১৮ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৭ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

রাজনীতিতে উলামায়ে দেওবন্দ

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : উলামায়ে দেওবন্দের রাজনীতি সস্পর্কে অনেকের জানা নেই। অনেকে আবার ইতিহাস পড়ে না, ইতিহাস জানার চেষ্টা করে না, কিংবা ইতিহাস জানলেও হিংসাবশতঃ স্বীকার করতে চায় না। তারা শুধু নিজেদের গুণকীর্তন, নিজ দলের গুণকীর্তন, কোন সালে সংসদে কতটা আসন তারা পেয়েছিল, এসব গুণগান করে নিজ দলের কৃতিত্ব জাহির করতে চায়।

তবে এটা চীর সত্য, যুগে যুগে উলামায়ে দেওবন্দ শ্রেষ্ঠ। এভাবে শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এখনো পর্যন্ত উলামায়ে দেওবন্দ শ্রেষ্ঠত্বের মসনদে। তাঁদেরকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখুন আর রাজনৈতিক ভাবে দেখুন, সকল দিক থেকে দেওবন্দী আলেমগণ উচ্চ আসনে বসে আছেন। আজো তাদের ধারে কাছে কেউ যেতে পারেনি।

দেখুন! কোন ব্যক্তি বিশেষের ভুলের কারণে পুরো গোষ্ঠির বদনাম হতে পারে না। দু একজন অপরিপক্ক ব্যক্তির কারণে একটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠিকে খাঁটো করা যায় না। বর্তমানে দেশীয় রাজনীতির মারপ্যাঁচে এবং কিছু মানুষের খামখেয়ালীপনায় দৃষ্টিগত ভাবে কিছুটা ব্যাকফুটে মনে হলেও আসলে কিন্তু উলামায়ে দেওবন্দ পিছিয়ে নয়। ভুল যারা করেছেন, সেটা তাদের ব্যক্তিগত পদস্খলন। কিন্তু উলামায়ে কেরাম অনেক দূর এগিয়ে।

সংসদে বেশী আসন পেলেই তাদের দল দেশের শ্রেষ্ঠ দল হয় না। আবার সংসদে আসন না পেলে তাদের দলের যে অস্তিত্ব নেই এমন নয়। এক সময় জাতীয় পার্টি এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জয় লাভ করেছিল। ক্ষমতায় ছিল তারা। আবার বিরোধী দলেও ছিল। বলুন তো, ঐ দলের অস্তিত্ব এখন কোন পর্যায়ে? নামকে ওয়াস্তে জনসমর্থন আছে।

উলামায়ে দেওবন্দের যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা বুঝতে হলে আপনাকে আগে প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে। দেওবন্দের ইতিহাস, ঐতিহ্য অবদান নিয়ে বিস্তর মুতালায়া না করে উলামায়ে দেওবন্দের রাজনীতি কিছুই বুঝতে পারবেন না। অথবা বিজ্ঞ কোন দেওবন্দী আলেমের সোহবতে যাওয়া প্রয়োজন, তা না হলে কিছুই বু্ঝে আসবে না।

উলামায়ে দেওবন্দ মসনদ দখল করেনি ঠিকই, তবে তাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন, মগজ জয় করে নিয়েছেন।

দেওবন্দী আলেমগণ সংসদে তেমন সিট হয়ত নিতে পারেনি। বাহ্যিক দৃষ্টিতে আমাদের গোচরীভুত হয় না। কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের তো জয়জয়াকার বিশ্ব জুড়ে। ভারত উপমহাদেশ পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মনমগজ কেড়ে নিয়েছে দেওবন্দী আলেমগণ। আজ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন,পাড়া-মহল্লা সব জায়গাতে দেওবন্দী আলেমদের পদচারণা চলছে। সকল মুসলিমের কর্ণকুহুরে পৌঁছে গেছে দ্বীনের দাওয়াত, দ্বীনের জযবা।

নির্বাচনী লড়াই করে ক্ষমতা দখল করা অথবা ভিন্ন কোন কায়দায় মসনদ দখল করে দেশ চালানো এক জিনিস, আর অসহিংস ভাবে, পেয়ার মহব্বতের মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া এবং সেই দর্শনের উপর মানুষকে পরিচালনা করা আরেক জিনিস। উলামায়ে দেওবন্দ মসনদ দখল করেনি ঠিকই, তবে তাঁরা মানুষের মন জয় করেছেন, মগজ জয় করে নিয়েছেন। আকাবির-আছলাফগণ যে দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে ময়দানে নেমেছিলেন, সে বিষয়ে কিন্তু তাঁরা সফল।

১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহের পর যখন এদেশে আলেম-উলামাদের উপরে নির্যাতনের খড়গ নেমে আসল, হাজার হাজার আলেম শাহাদাত বরণ করলেন, তখন কিন্তু আকাবিরগণ রাজনীতির কৌশল পরিবর্তন করেছেন। কেননা আলেমগণ দেখেছেন ব্রিটিশদের আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে আমরা খালি হাতে কিছুই করতে পারব না। এভাবে যদি ফাইট চলতে থাকে, তাহলে আলেম-উলামা সব শেষ হয়ে যাবে। কোথাও কোন আলেম পাওয়া যাবে না। তাই তো তাঁরা চিন্তা করলেন, আলেম তৈরীর মারকাজ ঠিক রাখতে হবে। রিজাল বানাতে হবে। দ্বীন ইসলামের কর্মী তৈরী করতে হবে। মানুষকে মনমগজ ধোলাই করে দ্বীনের পথে নিয়ে আসতে হবে। সেই দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে কিন্তু দেওবন্দ মাদ্রাসার গোড়পত্তন।

একটু খেয়াল করে দেখুন, এই উপমহাদেশের পাড়ায়-মহল্লায় পর্যন্ত পৌঁছেছে দেওবন্দী মাদ্রাসার শাখা। মানুষ উলামায়ে দেওবন্দের উপর শত ভাগ আস্থা রাখে। এই আন্দোলন হলো দেওবন্দী আলেমদের সবচেয়ে সফল আন্দোলন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদি দেখেন, পাকিস্তান আমলে দেওবন্দী আলেমগন অনেক দাপটের সাথে রাজনীতি করেছেন। স্বাধীনতার পরে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন। বাংলাদেশের সকল স্তরের ওলামায়ে কেরাম সাড়া দিয়েছেন। এমনকি সর্বস্তরের সাধারন মানুষ সাপোর্ট দিয়েছে। সেটা একটা সফল মিশন ছিল।

নব্বই দশকে দেওবন্দী আলেমদের পদচারণা আরো বেশী ছিল। জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত আন্দোলন, সকল ইসলামী দলই সোচ্চার ছিল। বিশেষ করে আল্লামা শামসুদ্দিন কাসেমী (রহ.), আল্লামা আজিজুল হক (রহ.), সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই (রহ.), খতীব উবায়দুল হক (রহ.), মুফতী আমিনী (রহ.) এসকল আলেমগণের ইসলামী রাজনীতিতে বড় অবদান। সে সময়ে কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলন, নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলন, তসলিমা নাসরীন বিরোধী আন্দোলন, সব জায়গাতে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। সবসময় তাদের ময়দানে দেখা গেছে।

আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী (রহ.) ও খতীব উবায়দুল হক (রহ.) তাঁদের বড় অবদান সে সময়ে। কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে যেভাবে জনমত তৈরী করেছিলেন, এরকম আর কখনো হয়নি। তাছাড়া আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এবং চরমোনাই এর পীর সাহেব তারা তো সাংগঠনিক ভাবে অনেক অবদান রেখেছিলেন।

আজ এদেশে আমরা টুপি মাথায় দিয়ে ঘুরছি, ইসলামের কথা বলছি, দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছি, সবই কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের উছিলায়।

ইসলাম বিরোধী কোন শক্তির আভির্ভাব হলে সর্বপ্রথম কিন্তু দেওবন্দী আলেমরাই প্রতিবাদ করেন। ঈমানী দায়িত্ব নিয়ে তাঁরাই এগিয়ে যান। অন্য কাউকে কিন্তু রাজপথে দেখা যায় না। যারা সংসদে আসন পাওয়ার রাজনীতি করেন, তারা কিন্তু ভুলেও ঐসব ঈমানী আন্দোলনে দেখা যায় না। আজ পর্যন্ত যা কিছু করেছেন দেওবন্দী আলেমগণ করেছেন। এজন্য ইসলামী রাজনীতির ইতিহাস এদেশে লিখতে হলে উলামায়ে দেওবন্দের নাম সর্বাগ্রে লিখতে হবে। মনে রাখবেন, আজ এদেশে আমরা টুপি মাথায় দিয়ে ঘুরছি, ইসলামের কথা বলছি, দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছি, সবই কিন্তু দেওবন্দী আলেমদের উছিলায়। যত্ত মৌলভী দেখবেন এদেশে, যত্ত পীর মাশায়েখ দেখবেন, সবই দেওবন্দীদের অবদান।

একজন মৌলভী সাহেব, চাই সে কওমী হোক বা আলিয়া হোক, খোঁজ নিয়ে দেখবেন, হয়ত সে দেওবন্দে পড়েছে, নইলে তার উস্তাদ দেওবন্দের ছাত্র, নইলে তার দাদা উস্তাদ দেওবন্দ পড়ুয়া। এদেশের পরতে পরতে দেওবন্দী আলেমদের অবদান রয়েছে। ক্ষমতা দখল করলেই বা ক্ষমতায় যেতে পারলেই যে পুরো দেশ আপনি ইসলামী করতে পারবেন, এটার কিন্তু গ্যারান্টি নেই। তাই বলে আমি সহী তরিকায় ক্ষমতায় যাওয়ার বিরুদ্ধে নয়। ক্ষমতায়ও যাবেন। কিন্তু মানুষের ঈমান- আকিদা সহীহ, করণ মানুষকে ইসলামী মেজাজে গড়ে তোলা কিন্তু দেওবন্দীদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন।

ভারতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মাওলানা সাইয়্যেদ আরশাদ মাদানী দামাতবারকাতুহুম, মাওলানা সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী দামাতবারকাতুহুম তাঁরা কাজ করে যাচ্ছে। পুরো ভারতের মানুষের প্রাণের স্পন্দন তাঁরা। এমনকি তাদের বিশ্বব্যাপি অবদান। তাঁরা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে। আর্তমানবতার সেবায় সর্বক্ষণ। মানুষকে আলেম-উলামার সাথে জোড় লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। এছাড়া দেওবন্দী হালকার সাথে ভারতের মুসলমানেরা যেন ওতপ্রতভাবে জড়িত।

মরহুম ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের এক বক্তৃতায় শুনেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, মিয়া সাহেব, ‘এদেশে কোরআনের সমাজ কায়েম করতে চান, অথচ আপনার এদেশের অধিকাংশ লোক সহীহ ভাবে কোরআন তেলাওয়াত জানে না। আগে মানুষকে কোরআন শেখান।কোরআনের জ্ঞান দান করেন। মানুষকে তৈরী করেন।’

কথাটা অত্যন্ত সত্য। দেওবন্দী আলেমগণের সবচেয়ে বড় তাহরীক এদেশের কোটি কোটি মানুষকে কোরআনের জ্ঞান দিচ্ছেন। দ্বীন শেখাচ্ছেন। মানুষকে ইসলামী ধাঁচে গড়ে তুলছেন। আর যারা বলে, বলে আমরা অমুক সনে এতটা আসন পেয়েছি, অমুক সনে এতটা, আর অমুক সনে তো ক্ষমতার কাছাকাছি মানে ক্ষমতার ভাগিদার ছিলাম। বড়াই করেন তারা।

প্রথমতঃ আপনারা যে ক্ষমতায় গিয়েছিলেন, সেটাও দেওবন্দী আলেমদের সমর্থন পেয়েই তারপরে সেখানে পৌঁছেছেন। নচেৎ ভোটের ময়দানে এসব হুজুর ছাড়া আপনাদের কোন ভোট খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

দ্বিতীয়তঃ ক্ষমতায় কি লাড্ডু খিলালেন? দ্বীন ইসলামের কোন ফায়দা হয়েছে বলে কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি আলেমদের মামলাগুলো পর্যন্ত প্রত্যাহার করেননি।

এজন্য সব গালগল্প বন্ধ করতে হবে। দেওবন্দী আলেমদের অবদান ছিল, আছে, থাকবে ইনশাআল্লাহ। যে যাই বলুক আর যাই লিখুক, দেওবন্দী আলেমদের মাইনাস করে কোন ইতিহাস হয় না। তাঁদের অবদান অস্বীকার করে কেউ কোনদিন সামনে বাড়তে পারবে না। আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিষ্ট

আরও পড়ুন: কওমী অঙ্গনে অস্থিরতা কেন?

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com