২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

মৃত্যুদণ্ড ধর্ষণের সমাধান না

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : ধর্ষিতার চিৎকারে প্রকম্পিত প্রিয় মাতৃভূমি। মানুষরূপী জানোয়াররা খুবলে খাচ্ছে নারী শরীর। কী পাহাড়, কী সমতল, সর্বত্রই হায়েনার হামলা যেন! ধর্ষিতার রক্তে রঞ্জিত সব জনপথ। এত কান্না, এত বিষ বাতাসে মেলেনি আগে!

পরিবার থেকে অফিস, স্কুল থেকে মাদরাসা কোথাও নিরাপদ নয় মানুষ। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা! আর ঘটনা দিয়েই আড়াল পড়ছে এমন বিভৎস্যতা।

কেন এই ধর্ষণ-হত্যা মহামারি? কোথায় যাচ্ছে সমাজ? এই নির্মমতার শেষ কোথায়? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মতামত জানতে চাওয়া হয় লেখক, গবেষক ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বিশিষ্ট বামপন্থী রাজনীতিক ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং মানবাধিকার আইনজীবী ও নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা আলীর কাছে।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘সমাজের সব অস্থিরতার জন্য মূলত আমি পুঁজিকেই দায়ী করব। পুরুষ পুঁজি ও ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকছে। তার সামাজিক ও রাজনৈতিক জোর নারীর থেকে অনেক বেশি। পুরুষ মনে করে অপরাধ করে ধরা পড়বে না। তার ক্ষমতা আছে। সম্প্রতি ধর্ষণ ও দুর্নীতির ঘটনাগুলো যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে এর পেছনের শক্তিই হচ্ছে ক্ষমতা। এই ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত গোটা সমাজ ব্যবস্থা। গোটা ব্যবস্থাই চরম জায়গায় পৌঁছেছে, যাকে আমরা বলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা।’

অনেকেই ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড ক্রসফায়ার চাইছে– এর জবাবে তিনি বলেন, ‘কথিত সংস্কার বা কয়েকজন ধর্ষককে ফাঁসি দিলেই মুক্তি আসবে না। আমূল পরিবর্তনে আসতে হবে। সংকট তো দুনিয়াজুড়েই। বিচ্ছিন্নভাবে সংস্কার করে কোনো কাজে আসবে না। ক্রসফায়ার ধর্ষণের মতোই আরেকটি অপরাধ, যার কেন্দ্র ক্ষমতা।’

তিনি বলেন, ‘মূলত সম্পদের ওপর ব্যক্তির মালিকানা থাকলে কোনো সমাধান আসবে না। সমাধান আসবে সম্পদের ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা পেলে। আমরা দেখছি, সমাজের চরম বিপর্যয়। পুঁজিবাদ মুখ থুবড়ে পড়ছে। ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের মধ্যে ক্ষমতার বণ্টন হলেই মুক্তি আসবে।’

একই অবস্থান নিয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও। তিনি বলেন, ‘আজকের যে বাংলাদেশ তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নয়। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বহু দূরে সরে এসেছি। মূলত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যে দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে, তারই প্রতিফলন আজকের এই সামাজিক অপরাধ প্রবণতা। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। সরকারগুলোর পরম্পরায় থেকে এ অবস্থার সৃষ্টি। মূলত, ভারসাম্যহীন ক্ষমতা থেকে দুর্বৃত্তায়নের সৃষ্টি। রাজনীতিই এর জন্য প্রধানত দায়ী।’

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ধর্ষণ একটি সামাজিক ব্যাধি। তা ক্রমশই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তা অন্ধকার যুগের চিত্র। খুব সহজে আলো আসবে এ ভরসাও মিলছে না। মানুষ যদি তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন না হয়, তাহলে বিচ্ছিন্নভাবে সামাজিক আন্দোলন করেও কোনো লাভ হবে না। সবার আগে নিজেকে সচেতন করে তুলতে হবে।’

ধর্ষকের সাজা মৃত্যুদণ্ড করার দাবি উঠেছে- এ প্রসঙ্গে মেনন বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডই একমাত্র সমাধান নয়। দেশে তো মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে। অপরাধ কি কমছে? অনেক দেশ-ই মৃত্যুদণ্ডের বিধান থেকে সরে আসছে। আমরা কেন এখানে আটকে থাকব? আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং ব্যক্তি সচেতনতাই পারে এ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি দিতে।’

মানবাধিকার আইনজীবী ও নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট সালমা আলী নারীর প্রতি সহিংসতার জন্য আইনের প্রয়োগ না থাকা এবং বিচারহীনতাকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘মহামারিকালে ধর্ষণের যে চিত্র আমরা লক্ষ্য করছি, তার প্রথম কারণ হচ্ছে নজরদারির অভাব। বাসাবাড়িতে কী হচ্ছে, তা অনেকটাই আড়াল থেকে যাচ্ছে করেনাকালে। নির্যাতনের অভিযোগে দোষীদের যে সাজা দেয়ার কথা, তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এসব নির্যাতনের বিরুদ্ধে সমাজ যেভাবে এগিয়ে আসার কথা, তা আসছে না।’

তিনি ধর্ষণের জন্য ক্ষমতাকেই দায়ী করে বলেন, ‘পুরুষ ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকছে। একজন যুবক বা তরুণ ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সেটা ছোট পরিসরে হলেও। এই ক্ষমতার কাছে নারী খুবই দুর্বল। শুধু শারীরিক দুর্বলতাই নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়াচ্ছে না। ক্ষমতাও দায়ী। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে পুরুষ মনে করে নারীকে ধর্ষণ করাই যায়! আর ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে পর্নোগ্রাফির বিকাশ। সবার হাতেই প্রযুক্তি, সবার হাতেই মোবাইল। পর্নোগ্রাফিতে সয়লাব। এতে আসক্ত হয়ে যুবক-তরুণরা নারীর প্রতি সহিংস হয়ে উঠছে। বাড়ছে পর্নোগ্রাফি, বাড়ছে ধর্ষণও।’

অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘এই যে একাধিক কারণে ধর্ষণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে, তা নিয়ে আমরা কতজন সচেতন? আইন থাকলেই সমাধান নয়। মৃত্যুদণ্ড দিলেই সমাধান নয়। আইনের প্রয়োগটা থাকলেই অপরাধ কমে আসবে বলে মনে করি।’

উল্লেখ্য, ধর্ষণের শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করে সংশোধিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ এর খসড়া মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জাগো নিউজকে এ তথ্য জানান আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক।

তিনি বলেন, ‘২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের জন্য একটি প্রস্তাব আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে যাচ্ছে। মূলত আইনের ৯(১) ধারায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ ধারায় ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করে প্রস্তাব দেয়া হবে। এ আইনের আরও কয়েকটি স্থানেও ছোট ছোট পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’

সূত্র: জাগো নিউজ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com