৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

মাহে রমজান: আমলের বসন্তকাল | মুস্তাকিম বিল্লাহ

‘তোমরা নেকির কাজে এবং তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ -সূরা মায়েদা। আয়াত : ০২

সময়ের বিবর্তনে বছর ঘুরে মুমিনের দোরগোড়ায় হাজির হয়েছে মহিমান্বিত মাহিনা রমাজান। এ মাস মুমিন বান্দাদের জন্য রহমত স্বরূপ। আমলের বসন্তকাল। পূর্ণ বছর আমলের ময়দানে পিছনে পড়া মানুষের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে এই মাসে।

রমজানুল মোবারক হলো আমলের প্রতিযোগিতার মাস। এইমাস যেমন সীমাহীন গুরুত্ব বহন করে, তেমন গুরুত্বপূর্ণ অনেক আমল রয়েছে এই মহিমান্বিত মাহিনায়। যার দ্বারা মুমিন বান্দারা পৌঁছে যায় শিকড় থেকে শিখরে।

রমজানুল মোবারকের প্রধান আমলসমূহ:
১. রমজানুল মোবারকের প্রধান আমল সিয়াম পালন করা। একনিষ্ঠ ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে রমজানের দিনে আহার-পানীয় এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকাকে রোজা বলে।
(হেদায়া, ১খন্ড পৃ: ২১৬)

কুরআনের আলোকে রোযার প্রামাণ্যতা:
‘হে মুমিনগণ!তোমাদের প্রতি রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিলো,যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।’
(সূরা বাকারা,আয়াত নং ১৮৩)

‘রমযান মাস-যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা আদ্যোপান্ত হেদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলী সম্বলিত যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চুড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই এই মাস পাবে সে যেন এ সময় অবশ্যই রোযা রাখে।’
(সূরা বাকারা,আয়াত নং ১৮৫ )

হাদীসের আলোকে রোযার প্রামাণ্যতা:
হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, যখন রমজান মাসের আগমন ঘটল, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, ‘তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমজান এসেছে। আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য এ মাসের রোযা ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানদেরকে শিকলে বন্দী করা হয়। এ মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল, সে তো প্রকৃতপক্ষেই বঞ্চিত।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৭১৪৮; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৪১৬)

রোযার ফজিলত:
হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন রমযান মাসের আগমন ঘটে, তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় আর শয়তানদেরকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (বুখারী, পৃ:২৫৫)

অন্যেত্রে হযরত জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাআলা রমযান মাসে প্রতি ইফতারের সময় অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন, প্রতি রাতেই তা হয়ে থাকে।’
(ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬৪৩)

২. সাহরী করাও একটি ইবাদত।
রোযা রাখার নিয়তে রাতের শেষভাগে সুবহে সাদিকের পূর্বে গৃহীত আহার্যকে সাহরী বলা হয়।
হাদীস শরীফে হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন “তোমরা সেহরী গ্রহণ কর কেননা তা বরকতপূর্ণ খাবার।”
(বুখারী শরীফ, হাদীস ১৪৬, তিরমিজি পৃ: ১৫০)

৩. ইফতার গ্রহণ করা এবং অন্যকে ইফতারি করানো সাওয়াবের কাজ।
পূর্ণদিবস রোযা রেখে সূর্যাস্তের পর গৃহীত খাদ্য-পানীয়কে ইফতার বলে।
কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে ‘সুবহে সাদিক হতে রাত অবধি রোজা পূর্ণ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৭)

সূর্যাস্তের পর কালবিলম্ব না করে ইফতার গ্রহণ করা সুন্নত। ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকেরা ততক্ষণ কল্যাণে থাকবে যতক্ষণ তারা ইফতার জলদি করবে।’ (বুখারী, মুসলিম ১ খণ্ড-পৃঃ৩২১, মিশকাত, পৃঃ১৭৫)

ইফতারি সামনে রেখে দোয়া মাগফিরাত কামনা করা উত্তম আমল। খেজুর দিয়ে ইফতারি করা সাওয়াবের কাজ।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.) নামাজের আগে ইফতার করতেন কয়েকটি টাটকা খেজুর দিয়ে। যদি তিনি টাটকা খেজুর না পেতেন তাহলে শুকনা খেজুর (খুরমা) দিয়ে ইফতার করতেন। আর তাও যদি না পেতেন, তাহলে কয়েক ঢোক পানি পান করে নিতেন। (আবু দাউদ, তিরমিজি)

ইফতারের ফযিলত:
হযরত যায়েদ ইবনে খালেদ আল জুহানী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতারি করাবে তার জন্য রোজাদারের সমপরিমাণ সাওয়াব নির্ধরিত রয়েছে। রোজাদারের সাওয়াব থেকে কিঞ্চিত পরিমাণ কর্তন করা ব্যতিত। (তিরমিজি পৃ:১৬৬)

হজরত যায়েদ ইবনে খালেদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে অথবা কোন যোদ্ধাকে জিহাদের সামগ্রী দ্বারা সজ্জিত করে দেবে তার জন্যও তার অনুরূপ সাওয়াব রয়েছে।’ -(বায়হাকী)

৪. অধিক পরিমাণে কুরআনুল কারিমের তেলাওয়াত করা রমজানুল মোবারকের অন্যতম আমল। রমজান কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসে কুরআন তেলাওয়াতের সাওয়াবও অন্য মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

হযরত উসমান গনি রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম ও ব্যক্তি যে কুরআনুল কারিম নিজে শেখে এবং অন্যকে শেখায়।’ (বুখারী, পৃ:৭৫২)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কুরআন তেলাওয়াতকারী প্রতি হরফে দশটি করে নেকী পায়। আমি এ কথা বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম সবগুলো মিলে এক হরফ; বরং আলিফ এক হরফ, লাম এক হরফ, মীম আরেক হরফ।’
(মেশকাত,পঃ১৮৬)

৫. সাধ্যমত অধিক পরিমাণে সদকার হাত প্রসারিত করাও রমযানের বিশেষ একটি আমল।
সদকা পার্থিব জীবনে যেমন কল্যান বয়ে আনে তদ্রুপ মৃত্যু পরবর্তী সময়ে হয় জান্নাতের পাথেয়। হাদীসে নিচের হাতের তুলনায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে উপরের হাতকেই। পরস্পরে প্রতিযোগিতা করতে বলা হয়েছে সদকার ব্যপারে।

হযরত আলী ইবনে আবু তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সদকা প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করো। কেননা বালা-মুসিবত সদকাকে অতিক্রম করতে পারে না।’ (মেশকাত, পৃ: ১৬৭)

হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সদকা আল্লাহ তায়ালার ক্রোধেকে মিটিয়ে দেয় এবং খারাপ মৃত্যু থেকে রক্ষা করে।’(মেশকাত, পৃ:১৬৮)

হযরত মারসাদ ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন মুমিনের জন্য শীতল ছায়া হবে তার কৃত সদকা।’ (মেশকাত, পৃ:১৭০)

রমজানুল মোবারক পেয়ে পিছিয়ে থাকা বান্দা যদি এগুতে না পারে তার সম্মুখপানে। পৃথিবীতে তার মত হতভাগা আর নেই । রমজান আমলের ভরা মৌসুম। তাই রমজানের আমলে ভারি করতে হবে জিন্দেগির আমলনামা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করতঃ রমজানের বরকত হাসিল করার তৌফিক দান করুন। আমীন

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com