২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা সফর, ১৪৪২ হিজরী

মাস্কের ইতিহাস

মাস্কের ইতিহাস

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : বর্তমানে করোনা প্রতিরোধে অনেকে সচেতন হয়ে সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করছেন। এটি খুবই সহজলভ্য ছিল (করোনার আগে), সাথে সস্তাও। পাশাপাশি সহজে ব্যবহারও করা যায়। এই অসাধারণ মাস্কের উদ্ভাবক ছিলেন একজন ফরাসি সার্জন ডা. পল বার্জার (১৮৪৫-১৯০৮)। তিনি ছিলেন সে সময়কার প্যারিসের ‘ফাকাল্টে দে মেডিসিনে’র (মেডিসিন ফ্যাকাল্টি) ক্লিনিক্যাল সার্জারি আর প্যাথলজির অধ্যাপক। তিনি তেনন হাসপাতালে সার্জন হিসেবে প্র্যাকটিস করতেন।

ডা. বার্জার অনেক দক্ষ একজন সার্জন ছিলেন। প্রতিটি অপারেশনের আগে অবশ্যই একটি জীবাণুমুক্ত পরিবেশ রক্ষার চেষ্টা করতেন। সবগুলো যন্ত্র এবং তার গাউন অনেক সাবধানে জীবাণুমুক্ত করতেন। তারপরও কিছু রোগীর খুব মামুলি অপারেশনেই ইনফেকশন হয়ে যেত। খুব সাধারণ একটি ইনফেকশন ছিল ‘অ্যালভিওলার এবসেস’। সে সময়ের আর একজন ফরাসি প্যাথলজিস্ট কার্ল ফ্লাজে আবিষ্কার করেন যে, মানুষের লালায় জীবাণু থাকে এবং সেখান থেকেও জীবাণু ছড়াতে পারে।

ডা. বার্জার লক্ষ্য করেন যে, সার্জারি করার সময় তার মুখ থেকে অনেক ড্রপলেট রোগীর শরীরে যাচ্ছে কিংবা আশেপাশে ছড়াচ্ছে। তখন তার মনে হলো, তাহলে এটাই তার রোগীদের অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশনের মূল কারণ। আবার তিনি নিজেও ডেন্টাল পেরিওডেনাইটিসে ভুগছিলেন। যার উৎস তিনি ধরতে পারেননি শুরুতে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার থেকে যাতে ইনফেকশন ছড়াতে না পারে কিংবা তিনি কোনো রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু দিয়ে আক্রান্ত না হন। এজন্য জীবাণু থেকে নাক ও মুখের নিরাপত্তা দিতে হবে। শুরু হয়ে গেল তার ভাবনা।

এরপর ১৮৯৭ সালের অক্টোবরে ডা. বার্জার বানিয়ে ফেললেন গজ দিয়ে ছয় স্তরের আয়তাকার একটি কাপড়ের টুকরো। এর চারদিকে ছিল কঠোরভাবে জীবাণুমুক্ত করা লিনেন কাপড়ের অংশ। তার দাড়িকে যাতে আরও ভালো করে ঢেকে রাখে। আর নাকের অংশে কাপড়টা যাতে আটকে থাকে। সেজন্য ফিতা দিয়ে পেছনে বাঁধা থাকত। ব্যস, এটাই ছিল দুনিয়ার প্রথম সার্জিক্যাল মাস্ক। নিজের এ উদ্ভাবনকে তিনি টানা পনেরো মাস ব্যবহার করেন প্রতিটি সার্জারিতে। এতে খেয়াল করলেন যে, ইনফেকশন হওয়ার হার আগের চেয়ে বেশ কমেছে। যদিও অনেক ডাক্তার প্রথমে মানতে নারাজ ছিলেন মাস্ক পরতে। কিন্তু ১৮৯৯ সাল থেকে প্যারিসের সার্জিক্যাল সোসাইটি একদম কঠোর নিয়ম করে দেয়, প্রতি অপারেশনে এটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার। এরপর আরও অনেক পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়ে বর্তমান চেহারায় আসে এ মাস্ক। মাস্কের ব্যবহার এখন বহুগুণে বেড়েছে। কিন্তু নিয়ম মেনে কতজন মাস্ক পরেন?

এ বিশ্ব মহামারীর সময়ে রোগী, জরুরি পেশাজীবী ও সাধারণ জনগণ- নির্বিশেষে সবাইকে বের হওয়ার সময় মাস্ক পরতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেকেই তা মানছেন আবার অনেকে মানছেন না। আবার দেখা যায়, যারা মানছেন, তাদের মধ্যে একাংশ আছেন; যারা নিয়ম মেনে মাস্ক পরছেন না। কোনরকম মাস্ক পরলেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রয়োজন শেষে তা খুলছেন না।

সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে মাস্ক ব্যবহারের সময় কিছু নিয়ম অনুসরণ করা উচিত, যেমন-

১. মাস্ক পরা, খোলা বা ধরার আগে ও পরে অবশ্যই সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে।

২. মাস্কের যে অংশ আমাদের মুখের সংস্পর্শে থাকে, সেখানে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে (ধোয়ার সময় ছাড়া)। আর বাইরের অংশে কখনো হাত লাগলে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।

৩. করোনাভাইরাস যেহেতু মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, সেহেতু মাস্ক পরতে হলে অবশ্যই নাক ও মুখ ঢেকে পরতে হবে এবং একদমই তা নাক-মুখ থেকে নামানো যাবে না। একটি কথা খেয়াল রাখতে হবে, মাস্ক কোন লজ্জা নিবারণের বস্তু নয়। এটা আমাদের শ্বাসতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য ব্যবহার্য পর্দা। যেহেতু বর্তমানে উপসর্গ ছাড়াই অনেকে সংক্রমিত হচ্ছেন। তাই সুরক্ষার জন্য অবশ্যই নাক-মুখ ভালো করে ঢেকে মাস্ক পরতে হবে।

৪. মাস্ক ব্যবহারের এ পয়েন্টটি সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সবচেয়ে বেশি লঙ্ঘন করা হয়। দেখা যায়, মাস্ক পরে বাইরে বের হলেও ফাঁকা রাস্তায় পরে থাকলেও অন্য ব্যক্তির সাথে কথা বলার সময় হরহামেশাই মাস্কটা খুলে ফেলা হয় বা নাক-মুখের নিচে নামিয়ে ফেলা হয়। এটা আসলে বোকামি ছাড়া কিছু নয়। একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, মাস্ক পরলে অকারণে তা খোলা যাবে না। মানুষের সামনে একদমই না।

৫. বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মাস্ক একবার পরলে সেটা বাসায় ফেরার আগে খোলা উচিত নয়। এটি হয়তো মেনে চলা সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু বিষয়টি খুবই জরুরি। একান্তই খুলতে হলে এমনভাবে খুলে ফেলুন যেন মাস্কের সামনে বা ভেতরে হাত না লাগে। অর্থাৎ মাস্কের শুধু ফিতা ধরে খুলুন। লক্ষ্য করুন, মধ্যবর্তী সময়ে থুতনিতে রাখার জিনিস না এটি। কারণ করোনা আক্রান্ত কারো থেকে জীবাণু আপনার থুতনিতে বা নাকে-মুখে এসে লাগবে না, এমন কোন নিশ্চয়তা নেই।

৬. যে মাস্ক বারবার ব্যবহার করছেন, তা আলাদা করে রাখুন। কাপড়ের মাস্ক হলে বাসায় ফিরে সাবধানে খুলে সাবান-পানিতে চুবিয়ে রাখুন ৫-১০ মিনিট। ডিস্পোজেবল মাস্ক হলে বাসায় এসেই আলাদা বিনে ফেলে দিন। উন্নতমানের মাস্ক যা বারবার ধোয়া সম্ভব না। তা এমনভাবে (কাগজের প্যাকেট, বাক্স, আংটা) আলাদা করে রাখুন, যাতে কোনকিছুর সংস্পর্শে না আসে। প্রতিটি মাস্ক অবশ্যই আলাদা রাখবেন।

৭. একেবারেই মাস্ক ব্যবহার না করা থেকে নাক ও মুখ ঢেকে রাখে এরকম যেকোন রকমের মাস্ক অবশ্যই অধিক সুরক্ষা দেবে- ১% বেশি হলেও দেবে। পাশাপাশি হাত ধোয়া, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা- এসব বিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে৷

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com