১০ই আগস্ট, ২০২০ ইং , ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

যুগ যুগ পরে পৃথিবীতে আসেন একজন মতিনুল হক উসামা

যুগ যুগ পরে পৃথিবীতে আসেন একজন মতিনুল হক উসামা

মাসউদুল কাদির :: ভারতের জমিয়তে উলামা হিন্দের উত্তরপ্রদেশের সভাপতি মাওলানা মতিনুল হক উসামা কাসেমী আর নেই। চলে গেছেন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে। ফুজতু অরাব্বিল কা’বা। কাবার রবের শপথ আমি সফল হয়ে গেছি। করোনাকালে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই পায়ে হেঁটে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছেন। জমিয়ত উলামা হিন্দ একজন সাহসী দিকপাল ও বর্ষীয়ান নেতা হারালো।

আমার খুব প্রিয় একজন সুবক্তা ছিলেন তিনি। শুক্রবার সকালেই ওয়াটসঅ্যাপে আসে মাওলানা মতিনুল হক উসামা কাসেমী রহ.-এর ছেলে মাওলানা আমিনুল হক কানপুরীর একটি বার্তা। বাবা খুব অসুস্থ। করোনা ভাইরাসের খবর পজেটিভ এসেছে। সবাই দুআ করবেন। তখনই আমার মনে একটা ভয় ভয় কাজ করছিলো।

অনেকে বলবেন, এ মাওলানাকে নিয়ে এত কথা বলবার কিছু আছে কি? হয়তো নেই। কিন্তু ভারতের মুসলমানদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার ভালোবাসা ছুঁয়ে গেছে। এ যে বাংলাদেশী কিছু মানুষ গ্রেফতার হলেন তাদেরকে ছাড়িয়ে আনতে সেখানেও মতিনুল হক উসামা এগিয়ে গেছেন। সাইয়্যিদ মাহমুদ মাদানীর কাঁধে কাঁধ রেখে প্রতিটি ভালোবাসা ছড়াচ্ছিলেন ভারতের প্রতিটি অলিগলিতে।

দিল্লী দাঙ্গার বিরুদ্ধে প্রতিটি আন্দোলনে, বিক্ষোভে, শান্তি সফরে এবং মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় অগ্রগামী ছিলেন তিনি। আমরা ভারতের মুসলমানদের সংবাদ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে তাকে দেখেছি প্রতিটি কাজের একজন সিপাহসালারের মতো ভূমিকায়। তার ইন্তেকালে সত্যিই একটু বেশি শোক অনুভব হয়। কষ্ট লাগে। মানুষের পাশে দাঁড়াবার মতো আলেম খুব কমই দেখা যায়। মতিনুল হক উসামা একজন আদর্শ নাবিক ছিলেন। অরাসাতুল আম্বিয়ার একটি নমুনা ছিলেন।

মাওলানা মতিনুল হক উসামা কাসেমী রহ.-এর ছেলে মাওলানা আমিনুল হক কানপুরী জানিয়েছেন, শুক্রবার (১৮ জুলাই) দিবাগত রাত ২:৩০ মিনিটের দিকে ভারতের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ভারত স্বাধীনতার পেছনে মুসলমানদের অবদান, ভারতীয় উলামায়ে কেরামের অবদান আজ বাংলাদেশের তরুণ সাংবাদিকদের বললেও হেসে উঠেন। অথচ আলেমদের ত্যাগের কারণেই উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। সেকথাই ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে গেছেন সদ্য প্রয়াত মাওলানা মতিনুল হক উসামা।

স্বাধীনতাযুদ্ধে জমিয়তে উলামা হিন্দের অবদান ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান ভারত উত্তরপ্রদেশের জমিয়তে উলামা হিন্দের সভাপতি মাওলানা মতিনুল হক উসামা কাসেমী। তিনি কানপুর মাদরাসাতুল হারামুর রাহমানে এক সভায় বলেছিলেন, প্রতিটি শাখায় এ ধরনের সেমিনার করার দ্বারা জমিয়তের দাওয়াত ঘরে ঘরে পৌঁছানোর কাজে সহযোগিতা হবে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে জমিয়তের ও আলেমদের অবদান তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক অনন্য নজীর তৈরী হবে।

আমরা আধুনিক চিন্তার কথা বলি। বাস্তবে আমাদের সিলেবাসে সে আধুনিকতা নেই। ব্যবসায়ের কথা বলি, কিন্তু মাদরাসায় ব্যবসায় শেখার কোনো ব্যবস্থা নেই। মতিনুল হক উসামা আলেমদের, মুসলমানদের তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

তিনি একবার এক বক্তৃতায় বলেন, আল্লাহভক্ত টেকেনোলজি বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন। পৃথিবী জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে নতুন টেকনলজি এর মাধ্যমে অনেক উন্নতি করেছে। এই জন্য আমাদের উচিৎ আল্লাহর নামে শিক্ষা গ্রহণ করা। যদি আমরা আল্লাহর নামে জ্ঞান অর্জন করি তাহলে পৃথিবীতে পাবো শান্তি আর তা হবে আখেরাতে নাজাতের কারণ। সন্তান ভূমিষ্ট হয়ার পর আযান ও তাকবির এই জন্য বলা হয় যাতে সে তার প্রতিপালককে চিনে ফেলে।

মাদ্রাসার ছাত্রদের নিজের প্রতিপালককে চিনার ইলম শিক্ষা দেওয়া হয়। আমাদেরকেও মাদ্রাসায় আসতে হবে আমাদের প্রতিপালককে চিনার জন্য। মাদ্রাসায় সবচেয়ে বড় কাজ দ্বীন সংরক্ষণের। যখন আমাদের অন্তরে কুরআন, ইসলাম এর সম্মান এবং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার সাহাবায়ে কেরাম রহ. এবং বুজুর্গানে দ্বীন ও আল্লাহ ওয়ালাদের ভালবাসা থাকবে তাহলে আমাদের দুনিয়া ও পরকাল সুন্দর হবে।

বাংলাদেশের বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার এক অনুষ্ঠানে একজন বিদগ্ধ আলেম এই টেকনোলজির বিরোধিতা করেছেন। যদিও এখন বেফাকই তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে ভাবছে। সেটা অবশ্য আশার কথা। ভালো লাগার বিষয়।

মাওলানা মতিনুল হক উসামা রহ.-এর একটা কথা আমার হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল, লিডার পায় তালি আর কায়েদ শোনে গালি। তিনি বলছিলেন, আভিধানিক অর্থে লিডার ও কায়েদের অর্থ যদিও এক (নেতা)। লিডার কাকে বলে এবং কায়েদ কাকে বলে? লিডার ওই ব্যক্তিকে বলে যার কাজ হল, বাতাস যেদিকে প্রবাহিত হয় সেদিকেই যাওয়া। সে কওমের মেজাজ দেখে, যে কওম কি চায়? সে তেমনই বলে। আর কায়েদের কাজ হলো, সে দেখে যে কওম বিশুদ্ধ রাস্তায় চলছে না ভুল রাস্তায়? যদি কওম ভুল রাস্তায় চলে তাহলে কওমকে বিশুদ্ধপথে আনার দায়িত্ব পালন করে। লিডার সর্বদা তালি আর প্রশংসাই শোনে অথচ কায়েদ সর্বদা গালিই শুনতে থাকে।

প্রকৃতঅর্থে এমন হয় কেন? আমাদের বাংলাদেশেও আমরা দেখি। এমন ঘটনার পর অনেককে আবার ক্ষমা চাইতেও দেখি। অন্তত আলেম হলে, মানুষ হলে ভুল হওয়ার পর নিজে নিজে অনুতপ্ত হবেনই।মূলত লিডার সে কথাই বলে যা আপনি চান তখন আপনি তালি বাজান, বাহ! বাহ! সুন্দর কথা বলেছেন। আর কায়েদ সত্যটা বললেও, তালি নেই, প্রশংসা নেই। বরং সমালোচনার শিকার হন। এই তো আমাদের সমাজ।

আমরা জানি, একজন মতিনুল হক উসামা যুগ যুগ পরে সৃষ্টি হয়। দুনিয়ায় আসেন। আধুনিক আল্লাহর পথের সংগ্রামী মানুষের পরকাল অনেক অনেক সুন্দর হোক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, শীলন বাংলাদেশ [সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন]

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com