তাই এই লেখার অবতারণা।

আমাদের মুসলিম সমাজের কতটা অংশ মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছে? আমাদের রাজ্যে পার্সেন্টেজটা মোটামুটি ২% হবে৷ এই ২% এর অধিকাংশই গরীব, ইয়াতিম বা মধ্যবিত্ত পরিবারে ছেলে। একটা মাদ্রাসা বা ইয়াতিমখানা না থাকলে ছেলেগুলো মূলত চাইল্ড লেবার হতো। কিন্তু ‘কিছু ইনকামের সোর্স দেখাতে না পারা কয়েকজন ভন্ডের’ বদৌলতে ছেলেগুলো একটু ঠাঁই পায়। কখনো এরা নিজেরাই চাঁদা তুলে নিজেদের পেটের ভাতটা তুলে আনতে পারে।

এতকিছুর পরেও মুসলিম সমাজের সমস্ত এক্সপেকটেশনশ এদের উপর। এই গরীব মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে উঠে আসা ২% এর উপর। সমাজের আশা, এই ছেলেগুলো ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে, উকিল হবে, সিভিল সার্ভেন্ট হবে, উদ্যোগপতি হবে…. মানে সবই হবে। তবে হ্যাঁ! কেও বলবেনা এরা ফকিহ হবে, উসুলী হবে, মুতাকাল্লিম হবে, মুয়াররিখ হবে, মোহাদ্দিস হবে,মুফাসসির হব্র …. এসব মধ্যযুগীয় শিক্ষার নামের অশিক্ষার সাথে আমাদের সমাজ সমস্ত সম্পর্ক ঘুচিয়ে ফেলতে চায়।

আমার প্রশ্ন হলো, এই ২% কি পুরো মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে? অবশ্যই না। মুসলিম সমাজের বাকি ৯৮% ও তো এই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য যখন মুসলিম সমাজের মধ্যে বিজ্ঞান, আইন, সাহিত্য, চিকিৎসা, ধর্ম ইত্যাদি সব জ্ঞানের শাখার সামঞ্জস্যতা তৈরী করা, তবে কেন ধর্মটা এই ২% কে দিয়ে বাকি ৯৮% কে অন্যগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছেনা? তারা হোক না ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, বিজ্ঞানী। মাদ্রাসার ছাত্ররা তো সেখানে গিয়ে বাগড়া মারছেনা। তারা তো গিয়ে বলছেনা, ডাক্তার হওয়ার দরকার নেই, চলো আলিম হতে চলো।
এরপর আরেকটা ব্যাপার হলো, আমি নিজে চোখে আঙ্গুল দিয়ে অনেককে দেখিয়েছি সরকারি মাদ্রাসাগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার নামে যা আছে সেটা আসলেই লোক দেখানো৷ এর কোন মূল্য নেই। সেখানে শুধুমাত্র আধুনিক শিক্ষাই সত্য।

সরকারি মাদ্রাসাগুলোতে আসলেই ছাত্রদের সাহিত্য আর বিজ্ঞান পড়তে প্রেশারাইজ করা হয়।
আমরা ক্লাস টেনে প্রতিদিন স্কুলে অঙ্ক করেছি, প্রতিদিন বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ পড়েছি, প্রতিদিন ইংরেজি পড়েছি। অন্যদিকে তাফসীর সপ্তাহে তিন দিন, হাদীস সপ্তাহে তিনদিন।
অথচ, অঙ্ক বা ইংরেজিতে যেমন ১০০ নাম্বারের পরীক্ষা হয়, তাফসীর ও হাদীসেও তেমন ১০০ নাম্বারের পরীক্ষা হয়৷

দেখা যায়, অঙ্কের টিচার তাঁর বই দুবার শেষ করে ফেলেছেন৷ এদিকে তাফসিরের টিচার সিলেবাসের ২০% শেষ করতে পেরেছেন।
তাহলে ছাত্ররা নাম্বার পায় কীভাবে?
সহজ উত্তর হলো, পরীক্ষার ব্যবস্থাপক অর্থাৎ মাদ্রাসা বোর্ড জানে ছেলেদের সিলেবাস শেষ হয়নি। তাই সমস্ত প্রশ্ন সিলেবাসের প্রথম ২০ পৃষ্ঠার ভেতরে রাখে।

আমাদের ফাজিলে তাফসীরের সিলেবাস ছিলো সুরা মাইয়িদাহ আর সুরা আনয়াম। শিক্ষক মাইয়িদাহই শেষ করতে পারেননি৷ আমাদের বোর্ড পরীক্ষায় একটাও সুরা আনয়ামের প্রশ্নের উত্তর করতে হয়নি। প্রশ্ন সব মাইয়িদাহ থেকে এসেছিলো।

আমাদের আলিমে জেনারেল ইতিহাসে পাঠ্য ছিলো অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারত বর্ষে শিক্ষা, সংষ্কৃতির ইতিহাস। সেখানে কত জটিল আলোচনা করা হয়েছে। পত্রিকার ইতিহাস, সংগঠনের ইতিহাস, কংগ্রেস প্রভাবিত আন্দোলন ও কমিউনিজম প্রভাবিত আন্দোলন ইত্যাদি বিষয় পড়ানো হয়েছে। অপর দিকে ইসলামের ইতিহাস যা পড়ানো হয়, তার অধিকাংশই আমার পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগে আমার আম্মা আর আব্বার মুখ থেকে শুনে জেনে গিয়েছিলাম৷ এক টি আলী না কি একটা নামের লেখকের একটাই বই আলীমে পড়ানো হয়,ফাজিলে পড়ানো হয় আবার কামিলেও পড়ানো হয়৷

বাংলা ইংরেজি সাহিত্যের বই দুবছর অন্তর পাল্টানো হয়। নতুন ও বিভিন্ন ধরনের লেখকদের লেখা এসে জড়ো হয়। অপরদিকে আরবী সাহিত্যের বই শেষ পরিবর্তন হয়েছিলো ২০১৩ তে। আল্লামা আবুল হাসান নাদভী (রহঃ) এঁর লেখা মুখতারাত – যেটা মূলত প্রাথমিক ছাত্রদের জন্য লেখা হয়েছে – থেকেই ফাজিল পর্যন্ত ছাত্রদের পাঠ্য বইয়ে টুকে দেওয়া হয়েছে।

এইসব নিয়ে আজ পর্যন্ত কেওই প্রশ্ন তুলছেননা। না মাদ্রাসার পক্ষ থেকে কেও, না মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে কেও। সবাই জিগির তুলেছেন, আমাদের মাদ্রাসায় ইতিহাস, বিজ্ঞান, ভূগোল, সাহিত্য পড়ানো হয়। আরে বাবা! মাদ্রাসায় কি ঠিকঠাক কুরআন-হাদীস পড়ানো হচ্ছে? সেটা খোঁজ নেওয়ার দরকার নেই?
আমি আগেও বলেছিলাম,আবারো বলছি। যেভাবে চলছে, তাতে সরকারি মাদ্রাসা থেকে ডাক্তার বের হবে, সাহিত্যিক বের হবে, সিভিল সার্ভেন্ট বের হবে, এমনকি গরু, ছাগল, ভেড়া, শুওর, গাধাও বের হতে পারে কিন্তু একজন যোগ্য আলিম বের হওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে।

এইসবের মধ্যে দেওবান্দ, নাদওয়াহ, মাজাহিরুল উলুম ইত্যাদি বা এদের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু মাদ্রাসা আজও ধর্মীয় শিক্ষাটা প্রচলিত রেখেছে। অথবা কোন আলিম, মাওলানা নিজেদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন ইলমের একটা ক্ষীণ ধারা তৈরী করতে। তাতেই অনেকের বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। ‘যাহ সব গেল’ টাইপের অবস্থা। যেন এইসব মাদ্রাসার ছাত্ররা শুধু নিজেদের জীবনকেই শেষ করছেনা, পুরো সমাজকেই শেষ করার কাজে লিপ্ত।

কিন্তু ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখতে পেতেন, সেইসব মাদ্রাসার ছাত্রদের লাইফ আপনার ‘জেনারেল শিক্ষিত’ ছেলে, ছোট ভাইয়ের থেকে অনেক বেশি বর্ণময়। তাঁরা তাঁদের ক্ষেত্রে অনেক কিছুই দিয়ে যাচ্ছে এই সমাজকে।

সমাজে হসপিটাল হোক, স্কুল হোক, ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা হোক আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু অতি অবশ্যই সমাজের মাঝে যোগ্য আলিম তৈরী করার জন্য মাদ্রাসাও থাকুক। সেটাকে বাধা দিতে যাবেন না৷

লেখাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নেওয়া

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com