১৫ই জুলাই, ২০২০ ইং , ৩১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

রাজধানীতে জনশূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : করোনার এই দুঃসময়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে রাজধানী ঢাকার রাজপথ। অপরাধীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। ঢাকার জনমানবহীন সড়কে নির্বিঘ্নে খুন করে কখনও লাশ ফেলে রাখছে ঝোপের মধ্যে, নির্মাণাধীন ভবন বা সড়কের পাশে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ এখন বের হচ্ছেন না। ফলে সন্ধ্যার পর অনেকটা ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। এছাড়া গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে অনেকেই এই মুহূর্তে সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলকে চলাচলের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। আর এই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা। ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে লুটে নিচ্ছে সর্বস্ব, এদিক-ওদিক হলে খুন করতেও দ্বিধা করছে না।

প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। নিজ বাসার নিচেও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কথা হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমানের সঙ্গে।

তিনি বলেছেন, সম্প্রতি একাধিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে বেশকিছু বিষয় সামনে এসেছে। এসবের প্রধান সমস্যা হচ্ছে রাতের অধিকাংশ সড়কে আলোর স্বল্পতা। অনেক স্থানের সিসি ক্যামেরাও নষ্ট। ফ্লাইওভারের বাতিগুলোও সব কাজ করছে না। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অপরাধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব অপরাধ ঘটছে রাতে।

তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে দু-একটি বাতি নষ্ট থাকলেও সড়কে পর্যাপ্ত গাড়ি থাকায় আলোস্বল্পতার অভাব টের পাওয়া যায়নি। কিন্তু গত এক মাসে আলোস্বল্পতার সুযোগ নিয়ে রাজধানীতে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটিয়েছে অপরাধীরা।

গত বুধবার সন্ধ্যার পর মিরপুরের রূপনগরে নিজ বাসার সামনে আলো-আঁধারীতে দুর্বৃত্তের গুলিতে সাত্তার মাতব্বর (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। জানতে চাইলে রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ শুক্রবার বলেন, ঘটনাস্থলটি ছিল নির্জন, সিসি ক্যামেরাও ছিল নষ্ট। পাশের একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত আলো না থাকায় গুলিবর্ষণকারীদের চেনা যাচ্ছে না। আমাদের ধারণা গুলিবর্ষণকারী ভাড়া করা সন্ত্রাসী।

পুলিশের উত্তরা অপরাধ বিভাগের দক্ষিণ খান জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এএসএম হাফিজুর রহমান রিয়েল বলেছেন, গত ৫ জুন সন্ধ্যার পর বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রাণ হারান শারমীন নামের এক তরুণী। ৪ বন্ধু তাকে নিয়ে যান উত্তরখান থানা এলাকার বৈকাল রোডের একটি নির্মাণাধীন ভবনে। আলোর স্বল্পতা কাজে লাগিয়ে ৪ বন্ধু মিলে ধর্ষণের পর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। একই রাতে পল্লবীতে একটি নির্মাণাধীন ভবনে সেলিনা গনি নামে এক নারীকে শ্বাস রোধে হত্যা করা হয়। প্রাথমিকভাবে তার পরিচয় জানা না গেলেও ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত হয়।

তবে ঘাতকরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ বিষয়ে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল মাবুদ বলেন, ওই নারীর ৫ জুন রাত সাড়ে ৯টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে থেকে সিএনজিতে ওঠার তথ্য রয়েছে। কিন্তু ওই এলাকায় সিসি ক্যামেরা না থাকায় সিএনজিটি চিহ্নিত করা যায়নি। আলোর স্বল্পতাকে কাজে লাগিয়েই ওই নারীকে হত্যা করা হয়। ঘাতকরা খুবই ধূর্ত প্রকৃতির। সেলিনাকে সিএনজিতে তুলেই তারা সেলিনার মোবাইল ফোন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

খিলক্ষেত থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) আমিনুল ইসলাম বলেন, আলোস্বল্পতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে যাচ্ছে। ১৯ জুন ৩০০ ফিট এলাকা থেকে অজ্ঞাত নারীর লাশ উদ্ধারের পর বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে কিছু লাইটের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। তার নাম স্বামী পরিত্যক্ত সুমি হাসান (৩০)। তিনি উত্তরার একটি বুটিক হাউসে কাজ করতেন। কে বা কারা কী কারণে দুই সন্তানের জননী সুমিকে হত্যা করেছে তা এখনও জানা যায়নি। সিসি ক্যামেরার একটি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে গত ১৬ জুন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারুন-অর-রশিদ কিছু মালামাল (চা পাতা) নিয়ে মহাখালী এলাকার রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ। পরদিন তার লাশ মেলে খিলক্ষেতের ৩০০ ফিট এলাকায়। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তিনি খিলক্ষেতে ভাড়া বাসায় থাকতেন। দুইদিন পর ওই এলাকায় ঝোপের ভেতরে আরও এক নারীর লাশ মেলে। তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

এ দুই ঘটনার ছায়া তদন্তে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মহাখালী থেকে হারুন নিখোঁজ হন। সিসি ক্যামেরা নষ্ট থাকায় এবং প্রধান সড়ক, ফ্লাইওভারসহ আশপাশের গলিতে আলোস্বল্পতার কারণে হারুনের চেহারা আর কোনো ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। হারুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত-উপ পুলিশ কমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার বলেছেন, আগের দিন সকালে বাসা থেকে বের হন হারুন। তার স্ত্রী সোনিয়া আক্তারের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। হারুন মহাখালী থেকে ৩০ প্যাকেট চা নিয়ে বের হওয়ার পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। কথা হয় হারুনের স্ত্রী সোনিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, করোনার ধাক্কায় হারুনের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

করোনা রোগে ‘গ্রিন টি’র চাহিদা জানতে পেরে চা সংগ্রহ করে বিক্রি করতে থাকেন উত্তরা এবং গাজীপুরের বিভিন্ন দোকানে। এতে সংসার ভালোই চলছিল। এই ব্যবসায়ই তার কাল হল। মহাখালী থেকে ফেরার সময় তিনি খুন হন। গত ১৪ জুন দক্ষিণ খানের একটি বাসায় তরুণ ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনকে হত্যার পর লাশ তিন টুকরো করে আলোস্বল্পতাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণখান এবং বিমানবন্দর এলাকার রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। তবে তার ৩ ঘাতককে গ্রেফতার করেছে ডিবি। আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা।

সূত্র জানায়, একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। এমন পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত আলো নিশ্চিত ও সিসি ক্যামেরা সচল করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজধানীর ৫০ থানার ওসিকে ডিএমপি সদর দফতর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com