১৪ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩রা জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

রাখাইনে সেনারা দেয় লোক দেখানো ত্রাণ, কেড়ে নেয় মগরা

পাথয়ে ডেস্ক ● মিয়ানমারের রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা আসা বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন রাতে আসছে তারা। জন্মভূমি ছেড়ে আসা এসব রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ জানিয়েছে, তাদের গ্রামগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে সেনাবাহিনী। এ কারণে গ্রামের রোহিঙ্গা বাসিন্দারা খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সঙ্কটে আছে। পাশাপাশি জীবন হারানোর ভয় তো আছেই। সেনারা মাঝেমধ্যে তাদের ত্রাণ দেয় শুধু ভিডিও ধারণের জন্য। পরেই কেড়ে নেয় মগ গুণ্ডারা। স্থানীয় এই গুণ্ডারা মিয়ানমার প্রশাসনের মদদপুষ্ট।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে জেটিঘাটের পূর্বদিকে একটি ছোট নৌকায় করে একদল রোহিঙ্গা কূলে নামল। নৌকায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ছিল ২১ জন। নৌকা কূলে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারী ও শিশুরা হাউমাউ করতে কাঁদতে থাকে। এরপর রাখাইনের রোহিঙ্গা নিয়ে আসে আরো কয়েকটি নৌকা। এসব ঘটনা গত মঙ্গলবার রাতের। বিজিবির সদস্য ও স্থানীয়দের দেখে ভয়ে কাঁপছে শিশু ও নারীরা। এদিন গভীর রাতে সাতটি নৌকা এসে হাজির হয়। ওই নৌকাগুলোতে ৩০ থেকে ৫০ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। এভাবে রাত ১২টা পর্যন্ত নৌকা নিয়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা শাহপরীর দ্বীপের জেটিঘাটে নামে। পরে তাদের বেড়িবাঁধের ওপর জড়ো করা হয়। সেখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় শাহপরীর দ্বীপ দারুল উলুম মাদরাসায়। সেখানে বিভিন্ন কক্ষে নারী ও পুরুষকে ভাগ করে রাখা হয়। ওখানে তাদের খাবারও দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে গত তিন দিন ধরে ছোট ছোট নৌকায় করে রাতের আঁধারে নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গারা।

শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা মাস্টার জাহেদ হোসেন বলেন, হঠাৎ করে এখন রাতের আঁধারে ছোট নৌকায় করে মিয়ানমারের মংডু শহরের আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুরা পালিয়ে আসছে। এখন যারা আসছে তারা কোনো না কোনো ব্যবহার্য জিনিস সঙ্গে করে নিয়ে আসছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে আসছে।

শাহপরীর দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, রোহিঙ্গারা প্রথম দিকে দিনের বেলায় আসছিল। কিন্তু এখন রাতের আঁধারে নাফ নদী অতিক্রম করে রোহিঙ্গারা আসছে। ছোট নৌকায় করে সন্ধ্যার পরপর রোহিঙ্গাদের ভিড় জমে জেটিঘাটে।

নৌকার মাঝি রহমত উল্লাহ জানান, তার বাড়ি মিয়ানমার রোংপুল এলাকায়। তিনি প্রতিদিন রোহিঙ্গাদের নৌকা করে নাফ নদী পারাপার করেন। মিয়ানমার পুলিশ তাদেরকে কিছু করে না। প্রয়োজনে তারা প্রতিবারে ৫০ হাজার কিয়েট দিয়ে থাকে। তাদের ওপার থেকে এপারে আসতে এক ঘণ্টা সময় লাগে।

তিনি আরও বলেন, মংডু থেকে বুচিডংয়ের দূরত্ব ২০ কিলোমিটারের মতো। সেখানে ৩২০টির মতো গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গার বাস। আগস্টের শেষের দিক থেকে রোহিঙ্গাদের চলে আসা শুরু হলেও মিয়ানমারে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিল অনেকেই। কিন্তু এখন তাদেরও চলে আসতে হচ্ছে। কেননা গত এক মাস ধরে এলাকার লোকজনকে চলাফেলা করতে দিচ্ছে না। ফলে সেখানে থাকা রোহিঙ্গাদের খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে।

রাখাইনের লম্বাবিল এলাকার আবু শামা পরিবারের দশ সদস্য নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ তাদের গ্রাম। বাড়িতে কোনো খাবার মজুদ ছিল না। তাই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছিল। শেষে ক্ষুধার জ্বালায় থাকতে না পেরে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন।

বুচিডং জব্বারপাড়ার আমিনা বেগম জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে সেনারা গ্রাম অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মাঝে-মধ্যে তাদেরকে ডেকে নিয়ে ত্রাণ দেওয়া হয়। ত্রাণ দেওয়ার দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করে। পরে আবার সে ত্রাণ কেড়ে নেয় সেনা ও তাদের সঙ্গে থাকা মগরা।

মিয়ানমারের মংডুর কলিজাভাঙ্গা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নবী হোসেন, আজিজুল রহমান ও আহমদ আলী বলেন-জীবন বাঁচাতে এখানে পালিয়ে এসেছি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। গ্রামে কোনো রোহিঙ্গাকে থাকতে দিচ্ছে না। ভালো কাঠের তৈরি ঘরগুলো দখল করে নিচ্ছে। দিনের বেলায় প্যারাবনের পাশে নৌকার মাঝিদের ঘরে অবস্থান নিতে হচ্ছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ধানখেতে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যার পর নৌকায় করে নাফ নদী পাড়ি দিতে হচ্ছে রাতের আঁধারে।

টেকনাফ সাবরাং ইউপির চেয়ারম্যান নূর হোসেন বলেন, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোররাত পর্যন্ত নাফ নদী অতিক্রম করে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো রোহিঙ্গা এসেছে। টেকনাফ ২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা ছোট ছোট দলে নৌকায় করে রাতে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com