২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৭ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

মা ছিলেন জনম দুখিনী

মা ছিলেন জনম দুখিনী

সগীর আহমদ চৌধুরী :: মা ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, জমিদার ও সেই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শিক্ষিত বংশের কন্যা। নানা ভাই সমাজের সরদার ছিলেন, বংশগতভাবে মাতুব্বর, জমিদার ও ব্যবসায়ী। আমাদের মামা ও মায়েদের শৈশব কেটেছে অনেকটা সুখ, সমৃদ্ধি ও আভিজাত্যে। মৃত্যুর সময় মায়ের বয়স ছিল ৭৭ বছর, ১৯৫৭-১৯৫৯ সালের মধ্যে মায়ের বিয়ে হয় বলে ধারণা করা হয়। সে হিসেবে বিয়ের সময় মায়ের বয়স হয়েছিল ১৪ থেকে ১৬। মা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন, কুরআন ও দীনিয়াত শিক্ষার পাশাপাশি উরদু-ফারসিও শিখেছিলেন পারিবারিকভাবে।

মায়ের বিয়েও হয়েছিল একই মর্যাদাসম্পন্ন বংশে। আমাদের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়া মহকুমা থেকে ১৮৯০ সালের দিকে। পূর্বপুরুষদের মধ্যে সর্বোর্ধ্বতন যে ব্যক্তিটির নাম আমরা জানতে পারি তিনি হচ্ছেন মরহুম কমর আলী চৌধুরী। তাঁর সন্তানদের মধ্যে একজনের নাম ছিল মরহুম মুশরফ আলী চৌধুরী। এই মুশরফ আলী চৌধুরী পটিয়া থেকে হিজরত করে বাঁশখালীর গন্ডামারায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন পটিয়ার জনৈক জমিদার যোগেন্দ্র নাথের তালুকদারি নিয়ে। তাঁর থেকে আমাদের বংশপরস্পরা হচ্ছে, আমাদের পিতা মাওলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী ইবনে সালামত আলী চৌধুরী ইবনে নেজামত আলী চৌধুরী ইবনে মুশরফ আলী চৌধুরী ইবনে কমর আলী চৌধুরী।

আমাদের দাদা ভাই ছিলেন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, জাহাজের সারেং ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে দাদা ভাই সেই চট্টগ্রাম থেকে বোম্বাই হয়ে বসরা পর্যন্ত জাহাজে করে সমুদ্র সফরে থাকতেন। দাদী ছিলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত মাওলানা রমজান আলী (রহ.)-এর কন্যা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দাদা ভাই শেষজীবনে সর্বশান্ত হয়ে যান। তার কারণ হচ্ছে নানা বংশীয় লোকজনের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত এবং বিভিন্নভাবে মামলার জালে জড়িয়ে দেওয়া। অন্য দিকে দাদা ভাই ছিলেন অনেক বেশি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ। পরিবারের ইতিবৃত্ত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আমাদের বড় ভাই মাওলানা আনিস আহমদ হাফিযাহুল্লাহর বর্ণনা মতে, দাদা ভাইকে নাকি কোনো এক সামাজিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেওয়া হয়নি, এতে তিনি অসম্মানবোধ করেন এবং এর প্রতিক্রিয়ায় তিনিও গরু-মহিষ জবেহ করে শত শত মানুষকে খাইয়ে দেন।

দাদা ভাইয়ের নানা বংশের লোকজনের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত ও মামলাবাজির কারণে দাদা ভাই দিশেহারা ছিলেন। এসব কারণে দাদা ভাই অপরিণত বয়সেই ইন্তিকাল করেন। তিনি ইন্তিকাল করেছিনে ১৯৬৩ সালে, তাঁর ইন্তিকালের এক বছর পরেই দাদীও মারা যান। আমাদের বড় ভাই যাঁর বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি তিনি দাদা ভাইকে পেয়েছিলেন বাচ্চা বয়সে। তিনি ও আমাদের জেঠাত ভাই রমজান আলী ছাড়া আমাদের মায়ের অন্য ১০ জন সন্তানের কেউ দাদা-দাদীকে দেখেনি। মোটামুটিভাবে তখন পারিবারিক অবস্থাটা খুব ভালো ছিল না। আগের মতো সমৃদ্ধি, সুখ ও সৌখিনতা বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট ছিল না। এসব সত্ত্বেও খান্দানিভাবে সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান হিসেবে বাবার সাথে মায়ের বিয়ে হয়েছিল।

আমাদের বাবারাই গ্রামে একমাত্র শিক্ষিত ছিলেন। জেঠা ও আমার বাবা ছিলেন স্কুলের শিক্ষক, মাদরাসা থেকে উলা পাশ। আর মেঝ জেঠা ছিলেন ডাক্তার। তবে বাবা ছিলেন পুরুষসুলভ কর্তৃত্বশালী ব্যক্তিত্ব। অন্যদিকে মা ছিলেন বংশগতভাবে আত্মমর্যাদাসম্পন্না স্বাধীনচেতা মেয়ে। এ কারণে তাঁরা উভয়ের মধ্যে মনোমালিন্য হতো, বেশ বাদানুবাদ হতো। বাবা কৃপণ ছিলেন না বটে, কিন্তু খুবই হিসেবি ছিলেন। পরিবারে মা-ও নানাভাবে অর্থের যোগান দিতেন, কিন্তু মায়ের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না। বাবা ছেলে-সন্তানদের জন্য দু’হাতে খরচ করতেন, কিন্তু সে তুলনায় মায়ের প্রতি তিনি উদাসীন ছিলেন। বাবা খাবার-দাবারে বেশ বিলাসী ছিলেন, কিন্তু মাযের প্রয়োজনীয়তার প্রতি খুব যত্নশীল ছিলেন না। যতটুকু অনুভব করেছি, মায়ের জন্য এটা ছিল সারাজীবনের দুঃখ।

বাবা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, বাড়ি এসে গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কোচিং করাতেন, হালচাষ করতেন, জাল বুনতেন, বাঁশ দিয়ে নানা ধরনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র বানাতেন, কাট দিয়ে খাট-পালংসহ নানা আসবাবপত্র তৈরি করতেন, খাট-পালং-আলমারি ও দরজায় কারুকাজের কাজ করতেন, রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন, হোমিও ডাক্তারি করতেন। এক কথায় বাবা ছিলেন সবকাজের কাজী, তাঁর কাছে সব ধরনের যন্ত্রপাতি ছিল। আমাদের মা ছিলেন বাবার এই সকল কাজের সহযোগী। আমরা ভাই-বোন মিলে সর্বমোট ১১জন ছিলাম। মায়ের বিয়ের ত্রিশ বছরের মধ্যে তাঁদের জন্ম। এতোগুলো সন্তানের জন্মদান, লালন-পালনের পাশাপাশি তাঁকে বাবার এসব কষ্টসাধ্য কাজেও সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করতে হতো। মায়ের সেই সময়টা যে কতোটা অবর্ণনীয় কষ্টসাধ্য ছিল আল্লাহই মালুম।

বাবার পর মা-ই ছিলেন আমাদের পরিবারে আয়ের বড় উৎস। বাবা হালচাষ করতেন, আমাদের গ্রামে বছরে তিনবার ধানের চাষ হতো। ধানগুলো কেটে উঠোনে আনা হলে সেগুলো গরু দিয়ে মাড়ানো, ধান শুকানো, আবার সেগুলো ঠেকিতে তুলে চাল বের করা ইত্যাদি কাজে মা-ই ছিলেন প্রধান কর্তা। হালচাষের জন্য আবার ঘরে কয়েক জোড়া গরু পালিত হতো। সেগুলোকে সকালে ওঠে ঘাষ-ভুষি দিতে হতো, গরুর গোবর পরিষ্কার করতে হতো, গোবর শুকিয়ে জ্বালানী তৈরি করতে হতো, কাচা ঘাষ কেটে খাওয়াতে হতো, সবই করতেন আমাদের জনম দুখিনী মা। আমাদের বাড়িটা অনেক বড়, চার দিকে পুকুর, সেখানে মা মাছের চাষ করতেন। ভিটায় নানা ধরনের শাক-সবজির চাষও করতেন তিনি, তা আমাদের পরিবারের চাহিদা জোগান দেওয়ার পরও বেচা যেতো। এসবের পাশাপাশি মা আমাদের দুধের চাহিদা পূরণের জন্য মাদি ছাগল পালন করতেন। তিনি অংসখ্য হাঁস-মুরগি পালন করতেন। সেগুলো ডিম দিতো, পরিবারে মাংসের জোগান দিতো। এতোসব কাজ করতেন মা একাই। বলতে গেলে মায়ের সময় বাইর থেকে আমাদের তেমন কিছুই কিনতে হতো না, সপ্তাহের রোববার ও বুধবার বাবার দুই কেজি গরুর মাংস কেনা ছাড়া। আজকে আমাদের পরিবারে চার চারটা বউ, কিন্তু সবকিছু্ই কিনতে হয়, যখন মা একা ছিলেন তখন এসবের অনেক কিছুই কিনতে হতো না।

পারিবারিকভাবে ধন-সম্পদ ও ঐশ্বার্যে কাটানো একজন মেয়ে কিভাবে এতো দুঃখ-কষ্ট সয়ে নিজেকে স্বামী-সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করতে পারেন তার অনন্য উদহারণ হচ্ছেন আমাদের মা। মা জীবনে সুখের দেখা তেমন একটা পাননি। মায়ের জীবনে একটুখানি সুখের দেখা মিলেছে ২০০০ সালের পর যখন পরিবারের হাল অনেকটা আমার বড় ভাই মাওলানা আনিস আহমদ হাফিযাহুল্লাহর হস্তগত হয়। কিন্তু সেই সুখ তাঁর বেশি দিন টিকেনি, তাঁর বাবা ইন্তিকাল করেন, স্বামী মারা যান, তাঁর দুই দুইজন তরতাজা সন্তানও ইহকাল ত্যাগ করেন। ২০০০ সালের পর মাত্র ছয়-সাত বছরে এতোগুলো মৃত্যু মা-কে অনেকটাই ভেঙে দিয়েছিল। তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন আমাদের প্রিয় মেঝ ভাই জমিল আহমদ ও একদম ছোট ভাই জুনাইদ আহমদের ইন্তিকালে। তাঁদের কথা মা ভুলতেন না কখনো, মাঝে মাঝেই হাহাকার করতেন তিনি, তাঁর হৃদয়ের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যেতো।

পরিবারের হাল বড় ভাইয়ের হস্তগত হলে মা আরও বেশি মিতব্যয়ী হয়ে যান। মা কখনো তাঁর প্রয়োজনীয়তা ছেলেদের কাছে প্রকাশ করতেন না, ছেলেদের কাছে কিছুই চাইতেন না। বরং পুকুরে মাছ চাষ করে তা থেকে ছেলেদের কাছে পাঠাতেন। বাড়িতে শাক-সবজি চাষ করে সেসব বিক্রি করে তার প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে কিছু টাকা হাতে রাখতেন, তাঁর নাতিরা ঈদে-পরবে বাড়িতে গেলে তাদের সবাইকে তিনি সেই টাকা থেকে ঈদের সেলামি দিতেন। মায়ের শরীরে তেমন রোগ-ব্যাধিও ছিল না, তাঁর একমাত্র রোগ ছিল বাত-ব্যাথা। এসবের জন্য মা সবসময়ে আমাদের এক ডাক্তার বড় ভাই মাওলানা ডা. হুসাইন আজাদ সাহেব থেকে ওষুধ নিতেন। তাঁকে প্রথমবারের মতো বড় ডাক্তার দেখানো হয় সম্ভবত ২০১৫-১৬ সালের পর। তাও অনেকটা মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে।

মা ইন্তিকাল করেন ৪ সেপ্টেম্বর’২০ (শুক্রবার)। তখন তাঁর শরীরে একমাত্র অসুখ ছিল পায়ের পছন। এছাড়া ডাক্তারি রিপোর্ট মতে, তাঁর অন্য কোনো অসুখ ছিল না। ডায়বেটিস, কিডনি, হৃদরোগ, প্রেসার, ক্যান্সার কোনো কিছুই ছিল না তাঁর। তিনি চোখে ভালোভাবেই দেখতে পেতেন, স্মৃতিশক্তিও সম্পূর্ণ অটুট ছিল। মৃত্যুর একদিন আগ থেকে তাঁর জবানে জড়তার সৃষ্টি হয়। এর আগ পর্যন্ত তাঁর কথা-বার্তা স্পষ্ট ছিল, আমাদের যেকারো কথা শুনে তিনি বলে দিতে পারতেন, আমি বা আমরা কে কোনজন। চেহেরা দেখে চিনতে পারতেন। মায়ের ‍মুখে দুটি শব্দ ছিল, ‘অ আল্লাহরে’ ও ‘অ মারে’। মাকে যখন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন মায়ের কানে কানে আমি অশ্রুসজল নয়নে কালেমায়ে তাইয়িবা পাঠ করেছিলাম, মা এটা শুনে কালিমায়ে তাইয়িবা, শাহাদত, তাওহীদ, মুফাসসল, মুজমল, চার কুল, ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, দুয়ায়ে ইউনুস ও বিসমিল্লাহিল লাযী লা ইয়াদুররু ইত্যাদি অনবরত পাঠ করছিলেন। সেই সময় মায়ের অবস্থা ছিল শিশুর মতো, তাঁর কানে যাই পড়া হয় মা সেসব বারবার পড়তে চেষ্টা করতেন। ইন্তিকালের সময় আমাদের দু’ভাগনি তাঁর এক কানে কালিমায়ে তাইয়িবা এবং অন্য কানে ইস্তিগফার পড়ছিল। সেই অবস্থায় মা ইন্তিকাল করেছেন। মহান দয়াময় আল্লাহর কাছে মমতাময়ী মায়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করি। রব্বিরহামহুমা কমা রব্বায়ানি সগীরা। আমীন।
লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com