২০শে এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৭ই রমজান, ১৪৪২ হিজরি

মানুষ যখন আকাশে ওড়ে

মুবাশশির হাসান সাকফি : প্রথম আকাশে যে মানুষটি ডানা মেলে দিয়েছিলেন তার নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস। ছিলেন স্পেনের মুসলিম প্রকৌশলী, রসায়নবিদ, জ্যোতির্বিদ, ভাষাবিদ, সংগীতবিদ- এক কথায় পলিম্যাথ। তাকে এয়ারক্যাফটের জনক স্বীকার করা হয়।

৮৮০ এর দিকের কথা। তখনকার মানুষের জন্য আকাশে ওড়াটা কেবল কল্পনা আর রূপকথার ব্যাপার ছিল। ইউরোপে তখন দেয়দালুস আর ইকারাসের রমরমা গল্পের আসর। কিন্তু হঠাৎ করেই কল্পনাকে হার মানিয়ে পৃথিবীকে অবাক করে আকাশে উড়াল দিলেন মুসলিম এই আবিষ্কারক। অনেকে হয়ত ভাবছেন, মুসলিম হিসেবে আমরা তাঁর অবদানকে ফেনিয়ে তুলছি। না, আমি বরং পাতা বাঁচানোর জন্য কার্পণ্যই করছি। তাঁর ওড়ার গল্পটাও বেশ মজার। বলছি। আমি গল্পপ্রিয় মানুষ। তাই গল্পটা বলার লোভ সামলাতে পারছি না।

প্রথমেই, লিয়েনহার্ডের বরাত দিচ্ছি। তিনি বলেন, আব্বাস ইবনে ফিরনাস সাধারণ কোনো মানুষ ছিলেন না। খুব চমৎকার মানুষ ছিলেন। আবিষ্কারের নেশায় সব সময় উন্মত্ত থাকতেন। ৯ম শতাব্দিতে স্পেন ও পর্তুগাল মিলে কর্ডোভার ইসলামী শাসনের অধীন ছিল। তাছাড়া বাগদাদেও খুব শক্তিশালী ইসলামী শাসন ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের জোয়ার বইছিল তখন দুই জমজ সংস্কৃতির রাষ্ট্র কর্ডোভা ও বাগদাদে।

নতুন এক জ্ঞানানুরাগী শাসক আব্দুর রহমান কর্ডোভার ক্ষমতায় বসলেন এবং স্পেনের ইতিহাসে জ্ঞান-বিজ্ঞানে নতুন রেনেসাঁর সূত্রপাত করলেন। তখন বাগদাদে বিখ্যাত এক সংগীতবিদ ছিলেন যিরয়াব (কালো পাখি-সংগীতের সম্মানসূচক উপাধি) বলে পরিচিত। এক সংগীতবিদের হিংসার শিকার হয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। তখনই কর্ডোভার শাসক যিরয়াবকে ভাল বেতনে নিয়োগ দেন। তো তিনি সংগীতে নানান কৌশল আবিষ্কার করেন, স্পেনের প্রথম ল্যুট বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন।

উড়তে না পারলেও খানিক্ষণে ঝুলে থেকে প্রচণ্ড বেগে মাটিতে আছড়ে পরেন।

এছাড়াও জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাসহ নানান বিষয়ে অবদান রাখেন। তো তার আবিষ্কারের কর্মযজ্ঞে যুক্ত হয় একজন বেদুইন যুবকের নাম। যিনি হলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। আর এখান থেকে চমৎকারের শুরু।

৮৫৩ সনে কর্ডোভা নতুন এক শাসকের মুখ দেখে। এই শাসক ঘোষণা দেন, স্থলপথ জলপথ সবকিছুর পরে তিনি আকাশপথেও রাজত্ব করতে চান। আরমেন ফিরমান নামের এক সার্কাসের লোক আকাশবিজয়ের জন্য এগিয়ে আসে। সে গায়ে বিশাল চাদর লাগিয়ে পাখার মত বানিয়ে কর্ডোভার গ্র্যান্ড মসজিদের মিনার থেকে লাফ দেয়। উড়তে না পারলেও খানিক্ষণে ঝুলে থেকে প্রচণ্ড বেগে মাটিতে আছড়ে পরেন। অল্পের জন্য বেঁচে যান। এজন্য অবশ্য তাকে প্রথম প্যারাস্যুট গ্লাইডার বলা যেতেই পারে।

তো এই ঘটনার সাক্ষি ছিলেন ইবনে ফিরনাসও। প্রথমেই বলে রাখি ইবনে ফিরনাস যিরয়াবের মত অনেক গবেষণাকর্ম আঞ্জাম দিয়েছিলেন। যেমন, তিনি জ্যোতির্বিদ্যার নক্ষত্রের নিজস্ব তালিকা করেছেন, প্ল্যানেটারিয়াম বানিয়েছেন, জলঘড়ি বানিয়েছেন, পাথুরে ক্রিস্টাল যা শুধু মিশরীয়রা ছাড়া আর কেউ বানাতে পারতো না তা নির্মাণ করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি একজন কবিও ছিলেন!

তিনি কাজ শুরু করলেন আকাশে ওড়ার গ্লাইডার বানাতে। পাখির ওড়াতে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন। প্রায় বিশ বছর গবেষণা চলল। নানান নকশা বানালেন এবং সবশেষে ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বানিয়ে ফেললেন পৃথিবীর প্রথম ফ্লাইং মেশিন! তাতে ছিল পাখির মত বিশাল দুটো রেশমের ডানা। বাঁশ বা তার চাইতে হালকা কোনোকিছুর ফ্রেম এবং তার ওপরে ঈগলের পেখমে ঢাকা চমৎকার একটা মখমলী আবরণ! দেখলে উড়ে যেতে ইচ্ছে করবে ওটা নিয়।

৭০ বছর বয়েসী ইবনে ফিরনাস জাবালে আরুস নামের পাহাড়ে উঠলেন। হাজার হাজার মানুষ সোৎসাহে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একজন কবির মহাকাব্যের সূচনার জন্য। কবি দৃপ্তপদে মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন। ছড়িয়ে দিলেন তাঁর দুটি ডানা। কবিতার সাথে ভাসিয়ে দিলেন নিজেকে পূর্ব পশ্চিমে দীগন্তের পানে। আরও রসিয়ে বললে, মহাকাব্যের সূচনা হলো।

বিমানে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তখনও তিনি মাটি থেকে বেশ খানিকটা ওপরে।

আমরা আবার কাব্য ছেড়ে মূল ঘটনায় ফিরি। বেশ খানিক্ষণ তিনি সফলভাবে আকাশে উড়লেন। কোনো বরাতে ১০ মিনিটের কথা উল্লেখ আছে। দ্য ভিঞ্চিকে হার মানিয়ে ইবনে ফিরনাস আকাশে উড়ছেন।

পাঠকের জানার কথা, দ্য ভিঞ্চিও একজন চিত্রশিল্পী, কবি এবং বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনিও আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখতেন। শখ করে আস্ত একটা বিমান বানিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিমান উড়তে পারত না। ইবনে ফিরনাস কিছুক্ষণ পর লক্ষ করলেন বিমানে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। তখনও তিনি মাটি থেকে বেশ খানিকটা ওপরে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সমস্যাটা ঠিক ধরতে পারছেন না। তাই গ্লাইডারকে ধীরে ধীরে নামিয়ে এনে খুব সাবধানে নামতে এসেও দুঘর্টনার শিকার হলেন। পিঠে গুরুতর আঘাত পেলেন। প্রতিটা মহাকাব্যের শেষেই ট্রাজেডি থাকে। আমাদের গল্পের নায়ক এই কাব্যের রচয়িতা হয়েও এ ট্রাজেডি থেকে নিজেকে ফেরাতে পারলেন না।

বাগদাদে আব্বাস ইবনে ফিরনাসের নামে একটা বিমানবন্দর আছে। সেখানে তার একটা প্রতীকী মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। লিবিয়ায় তাঁর সম্মানে স্ট্যাম্প আছে। যাই হোক, এই মহান বিজ্ঞানীর জীবন নিয়ে আমরা সামান্য আলোচনা করলাম। এখানে কয়েকটা তথ্য বলে রাখা ভাল। কারও কারও মনে আরমেন ফিরমান বলে আসলে কেউ নেই। এটা আব্বাস ফিরনাসের ল্যাটিন অপভ্রংশ। হতে পারে।

আরমেন ফিরমান আর আব্বাস ফিরনাস এক ব্যক্তি কিনা তা জানার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে একজন মানুষ দৃঢ় সংকল্প আর কতটা সাহসী হলে দু:সাধ্য কোনো কাজ নিমিষেই করে দেখাতে পারে সেই বিষয়টা অত্যন্ত জানা গেল এই গল্প থেকে।


দ্বিতীয় পর্বে অত্যাধুনিক উড়াল প্রযুক্তি নিয়ে আরও কিছু বিষয় আমরা তুলে আনবো, ইনশাআল্লাহ।

[জন এইচ লিয়েনহার্ডকৃত, এনজিন্স অব আওয়ার ইনজেনুইটি, ১৯১০ ভলিউম এবং অন্তর্জাল]

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com