১৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং , ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

মায়ের সঙ্গে ঈদ

এই সময় । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

মায়ের সঙ্গে ঈদ

ক’জনের এই সৌভাগ্য হয়। কে বা পারে! কার নসীবে এটা আছে। মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ- অনুকম্পায় এবার মায়ের সাথে ঈদ করার সুযোগ পাচ্ছি। আলহামদুলিল্লাহ। একদিকে মনটা ভীষণ খারাপ। আবার আরেকদিকে আনন্দ। মনটা খারাপ একারণে, বায়তুল্লাহ এর সফরের সব কিছু প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে নাকচ হয়ে গেল। মনের ভিতরে বেদনা বেড়ে গেল। এটা এমন ব্যাথা- বেদনা, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই আন্দাজ করতে পারবেন।

বাড়িতে সর্বশেষ কোরবানীর ঈদ মায়ের সাথে করেছিলাম ১৯৮৫ সনে। এরপর আর সময় হয়নি। মাদ্রাসাতে কেটে যাচ্ছে জীবনটা। মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর আর কোরবানীর ঈদে বাড়ীতে আসা হয়নি। প্রত্যেক কোরবানীতে মাদ্রাসাতেই কেটে গেছে। আবার হজ্জের সফর শুরু হলে কোরবানী হয় মক্কা শরীফে। যার কারণে মায়ের পাশে থাকা হয় না। এবার একটা সুবর্ণ সুযোগ। হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে না যেতে পারলেও বাড়িতে মায়ের সাথে সময় কাটাতে পারছি।

এক নিয়ামত ছুটে গেলেও আল্লাহ তায়ালা আরেক নিয়ামতে ভরে দিয়েছেন। মায়ের সাথে ঈদ। মনেহয় এটা সেরা ঈদ আমার। ঈদে মায়ের দুআ – ভালবাসা কাছে থেকে পাব ইনশাআল্লাহ।

ক’জন মানুষের ভাগ্যে আছে এমন নেয়ামত। “মা’ তো “মা”। মায়ের মত আপন কেহ হয়না। বয়সে “মা” অনেক দুর্বল এবং শয্যাশায়ী হলেও সে তো আমার “মা”। আমার জান্নাত লাভের বড় মাধ্যম। আমার কামিয়াবীর এক সোপান। দুনিয়া- আখেরাতে উন্নতির চাবিকাঠি আমার “মা”।

হাদীসে আছে, ” আল জান্নাতু তাহতা আকদামিল উম্মাহাত” অর্থাৎ, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।

জান্নাত পেতে হলে মা- বাবার অনুগত হওয়া, মায়ের খেদমত, বাবার খেদমতে নিজেকে সঁপে দিতে হবে। বাবা- মার অবাধ্য হলে কিন্তু সে সন্তান জান্নাত পাওয়াটা অনিশ্চিত। এমনকি বেঈমান হয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার আশংকা।

আল্লামা তকী উসমানী দামাতবারাকাতুহুম তাঁর “ইসলাহী খুতুবাত ” দ্বিতীয় খন্ড এর মধ্যে স্বীয় পিতা আল্লামা মুফতী শফি রহ,, এর বরাত দিয়ে একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন, এক ব্যক্তি মৃত্যু শয্যায় শায়িত, তাকে কালিমার তালকীন দেওয়ার জন্য এক বুজুর্গকে ডাকা হল, কিন্তু যখনই কালিমা পড়ানো হয়, তখন তার মুখ থেকে কালিমা উচ্চারিত হয় না। তখন ঐ বুজুর্গ বলেছিলেন, এর কি বাবা- মা কেউ বেঁচে আছে? বলা হল জীবিত আছে। তখন তিনি বললেন, একে মা- বাবার কাছে কৃত অন্যায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করানো হোক। কেননা, সে বাবা- মার অবাধ্যতার কারণে তার মুখ দিয়ে কালিমা উচ্চারিত হচ্ছেনা।

বড় ভয়াবহ ব্যাপার। মা- বাবার অবাধ্য সন্তান দুনিয়া- আখেরাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। সে কোনদিন সফল হতে পারবেনা। সফলতা লাভ করতে হলে চাই বাবা- মার দুআ ভালবাসা।

এজন্য প্রতিটি সন্তানের জন্য চাই মায়ের অনুগত হওয়া। বাবার অনুগত হওয়া। তাছাড়া কামিয়াবী সম্ভব নয়।

পবিত্র কুরআনের সুরা বণী ইসরাইলে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, ” ওয়াবিল ওয়ালিদাইনে ইহছানা”
তোমরা মা- বাবার সাথে সৎব্যবহার কর”।

আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন। বাবা- মায়ের সাথে সদাচারণ করতে বলেছেন। সুতরাং এখানে পিছনে থাকা চলবেনা।

আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি, আল্লাহ তায়ালা এখনও মায়ের মত নেয়ামত জীবিত রেখে আমাকে ধন্য করেছেন। বাবাকে হারিয়েছি প্রায় ১১ বছর। এখন শুধু মা। তবে এই নেয়ামত কতদিন থাকবে তিনি ভাল জানেন।

তবে মায়ের দুআ – ভালবাসা যেন পাই। মায়ের শিয়রে থাকতে পারি। তাঁর খেদমত করে যেতে পারি। এটাই কিন্তু বড় কামনা আমার।

আজ মক্কায় হয়ত থাকতাম। আরাফা- মুযদালিফা সেরে মিনার তাঁবুতে ফিরে কংকর নিক্ষেপের পরে কোরবানী দিতাম। একটা হজ্জ হয়ে যেত।তবে এবার যেহেতু যেতে পারলাম না। এবার মায়ের পাশে। মায়ের খেদমতে।

এই তো একটু আগে মায়ের বিছানার পাশে বসে ছিলাম। শরীরটা তাঁর খুব দুর্বল। স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। স্যালাইন চলছে। “মা” দুর্বল হলেও নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে, আমিতো মায়ের পাশে। একটু মায়ের মাথায় হাত বুলালাম। ভাল লাগল। “মা” সু-নজরে আমাকে দেখল। মনটা যেন ভরে গেল। আবার এদিক- ওদিক গেলে “মা” আমাকে স্মরণ করছে। আবার গিয়ে মায়ের শিয়রে বসছি। প্রশান্তি পাচ্ছি। “মা” অসুস্হ, তারপরেও ভাল লাগছে, কেননা, মনে হচ্ছে, “মা” আমাদের ঘর আলোকিত করে রেখেছেন। তিনি না থাকলে হয়ত অন্ধকার হয়ে থাকত।

তাই এক কবি বলেছেন,
” মা নেই গৃহে যার
সংসার অরণ্য তার
দেখিলে মায়ের মুখ
মুছে যায় সব দুঃখ”

“মা” আছে, আমার যেন সব আছে। যার “মা” নেই,তার যেন কিছুই নেই। এজন্য বড় ভাগ্যবান মনেহয় আজো।

দীর্ঘদিন পরে মায়ের সাথে ঈদ করতে পারলেও তবে কিছু কিছু জিনিস অপুরনীয় থাকবে। ওটা হয়ত আর কোনদিন ফিরে পাব না। সেটা হল, মায়ের হাতের রান্না। মার হাত দিয়ে তুলে দেওয়া খাবার।

এই কোরবানী ঈদ আসলে যখন মা গোস্ত রান্না করত, তখন আমি চুলার পিঠে গিয়ে বসে থাকতাম। গোস্তগুলো মসলা দিয়ে যখন কষানো শুরু হত, মা আগেই একটা টুকরা আমার মুখে তুলে দিতেন। গোস্ত সিদ্ধ হয়নি ভালভাবে। তারপরেও মায়ের ছিল ভালবাসা। এভাবে পুরো রান্নার সময়টা মায়ের পাশে ঘুরঘুর করতাম, আর মা আমাকে বারবার এটা – সেটা খাওয়াতেন।

এবার মিস করব মায়ের সে ভালবাসা।” মা” আজ সারাদিন বিছানায় শোয়া। অনেক দুর্বল। সকালে একবার ডাক্তার এসেছিলেন। তবুও “মা” এর দুর্বলতা কাটছেনা। কালকে ঈদ। ” মা” সুস্হ হোক, ভাল থাকুক। তাঁর হায়াত দীর্ঘ হোক, এটাই চাই।

সেই সাথে সকল বন্ধুদের মা- বাবার জন্য দোয়া কামনা করি, যাদের বাবা- মা বেঁচে আছেন, তাঁদেরকে মহান আল্লাহ সুস্থ রাখুন। যারা দুনিয়া ত্যাগ করেছেন, তারা জান্নাতবাসী হোন। এই কামনা। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com