২৬শে জানুয়ারি, ২০২১ ইং , ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই জমাদিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

মূসা আল হাফীজের বই : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি

মূসা আল হাফীজের বই : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি

ফয়জুল্লাহ আমান

সদ্য প্রকাশিত “মুক্তিযুদ্ধ ও জমিয়ত” সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন।। ইতিহাস বিকৃতির সুফল কী? পাঠকের কাছে আমার প্রশ্ন।

আমাদের পূর্ব পুরুষ যদি কোনো ভুল করে থাকে তাহলে সেটা অস্বীকার করে বিপরীত কথা প্রতিষ্ঠা করা কতটুকু উপকারী? আমার ক্ষুদ্র খেয়ালে মিথ্যার উপর ভিত্তি করে যে ইতিহাস রচিত হবে তা দ্রুত সময়ে ভেঙ্গে পড়বে। এমন বিকৃতির পেছনে যারা ছুটবে তাদের দ্বারা ভবিষ্যত গড়ার কোনো কাজ হতে পারে না।
কারণ দুর্বল ভিত্তির উপর পা রেখে সামনে অগ্রসর হ‌ওয়া যায় না। শুরুতেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে হয়। কখনো আর সামনে বাড়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারে না মিথ্যা গৌরব বোধে আচ্ছন্ন জাতি।

অতীতের ভুলকে অস্বীকার না করে নতুন ভূমিকা পালন করে নব ইতিহাস সৃষ্টি অধিক শ্রেয়। নিজেদের ব্যর্থতা বা ভুল স্বীকারের মতো সৎ সাহস যাদের নেই তারা অসাধু ও কাপুরুষ।  যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত হবার চেয়ে মানসিকতায় পরাস্তরা সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর হয়। পরাজিতরা নিজেদের ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না। কারণ তাদের সেখানে বলার কিছু নেই। কৃত্রিমভাবে খুব বেশি বকাবকি সম্ভব হয় না, হলেও টেকে না।

যতটুকু আছে ততটুকু বলুন, বাকি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যত কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা। পদস্খলন হতে পারে। ওহুদ যুদ্ধে কিছু সাহাবীর পদস্খলন হয়েছে। সীরাতের কিতাবাদিতে এটাকে অস্বীকার করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পূর্বপুরুষদের ভুলের কারণে তাদের অসম্মান করার পক্ষে ন‌ই আমি। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করা বড় অন্যায় হবে। এতে এ দেশে আমাদের প্রকৃত অবস্থান নির্ণয়ে গলদ হবে।

আমরা গাছের গোড়ায়, না আগায়, কোথায় আছি, তা লক্ষ্য করে হাত ছাড়া যাবে, কি যাবে না নির্ধারণ করতে পারব।

৭১ ই সব নয়। এর আগে হাজার বছরের ইতিহাস আছে, সেখানে আলেমদের ভূমিকা আছে, সেগুলো নিয়ে গবেষণা করা জরুরি। একাত্তরের পরেও দেশের কল্যাণে অবদান রাখার সুযোগ ফুরিয়ে যায় নি। কিন্তু তাই বলে একাত্তরে আমাদের আলেমদের ভূমিকা বাড়িয়ে দেখাতে ইতিহাস বিকৃত করা কোনো ভাবেই কি বৈধতা পায়?
বামফ্রন্ট ও উলামা বিরোধী শক্তির প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে গায়ের জোরে একটা মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করা কোনো সুফলই বয়ে আনবে না।

এই দেশের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন চলমান। সামাজিক কাজকর্মের প্রতুলতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিপক্কতার দিকে অগ্রসর হতে হবে। সমাজ বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করে নিতে হবে মেহনত করে, মিথ্যা দিয়ে নয়। আমরা এখনও বাঙালি সমাজের অধিকাংশ ও মূলধারার সাথে একাত্ম হতে পারিনি। তাদের ওপর পুরোপুরি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হ‌ইনি। এখনো শতকরা ৯০ভাগ মানুষ প্রাক্টিসিং মুসলিম নয়। একথা স্বীকার করলে জাত যাবে না।

পাকিস্তান আমলে আমাদের আলেমদের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ মুসলিম লীগের চিন্তা ও প্রভাব বলয় থেকে বের হতে পেরেছিলেন। মাওলানা তাজাম্মুল আলি, মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, মুফতি নুরুল্লাহ প্রমুখ সহ যে কজন আলেম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন, আমৃত্যু তাদেরকে এর জন্য কাওমী অঙ্গনের অকারণ শত্রুতা তাড়া করেছে। তাদের নাম দেখিয়ে সেসময়ের পুরো চিত্র পাল্টে বিপরীত বক্তব্য উপস্থাপন করতে লজ্জাবোধ করা উচিত। মূলত সঠিক বিষয় সামনে থাকলে বাস্তবতা মুকাবেলা সহজ হবে। তা না হলে অযথা মিথ্যায় বিভ্রান্ত হবে প্রজন্ম। এটা আমার অবজারভেশন।

والله اعلم وعلمه اتم واحكم
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগ পর্যন্ত ২৩ বছরের বিভিন্ন বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে মাওলানা মূসা আল হাফীজের ব‌ইয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের ঘটনাবলীর আলোচনা গুটিয়ে আনতে সঙ্গত কারণেই বাধ্য হয়েছেন, কারণ এবিষয়ে তার কাছে কিছু ই নেই। ৭১এর মার্চের পর কজন জমিয়তি নেতা পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন তা হাতে গণা যাবে।

মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ আমাকে বলেছেন, মাওলানা তাজাম্মুল আলি সাহেবের কল্যাণে কাজী রহ. মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নিতে পেরেছেন, তা না হলে জমিয়তের‌ও অধিকাংশই স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

দুদু মিয়া একা নয়, (পুরো জমহুর জুলুমের বিরুদ্ধে থাকলেও) পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষপাতী ছিলেন না অধিকাংশ আলেম। অবশ্য অধিকাংশ আলেম পাকিস্তানের পক্ষে অপরাধ সংঘটন থেকে ছিলেন সতর্ক।

জামায়াত ও নিজামে ইসলাম পার্টির কিছু আলেম থেকে যুদ্ধাপরাধের মতো ঘটনাও ঘটেছে। লালবাগ ফরিদাবাদ বড়কাটারায় রাজাকাররা শান্তি বাহিনীর সঙ্গে ট্রেনিং দিয়েছে। সেসময় আমাদের অনেক উস্তাদ সেখানে ট্রেনিং নিয়েছেন। (আমাদেরকে দরসে বলেছেন। তাঁরা এখনো আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছেন।)

এসব বাস্তব চিত্র অস্বীকার করতে অনেক বেশি অসত্যে অভ্যস্ত হতে হয়। কবিদের জন্য অবশ্য মিথ্যাচার একটা শিল্প।
أشعر هم اكذبهم
ان كنت لاتدري فتلك مصيبة
وان كنت تدري فالمصيبة أعظم
এ ব‌ইয়ের ৮১ নং পৃষ্ঠার কয়েকটি লাইনে ই আসল খেলা খেলেছেন লেখক। জমহুর আলেম উলামা স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। দুদু মিয়া সহ জমিয়তের যে কজন নেতার নাম শান্তি কমিটির তালিকায় এসেছে তৎকালীন পত্র পত্রিকায়, কবি লিখেছেন, তাদের মাধ্যমে সাধারণ আলেম সমাজ মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অনুপ্রাণিত হননি।

সেটা একটা দাবি, যা লেখক প্রমাণ করেননি। আমি স্বয়ং যে তাহকীক করেছি তাতে স্পষ্ট, বিপরীত সিদ্ধান্ত ই সত্য। বেশি কিছু বলা ছাড়া ই দিবালোকে র মতো ই সত্য এবং আম খাস সবার জানা। সবার সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তফসিলী দলীল প্রমাণ আবশ্যক হবে না, কারণ এসব স্বতঃসিদ্ধ। কাব্যিক উপস্থাপনের জোরে মিথ্যাকে সত্য বানানো যায় না। রাতকে দিন বানানো যায় না। কালো কে শাদা করা যায় না। অন্ধকার আলোয় রূপান্তর হয় না মিথ্যা বচনে। সত্যিকার অর্থে ই যাদের অবদান আছে তা তুলে ধরা জরুরি। সাথে মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। অধিকাংশ আলেম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন নি। ইতিহাসের এই অমোঘ সত্য সামনে রাখলে নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারবে, জমহুর থেকেও কখনো পদস্খলন হতে পারে। হয়েছে।

খাঁটি আর ভেজাল মিশ্রণের কুফল হলো খাঁটিও মূল্যহীন হয়ে যায়। যারা সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন তাদের এতকাল আওয়ামী লীগ, ঘাদানিক, দরবারী, ভারতের দালাল ইত্যাদি বলে গাল দেওয়া হয়েছে। সামনেও তাদের অবমূল্যায়নের পথ তৈরিতে সাহায্য করবে এ বিকৃত ব‌ই।

স্বাধীনতার পর সব ইসলামী দল নিষিদ্ধ হলেও জমিয়ত নিষিদ্ধ হয়নি বলে যে দাবি করছেন তাতেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যায় ৭২সালে, জমিয়তের নাম থেকে ভারতের জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অনুকরণে ইসলাম শব্দ বাদ দেয়া হয়। রাজনৈতিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়। নেতা কর্মীদের গর্তে ঢুকতে হয় ৭৬ পর্যন্ত।

ব‌ইটির প্রকাশনা উৎসবে মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী সহ প্রবীন কিছু মাওলানা লেখকের ভূয়সি প্রশংসা করেছেন, যেন এ ঐতিহাসিক গবেষক এমন কিছু ইতিহাস এনেছেন যেগুলো প্রবীন মাওলানা রা ( যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় যুবক ছিলেন, নিজেরা দেখেছেন সব) তারাও জানতেন না। পঞ্চাশ বছর পর এসে এই প্রথম শুনছেন।

তাদের অভিব্যক্তি ও মুগ্ধতা দেখে পাঠকদের আরেকটি ঘটনার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রয়াত মাওলানা আযীযুল হক সাহেবের মুক্তিযুদ্ধে কী অবদান তা বর্ণনা করছেন ছোট ভাই মাওলানা মামুনুল হক, ইউটিউবে দেখুন, তাঁর অনলবর্ষী বক্তব্য গোগ্রাসে গিলছেন বড়ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক সাহেব। বোঝাই যাচ্ছে ছোট ভাইয়ের দেওয়া তথ্য গুলো বড় ভাই জীবনে এই প্রথম শুনছেন। যা মাওলানা আযীযুল হকের জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পর এতবছর আলোচনায় আসেনি। এখন চেপে রাখা ইতিহাসের মোড়ক উন্মোচন হচ্ছে।

এখন যারা বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু বলে মুখে ফেনা তুলছেন এই তাঁরাই কদিন আগেও বঙ্গবন্ধুর জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। স্পষ্ট ভাবে তাকে জারজ বলতেন। বঙ্গবন্ধুর বাবা মা হিন্দু ছিল বলে প্রচার করা হয়েছে আমাদের মাদ্রাসাগুলোয়। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটিও আমরা উচ্চারণ করা পাপ মনে করতাম, গণ্ডগোলের বছর বা সমার্থক অন্য শব্দে ইতিহাস বর্ণনা করেছেন আমাদের উলামায়ে কেরাম। বন্ধুবর কবি যা লিখেছেন তা ইতিহাসের অপমান, আমি যা বলছি এটাই পাঠক বুঝতে পারছেন, সত্য। আমি মনে করি, সত্য অস্বীকার করায় কোনো গৌরব নেই। আওয়ামী লীগকে কৃতিত্ব দিতে এখন‌ও বখিলি করা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভুলের সাথে একাত্মতার নামান্তর। চোরের মায়ের মত বড়ো গলা করে এখন সব ক্রেডিট নিজেরা দাবি করা চরম অসাধুতা। আলেমদের আর‌ও অনেক অবদান আছে, সেসব বাস্তব অবদানের কথা আলোচনা করুন। মিথ্যাচার বন্ধ হোক।
পরিশেষে ভুলভাল তথ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত না করতে আহ্বান জানাবো আমার কবিবন্ধুকে।

ব‌ইটি আজকে রাতেই হাতে পেয়েছি। পুরোটাতে নজর বুলিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলাম। প্রয়োজনে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশাল্লাহ। আমার জানা তথ্য উপাত্ত কিছু ই উল্লেখ করিনি। কেবল ভূমিকা বললাম। ঢিল ছুড়ে আম পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। গঠনমূলক জবাব পেলে প্রমাণভিত্তিক তথ্য উপস্থাপনের উৎসাহ পাব।
আর হ্যা, গবেষণায় সময় নষ্ট না করে কাব্য চর্চা করলে বাংলা ভাষার সেবা হবে। সব্যসাচী হবার লোভ অনেক প্রতিভা নষ্ট করে দিয়েছে ‌। ধ্বংস করে দিয়েছে।

لكل فن رجال ولكل مقام مقال

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কবি

মতামত একান্তই লেখকের, সম্পাদক দায়ী নয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com