সোমবার, ২৬ অগাস্ট ২০১৯, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন

রাষ্ট্র, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে মুফতি ফয়জুল করীমের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

মুফতি সাইয়্যিদ ফয়জুল করীম। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান। চরমোনাইয়ের পীর হিসেবে খ্যাত। বয়ানে ও ইসলামী রাজনীতি চর্চায় তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। পবিত্র বুখারী শরিফের দরসেও তিনি সরব। ইতিহাস নিয়েও যথেষ্ট পড়াশোনা রয়েছে তার। তিনি একজন রাষ্ট্রচিন্তাবিদও। দেশবিদেশের ইসলামিক স্কলারদের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্যতা। মুখোমুখি হয়েছেন পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

মাসউদুল কাদির : আসসালামু আলাইকুম

মুফতি ফয়জুল করীম : ওয়ালাইকুম আসসালাম

মাসউদুল কাদির : বিশ্বে এখন যে ক্রান্তিকাল চলছে, সামনে একাদশ জাতীয় নির্বাচন। এর আগেই আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। এ অবস্থায় ইসলামী আন্দোলনের কি করণীয় আছে! চলমান ইস্যুতে বেশ কয়েকটি বিষয় আমাদের সামনে আছে। সেসব বিষয়ে আমরা কথা বলবো। প্রথমেই আমি আপনার সাথে শোয়ার করতে চাই, কওমী শিক্ষা সনদের যে স্বীকৃতি বর্তমান সরকার দিয়েছে, তাতে সরকারকে আপনারাও অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেটিকে ভালোভাবে নিয়েছেন। আমি জানতে চাই, কওমী স্বীকৃতির মানোন্নয়নে আপনার ও আপনার বাবার যিনি দেশের সম্মানিত বিজ্ঞ সর্বজনস্বীকৃত বিশিষ্ট আলেমেদ্বীন ছিলেন হযরত সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.। আল্লাহ তায়ালা তার আত্মাকে আরো সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন করুক। স্বীকৃতিবিষয়ে তার কি অবদান ছিল?

মুফতি ফয়জুল করীম : দেখেন আসলে কওমী স্বীকৃতির ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই একমত ছিলাম। আন্দোলন করেছি। আব্বাজান রহ. যখন হসপিটালে ছিলেন, তখন শায়খুল হাদীস আজীজুল হক রহ. মুক্তাঙ্গনে অবস্থানের ডাক দিয়েছিলেন। তখন আব্বাজান হসপিটাল থেকে সেখানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার স্ন্যাপ আজো বিদ্যমান আছে আমাদের কাছে। কওমী স্বীকৃতির ব্যাপারে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে প্রত্যেকটিতেই আমরা শরীক ছিলাম। জমিয়তুল ফালাহ-য় আমার সে বক্তব্য আপনারা শুনতে পারেন। সেখানে খুব কঠিনভাবে বক্তৃতা করেছিলাম। কওমী স্বীকৃতি আমাদের অধিকার। এটা কোনও অনুগ্রহ-অনুকম্পা নয়। যেহেতু সরকার আমাদের অনুকম্পা নয় বরং আমাদের অধিকারকে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এজন্য সরকারকে আমরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আগেও করেছি, এখনও করছি। বাকী আমাদের অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমরা আমাদের অধিকারকে যেন ভেস্তে না দিই, বিসর্জন না দিই। আমাদের কওমী ধারার একটি স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য অবস্থা আছে। দেওবন্দি মাসলাকের উসূলে হাশতেগানার একটা রীতি আছে এবং আমাদের আকাবিররা কওমী মাদরাসাকে যে তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন এ ভিত্তিকে ঠিক রেখেই আমাদের মর্যাদাকে আমরা বাড়াতে চাই। আমাদের স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ধ্বংস করে এমন অধিকারকে আমি মর্যাদা মনে করি না।

মাসউদুল কাদির : স্বকীয়তা কোনভাবেই আপনি নস্যাৎ হতে দিতে চান না?

মুফতি ফয়জুল করীম : না, কোনও অবস্থাতেই না।

মাসউদুল কাদির : একটা প্রশ্ন! এই যে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরে এসে কাগজে কলমে আমরা শিক্ষিত হলাম, এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন।

মুফতি ফয়জুল করীম : শিক্ষিত তো আমরা আগে থেকেই ছিলাম। ব্যাপারটা হলো একজনের স্বীকার করা না করা। জমি তো আমার আগে থেকেই ছিলো। আপনি স্বীকার করতেও পারেন নাও করেত পারেন। আমি ধনাঢ্য ব্যক্তি। এটা আপনি হিংসায় স্বীকার করতেও পারেন নাও করতে পারেন। আমার মধ্যে যোগ্যতা আছে। আপনি স্বীকার করতেও পারেন নাও করতে পারেন। আপনার স্বীকারের মধ্যে আমার যোগ্যতা আছে কি না, বিষয়টা এমন না। বরং শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দুনিয়াতেই সহিহ ইলমের ধারায় এখন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে সব জায়গায় কওমী উলামায়ে কেরামই আছে। এবং এমন অনেক আলেম আছেন যাদের সামনে জ্ঞানের দিক থেকে অনেক সার্টিফিকেটধারীরাও বসার যোগ্যতা রাখে না। কাজেই কেউ যদি আপনাকে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে আপনি শিক্ষিত নন— ব্যাপারটা এমন না।

মাসউদুল কাদির : এখন এই যে আপনারা কওমী স্বীকৃতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। কেউ এটাকে ভয় করছেন, অনেকে আত্মঘাতীও বলছেন। এখন কওমী স্বীকৃতির মূল স্বাতন্ত্র্য আদৌ কতটুকু রক্ষা হবে! যেটা আপনি বললেন।

মুফতি ফয়জুল করীম : আল্লাহ না করুক। যদি অনেক বেশী আবেগীরা এটাকে অন্য খাতে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে ভবিষ্যতে আবার দুই ধারা সৃষ্টি হয়ে যাবে। সেটা থেকে আবার আরেকটা ধারা সৃষ্টি হবে। একদল মানুষ আগের আদলেই চলতে চাইবে, আরেকদল বেশী আধুনিক হয়ে যাবে। তাদের থেকে এটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এভাবেই আলাদা হয়ে চলতে থাকবে। তবে কেয়ামত পর্যন্ত একটি হক জামাত দুনিয়াতে থাকবে।

মাসউদুল কাদির : আমরা চাই কওমী স্বীকৃতির একটি ভালো উদ্যোগ ও সাফল্য সুন্দরভাবে আমাদের সামনে আসুক। আপনার কাছে পরবর্তী প্রশ্ন, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে উলামায়ে কেরামের মর্যাদা বৃদ্ধিতে আপনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ কী?

মুফতি ফয়জুল করীম : আমি দেখেছি, আসলে আলেমদের মর্যাদা আছে। জনগণও তাদেরকে অনেক শ্রদ্ধা, সম্মান করে। কিন্তু আলেমরা নিজেদের কারণে নিজেরা মর্যাদাহীন হয়। আসলে আলেমদের মর্যাদা নেই তা নয়। তাদের সম্মান দেবে কে? আল্লাহ তায়ালাই তো তাদের সম্মানিত করেছেন। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেই আপনারা তার প্রমাণ পাবেন। আল্লাহপাক উলামায়ে কেরামের মর্যাদা বর্ণনা করার পরে রাসূল বললেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট সেই যে কোরআন শিখে ও শেখায়। কাজেই উলামায়ে কেরামের মর্যাদা নতুনভাবে দেয়ার কিছু নাই। বরং উলামায়ে কেরাম যেন নিজেদের মর্যাদা নিজেদের আচরণের কারণে ক্ষুণ্ন না করেন। মর্যাদা ধরে রাখা দরকার। আল্লাহ মর্যাদা দান করেছেন। দেখুন, কোনও মূর্খ, খোদাদ্রোহী যদি আপনাকে মর্যাদাসম্পন্ন না বলে তাতে আপনার মর্যাদা কমে যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাফেররা ইজ্জত সম্মান করে নাই। তাই বলে তার ইজ্জত সম্মান কমে নাই। আর আপনারা দুশমন থেকে ইজ্জতের আাশা করেনই বা কেন? দরকার নেই তো। উলামায়ে কেরামকে তো আল্লাহ তায়ালা মর্যাদা দিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মর্যাদা দিয়েছেন। ফেরেশতারা মর্যাদা দিয়েছেন। গোটা মাখলুকাত উলামায়ে কেরামের জন্য দোআ করে তাদের মাগফেরাত কামনা করে। কাজেই নতুনভাবে মর্যাদার কিছু নাই। মর্যাদা আগে থেকেই আছে। মর্যাদা ধরে রাখতে হবে। আর মর্যাদা ধরে রাখার ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম যদি শরীয়তের উপর পুরোপুরিভাবে চলতে পারে, তাকওয়ার ভিত্তিতে জীবন গঠন করতে পারে, তাহলে তাদের মর্যাদা থাকবে। অন্যথায় যদি তাকওয়ার উপর জীবন পরিচালনা না করতে পারে তাহলে মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে না। টিকতে পারবে না। টিকে নাই, টিকবে না।

মাসউদুল কাদির : সমাজে এখন একটি ট্রেডিশন দাঁড়িয়েছে যে, আমি আলেম আমাকে নির্বাচন করতে হবে। দুনিয়ার যে মর্যাদার জায়গা আমরা দেখি, সেখানে আমাকে আসীন হতে হবে। তাহলেই কেবল একজন আলেম তার মর্যাদাকে তুলে ধরতে পারবে। আসলেই কি বিষয়টা এমন!

মুফতি ফয়জুল করীম : আসলে দেখেন, ক্ষমতার একমাত্র যৌগ্য উত্তরসূরী হলো উলামায়ে কেরাম। অন্য কেউ না। কারণ, গোটা দুনিয়ার মধ্যে যখন আইয়্যামে জাহেলিয়াত এবং বিশৃঙ্খলতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সেসময় মানবতার মুক্তির জন্যই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামপৃথিবীতে আগমন করেছেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তরসূরি হলো উলামায়ে কেরাম। কাজেই এ দেশের নেতৃত্বদানের হকদার একমাত্র উলামায়ে কেরাম। কারণটা কী? তা হলো, নেতৃত্বদানের জন্য প্রথম প্রয়োজন হল চরিত্রের, আদর্শের। আর আদর্শ অন্য কারো মধ্যে খুবই কম। আদর্শ তো উলামায়ে কেরামের মধ্যে। এই যে ইনসাফ, আদালত রক্ষা করা। এই যে চরিত্রগত বিষয় আছে, যে মানুষের অধিকারকে ফিরিয়ে দেয়া। একজনের পাশে দাঁড়ানো। সৃষ্টির খেদমত করা। যা বলবে সেই ওয়াদা রক্ষা করা। মিথ্যা না বলা, ধোঁকাবাজী না করা। মাল আত্মসাৎ না করা। জুলুম, খুনখারাপি, ইভটিজিং, ধর্ষণ, মাদকব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা, চোরাচালান এসবের সঙ্গে জড়িত না থাকা। এগুলো সব চারিত্রিক ব্যাপার। আপনি দেখেন কোরআনে আয়াত আছে ‘ওয়াইজিবতালা…… ‘ এখানে সবই কিন্তু চারিত্রিক ব্যাপারের কথা বলা হয়েছে। এই পরীক্ষা সে মাস্টার্স পাস করেছে কি না, ডক্টরেট পাশ করেছে কি না! এতগুলো বিষয় জানছে কিনা ব্যাপারটা সেখানে না। হযরত ইবরাহীম আ.-এর চরিত্রের অবস্থা কী! আদর্শের অবস্থা কী! এর উপরই পরীক্ষা নেয়া হয়েছে এখানে। আসলে বাংলাদেশে সবকিছুই আছে, চরিত্র নেই। অনেক ডক্টর আছে, ডক্টরের অভাব নেই, ইঞ্জিনিয়ারের অভাব নেই। অর্থনীতিবিদের অভাব নেই। শুধু চারিত্রিক লোক নেই বলেই বাংলাদেশ আজ এই অধঃপতনে।

মাসউদুল কাদির : আপনি বলছেন, নেতৃত্বে উলামায়ে কেরামের আসা দরকার!

মুফতি ফয়জুল করীম : অবশ্যই! শুধু আসতে হবে না। এগুলো তাদেরই দায়িত্ব। চরিত্রবান ও আদর্শবান ব্যক্তির দায়িত্বই হল নেতৃত্ব দেয়া।

মাসউদুল কাদির : বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতে যে নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছে। আলেম এবং আওয়ামদের মধ্যে একটা বৈরী মনোভাব তৈরী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে নেতৃত্ব তো আলেমরাই দিবেন। তাহলে এই যে বিভাজন, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : তাবলীগ নিয়ে আমি প্রকাশ্যে খুব বেশী আলোচনা করতে চাই না। তাবলীগের ভাইদের শুধু এতটুকুই বলব আপনাদের ভুলের কারণে যেন এতো বড় মহৎ কাজটা ভেস্তে না যায়। কলুষিত না হয়। খণ্ডিত না হয়ে যায়। দেখেন, অনেকেই ভাবত যে চরমোনাই তাবলীগের বিরোধিতা করে। আসলে দেখেন আমরা কিন্তু তাবলীগের বিরোধী নই। আমরা যতটুকু আলোচনা করেছি তা সংশোধনের জন্য। এর বড় প্রমাণ হল, আমরা যদি তাবলীগের বিরোধী হতাম তাহলে তাবলীগের এ সঙ্কটময় মুহূর্তে আমাদের খুশি হওয়ার কথা ছিল। কোনও এক পক্ষের হয়ে খুশি হবার কথা ছিল। কিন্তু না, আমরা কোন কথা বলছি না। আমরা চুপচাপ। বরং আমরা উভয় দলকেই বলেছি আপনারা বসে এই সমস্যার সমাধাণ করে নিন। আপনারাই পারবেন এর সমাধান করতে। আমরা বাইরে থেকে গিয়ে এর সমাধান করতে পারবো না। আমাদের যদি প্রয়োজন হয়, আপনারা যদি প্রয়োজন মনে করেন তাহলে সাহায্যের জন্য আমরা আপনার পাশে থাকব। কিন্তু আপনাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের উদ্যোগে বোধহয় সম্ভবপর হবে না। যাদের মাধ্যমে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তাদেরকেই এর সমাধান করতে হবে। তাদের এ বিভাজন এটা আমাদের কাছে খুব খারাপ লাগে।

মাসউদুল কাদির : এই বিভাজন কি রাজনৈতিক কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে?

মুফতি ফয়জুল করীম : শুধু রাজনৈতিক কেন! আন্তর্জাতিক মহলেরও অনেক চক্রান্ত থাকতে পারে যে ইসলামকে তারা পছন্দ করে না। অবশ্যই তাদের চক্রান্ত থাকতে পারে। এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কাদের পক্ষে কাজ করছে সেটা আমি বলবো না। বলতেও চাই না। কিন্তু আমরা মনে করি, আন্তর্জাতিক ইসলামি শত্রুদের বিশাল কালো হস্তক্ষেপ এখানে আছে। আর এটা আমি বিশ্বাস করি।

মাসউদুল কাদির : আমরা যারা আলেম আছি তারা তো মাদরাসা, মসজিদ এবং দ্বীনি সেক্টরগুলো পরিচালনা করছি এবং নতুন নির্মাণেরও চেষ্টা করছি। কিন্তু একটি বিশাল শ্রেণী যারা স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে, বিশেষত স্কুলগুলোতে। আমাদের ধারণা ৮৫ পার্সেন্ট ছেলেমেয়েরা স্কুলেই পড়াশুনা করছে। তো এই বিশাল শ্রেণীর কোরআনের ক্লাস ও দ্বীনি যে বিষয়গুলো আছে সেসবের বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

মুফতি ফয়জুল করীম : দেখুন, এ ব্যাপারে আমাদের ভাবনা আগ থেকেই আছে। নতুন করে ভাবার কিছু নেই। আমাদের শায়খ ও মোর্শেদ মাওলানা শেখ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ. (আল্লাহ তার মর্যাদাকে আরো উন্নীত করুন) এ নিয়ে ব্যাপক চিন্তা করেই তিনি কোরআন শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মাসউদুল কাদির : কোরআন শিক্ষা বোর্ডের কাজ কী আসলে?

মুফতি ফয়জুল করীম : কোরআন শিক্ষা বোর্ডের মূল কাজই হল ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার মক্তব প্রতিষ্ঠা করা। সেখানে আমাদের কোর্স আছে, সিলেবাস আছে। সিলেবাস সম্পর্কে তো অল্প সময়ে বলা সম্ভব নয়, তাই আপনারা সিলেবাসগুলো দেখুন। আমাদের মূল টার্গেটটাই এখানে ছিল। আব্বাজান রহ.-এর মূল টার্গেট ছিল যে, তুমি যেখানেই পড়ো না কেন বেসিক ও মৌলিক ইসলামী জ্ঞানে তোমার শিক্ষিত হতেই হবে। তোমাকে জ্ঞান অর্জন করতেই হবে। সেহেতু একবছরের মধ্যে আমরা একটি ছেলেকে নামাজ, রোজা ও ওযুর মাসায়েল এবং কোরআন যতটুকু শুদ্ধ করে পড়লে তার নামাজ সহিহ হয়ে যায় এবং মোটামুটি কোরআন পড়তে পারে, এইভাবে আমরা একটা কোর্স করেছি। আমি বিশ্বাস করি, ৬৮০০০ গ্রামে ৬৮ হাজার কেরাতুল কোরআন মাদরাসা প্রতিষ্ঠার যে কর্মসূচি নিয়ে আমাদের শায়খ ও মোর্শেদ কাজ করেছেন। বর্তমানে যার নির্বাহী দায়িত্বে আছেন হযরত মাওলানা মুফতী নুরুল করীম সাহেব দা.বা.। তিনি এ ব্যাপারে অত্যন্ত পরিশ্রম করছেন। যদি আমরা আমাদের এ মিশনে সফল হতে পারি। তাহলে বাংলাদেশের কোনও মুসলিম সন্তান বেসিক ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া থেকে বঞ্চিত থাকবে না।

মাসউদুল কাদির : এখন ধর্মীয় সেক্টরগুলো থেকে কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোতে কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষক থাকে। আমরা একটু খোঁজ নিয়ে যদি দেখি তাহলে দেখব, হিন্দু শিক্ষকরাও কোরআন পড়াচ্ছেন, সিলেবাসে থাকায় হাদিস, মাসআলা মাসাইল পড়াচ্ছেন। শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষক-শিক্ষিকা সরবরাহে আমাদের কী ধরনের উদ্যোগ জরুরি?

মুফতি ফয়জুল করীম : আসলে ব্যাপারটা হলো, আমাদের দেশটাতো আর ইসলামি দেশ না। আর যারা দেশ পরিচালনা করে তারা ইসলাম সম্পর্কে জানেও না। এমনও আছে যিনি ধর্মমন্ত্রী হন তিনি বিসমিল্লাহ পড়তে পারেন না। এমন অনেক ধর্মমন্ত্রী গেছেন যারা শুদ্ধভাবে বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ পড়তে পারে না। আমাদের দেশের মন্ত্রিসভার অনেককেই দেখবেন যারা আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ শব্দদুটোই উচ্চারণ করতে পারে না। এমনকি সালামটুকু পর্যন্ত তারা জানে না। অথচ তারা দাবি করতেছেন মুসলমান। দাবি করতেছেন অনেক বড় শিক্ষিত। আসলে ধর্ম থেকে দেশকে আলাদা করা, এটা কোন মুসলিমের কাজ না। এটা হলো সম্পূর্ণ বেদ্বীনের কাজ। ‘থিওক্রেসি’ বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারা সেকুলারিজম নিয়ে আসছে। থিও এটা গ্রীক শব্দ অর্থাৎ খোদা/ইলাহ। ক্রেসি’ অর্থাৎ আইন। আসলে আগের দিনে গোটা দুনিয়া চলত থিওক্রেসি বা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনুযায়ী। তবে সেই থিওক্রেসি কিন্তু ইসলামি থিওক্রেসি না। সেটা খ্রীষ্ট্রানদের, হিন্দুদের, বৌদ্ধদের, ইয়াহুদিদের। যে থিওক্রেসির মধ্যে তারা নিজেদের বিধান ঢুকিয়ে দেয়ার মধ্যে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে। আমি সংক্ষেপে বলছি, কিন্তু ইসলামে তো রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার কোনও সুযোগই নেই। আর হ্যাঁ! ইসলাম কিন্তু শুধু ধর্মের নাম নয়। ইসলামকে শুধু ধর্ম দ্বারা ব্যাখ্যা দিলে হবে না। islam is a complete code of life (ইসলাম কোড অফ লাইফ)ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় ধর্ম পালন করো কি না। আমি বলবো, ধর্ম না আমি ইসলাম পালন করি। কারণ ইসলাম তো কোড অফ লাইফ। অন্য ধর্মগুলো তো কোড অফ লাইফ না। ইসলামে যেমন, হুদুদ, কেসাস, নসিয়্যতের ব্যবস্থা আছে বিপরীতে অন্যান্য ধর্মে কেবল নসিয়্যতের ব্যবস্থা আছে। উপদেশের ব্যবস্থা আছে। হুদুদ এবং দেশ পরিচালনার কোনও ব্যবস্থা নেই। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেই।

মাসউদুল কাদির : তাহলে কি আপনি বলছেন, একারণেই ধর্মকে একটা জনগোষ্ঠী কোনওভাবেই রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায় না।

মুফতি ফয়জুল করীম : তাদের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে।

মাসউদুল কাদির : স্কুল কলেজ নিয়ে আপনাদের কাজের অবস্থা কী? বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনাদের কাজ ও পরিচর্যার কিছু তথ্য দেবেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : ইউনিভার্সিটিতে মেডিকেলভিত্তিক কাজ করছি। ইঞ্জিনিয়ারিং ও বুয়েটে কাজ করছি। ছাত্র সমাজ যেখানে আছে, তাদের আদর্শবান ছাত্র ও নাগরিক বানানোর জন্য আমরা যথাযথ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি এবং ইনশাআল্লাহ কাজ করছি। আপনি চিন্তা করতে পারবেন না, অনেক ইউনিভার্সিটির ছাত্র এমন আছে যাদের দেখলে চিনতেই পারবেন না এরা কী মাদরাসার ছাত্র নাকি ইউনিভার্সিটির ছাত্র। হয়ত দেখা যাচ্ছে তারা ল’ ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হচ্ছে। পলিটিক্যাল সাইন্সে ফার্স্ট হচ্ছে। অথচ ছাত্র আন্দোলনের সেক্রেটারি। মনে হয় যেন বিশাল কিছু, অথচ তারা স্কুল কলেজের ছাত্র। আমরা তাদের আদর্শবান বানাতে অনেক প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। আল্লাহপাক যদি তাওফিক দান করেন, আমরা যদি প্রোগ্রাম সফল করতে পারি। তাহলে অবশ্য তাদেরকে আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মাসউদুল কাদির : আপনার এই মেধাবী ছাত্ররা, তারা কী সরকারি চাকুরী বা বিসিএস ক্যাডার হিসেবে এগিয়ে আসছে?

মুফতি ফয়জুল করীম : হ্যাঁ! আমাদের অনেক ছাত্ররা গত বিসিএস পরীক্ষায় চান্স পেয়েছে। এ বছরও বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোতে অনেক ছাত্ররা চান্স পেয়েছে। তারাও ভালো করবে আশা করি।

মাসউদুল কাদির : আপনারা তো এগুলো খুব ভালোভাবে দেখছেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : দেখছি! খুব ভালোভাবে সতর্কতা ও তীক্ষ্মতার সঙ্গে দেখছি। কোনও অবস্থাতেই যেন চাকুরী থেকে, কোনও পদ থেকে আমাদের ছেলেরা বাদ না পরে সে চেষ্টাও আমাদের আছে।

মাসউদুল কাদির : আমরা একটু রাজনৈতিক বিষয়ে আসব। অনেক রাজনৈতিক দল আছে যারা সরাসরি ইসলাম পরিপন্থী তাদেরকে আমরা বাম দল মনে করি। তাদের সঙ্গে আমাদের ঐক্য ও পথচলার ব্যাপারে আপনার কাছে কোনো পথ খোলা আছে?

মুফতি ফয়জুল করীম : দেখুন, আসলে ঐক্যের অনেকগুলো সাইড আছে। একটি আদর্শগত ঐক্য আরেকটি বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ঐক্য। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ঐক্য যেমন, বৃষ্টি নেমেছে। এখানে সবারই ছাতা প্রয়োজন। এটা আদর্শগত ঐক্য নয়। রোদ, পিপাসা এখানে ছাতা পানির প্রয়োজন। এগুলো আদর্শগত ঐক্য নয়। এরকম অনেক বিষয় যেগুলোর সঙ্গে এমনিতেই ঐক্য হয়ে যায়। যেমন পাঁচটি জিনিস মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, অন্ন, বস্ত্র। এগুলোর ব্যাপারে সবাই একমত আছে। ওরাও চায় এগুলো বাস্তবায়ন করতে, আমরাও চাই। তবে তাদের দাবির সাথে বাস্তবতার মিল নেই। কিন্তু আমাদের দাবির সাথে বাস্তবতার মিল আছে। ওরা যে থিওরি নিয়ে আসছে গরীব দুঃখী মেহনতি মানুষকে উন্নতি করার জন্য, আমরাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থিওরি নিয়ে এসেছি।

আমরা দেখেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থিওরি অনুযায়ী রাষ্ট্র চালাবার পরে উমর রা.-এর যুগে মদীনার অলিতে-গলিতে যাকাত নিয়ে ঘুরছে কিন্তু যাকাত নেবার মতো কোন লোক নেই৷ দারিদ্র্যতা নাই। দরিদ্র লোক কমে গেছে। তো আমরা চাই যে যদি আমরা ইসলামী অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে সবাই দারিদ্র্যমুক্ত হয়ে যাবে৷ আমি আপনাকে লজিক দিতে পারি যে, পাঁচ বছর বা দশ বছর ইসলামী অর্থনীতি অনুসারে যদি দেশ পরিচালনা করা হয় তাহলে আগামী পাঁচ, দশ বছর পর এদেশে একজন ভিক্ষুকও পাবেন না। দরিদ্র কাউকে পাবেন না। সবাই দারিদ্র্য নামের এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।

মাসউদুল কাদির : আপনারা কাদিয়ানীদেরকে তো কাফের মনে করেন!

মুফতি ফয়জুল করীম : শুধু তাদের না, যে তাদের কাফের মনে না করে তাকেও কাফের মনে করি।

মাসউদুল কাদির : আপনি হয়তো জানেন ড. কামাল হোসেন কাদিয়ানীদের পক্ষে আইনিভাবে লড়াই করেছিলেন।

মুফতি ফয়জুল করীম : এ ব্যাপারে আমার তাহকীক-জানাশোনা নেই৷

মাসউদুল কাদির : আমি তাকে কাদিয়ানী বলছি না৷ তবে এ প্রসঙ্গটা কিন্তু এখানে আসে। যেহেতু তিনি তাদের পক্ষে কাজ করেছেন।
মুফতি ফয়জুল করীম : আসলে ড. কামাল হোসেন একজন আইনবেত্তা৷ তিনি কিন্তু তার শত্রুর পক্ষ হয়েও আইনি লড়াই করতে পারেন৷ সেটা তার পেশা।

মাসউদুল কাদির : বামরা কিন্তু তাদের জনমত গড়ে তোলার জন্য কাদিয়ানীর পক্ষ হয়ে কাজ করেছে। এমন খবর গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে।

মুফতি ফয়জুল করীম : একটা হলো বামদের কথা। আরেকটা হলো পেশা। যেমন কেউ ডাক্তার, এখন তার শত্রুও যদি তার কাছে চিকিৎসার জন্য যায় সে কিন্তু তার চিকিৎসা করতে বাধ্য। আমি আগেই বলেছি এ বিষয়ে আমার জানা নেই। তবুও আমি মৌলিক কথা বলছি, কোন পেশাদার আইনজীবি যদি কারো পক্ষে লড়ে তার পেশা হিসেবে তাহলে তার সাবজেক্ট ভিন্ন। আর তার বিশ্বাস অনুযায়ী যদি লড়ে তাহলেও বিষয়টি ভিন্ন।
মাসউদুল কাদির : কোন প্রেক্ষিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অন্যের সাথে ঐক্য করতে রাজি হবে।

মুফতি ফয়জুল করীম : একদম মৌলিক তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে। ১. ইসলাম ২. দেশ. ৩. জাতি। ইসলাম দেশ মানবতা ও জাতি এ তিনটা স্বার্থ যেখানে থাকবে ইসলামী আন্দোলন সেখানে আছে৷

মাসউদুল কাদির : আপনারা কি আওয়ামীলীগ, বিএনপির সাথে ঐক্য করবেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : এ ক্ষেত্রে কোনও আওয়ামীলীগ, বিএনপি, বাম, কমিউনিস্ট সমস্যা নেই। আর যদি তিনটা স্বার্থ না থাকে তাহলে তারা যা কিছুই হোক মুফতি, মুহাদ্দিস, আলেম, মুহতামিম যাইহোক সেখানে ইসলামী আন্দোলন নাই।

মাসউদুল কাদির : ধরুন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ক্ষমতায় চলে এলো। ঠিক ঐ মুহূর্তে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেমন হবে?

মুফতি ফয়জুল করীম : খুবই সুসম্পর্ক হবে৷ মিয়ানমার, ভারত বা অন্যান্য পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হবে৷ তবে নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষা করে। স্বতন্ত্রবোধ ঠিক রেখে। দেশের স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে। নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি এবং স্বাধীনতার স্থাপনার উপর লাথি মেরে দেশেরও কারো সঙ্গে কোন সম্পর্ক নাই৷ তবে এখানে বলতে চাই। আমাদের যারা পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে আমাদের দেশীয় ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, দেশের মানুষ কিন্তু তাদেরকে ছাড়বে না৷ ক্ষমতায় দল সারাজীবন থাকবে না৷ কিন্তু দেশ থাকবে৷ আমি থাকবো না, আমার দেশ থাকবে। আওয়ামীলীগ, বিএনপি জীবনভর ক্ষমতায় থাকবে না কিন্তু দেশ থাকবে। কাজেই আমার দল বা ব্যক্তির ক্ষমতার জন্য দেশের স্বাতন্ত্র্য অবস্থা, স্বকীয়তা, স্বাধীনতাকে যারা ধ্বংস করার পাঁয়তারা করতেছে তাদেরকে কেউ ছাড়বে না।

মাসউদুল কাদির : স্বাধীনতার কথা বলছিলেন। তো আমরা জেনেছি যে চরমোনাই মাদরসাতেও মুক্তিযুদ্ধের একটা ঘাঁটি ছিলো?

মুফতি ফয়জুল করীম : হ্যাঁ!

মাসউদুল কাদির : এ বিষয়ে আপনি কি জানেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : জানি মানে। আশেপাশের মুক্তিযোদ্ধারা তো আমাদের চরমোনাই মাদরাসাতেই থাকতো। তাদের অস্ত্র ওখানে রাখতেন। আমাদের বোর্ডিংয়ে আমাদের দাদা তাদের খাওয়াতেন।

মাসউদুল কাদির : আপনার দাদা বেঁচে ছিলেন।

মুফতি ফয়জুল করীম : হ্যাঁ! আমার দাদা বেঁচে ছিলেন। শুধু তাই কেন ৭১-এ আমাদের এলাকার হিন্দুরা আমাদের আশ্রয়ে ছিলো৷ তাই এখনো তারা আমাদের অনেক শ্রদ্ধা করে৷ আমাদের ওখানে এখনো ভোটে আমরা হিন্দুদের ভোট বেশী পাই।

মাসউদুল কাদির : এর কারণ কী?

মুফতি ফয়জুল করীম : এর কারণ সেটাই যে তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করেছি। ইসলাম তো শুধু মুসলমানের জন্য না। ইসলাম সমগ্র জাতির জন্য। সমগ্র সৃষ্টির জন্য।

মাসউদুল কাদির : হিন্দুরা হযরত ইসহাক রহ.-এর উপর এতো আস্থা কীভাবে রাখলেন? যেখানে সমগ্র বাংলাদেশে হিন্দুদের কচুকাটা করা হচ্ছে।

মুফতি ফয়জুল করীম : আগে থেকেই আস্থা ছিলো। আসলে আপনি আমার যত কাছে আসবেন তত ভালো করে আমাকে চিনতে পারবেন। দূরে থাকলে তো চিনতে পারবেন না। আমাদের গ্রাম চরমোনাই। আশপাশের হিন্দুদের অনেক ঘরবাড়ি ছিলো৷ তাদের সাহায্য-সহযোগিতা আমাদের পূর্বপূরুষরা আগে থেকেই করে আসছিলো। আমাদের বংশের ঐতিহ্য ছিলো এটা। এমনকি আমার বাবার নানাজান আহসান সাহেব রহ.। তার কাছে হিন্দুরা রীতিমতো হাদিয়া নিয়ে আসতো। এতো ভালোবাসতো তাকে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো আমরা ইসলাম অনুযায়ী চলার কারণে। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্মের উপর অটল থাকার কারণে। আর ইসলামই শিক্ষা দিয়েছে মানবতার। কীভাবে মানুষকে সাহায্য করতে হয় তার। ইসলামতো একটি জানোয়ারকেও সেবা করার শিক্ষা দিয়েছে। সে হাদিস তো আপনাদের জানা আছে যে, হযরত উমর রা. বলেছেন, আমার খেলাফতকালে ফোরাতের তীরেও যদি একটি উট বা কুকুর না খেয়ে মারা যায় তাহলে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে। কাজেই ইসলাম শুধু মানবতার জন্যই নয় বরং গোটা মাখলুকাতের জন্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, খবরদার অকারণে একটি জীবন্ত গাছের পাতাও ছিঁড়বে না। ব্যথা পাবে। ইসলাম গাছের জন্য রহমত। কুকুরের জন্য রহমত। আল্লাহর রাসূল বলেছেন ভোঁতা ছুড়ি দিয়ে জানোয়ার জবাই করো না। সে কষ্ট পাবে। এটা রহমত। রাসূল আরো বলেছেন, খবরদার উটের বোঝা টানা হয়ে গেলে তার উপর বসে থেকো না। সে কষ্ট পাবে। কাজেই ইসলাম শুধু মানবতার জন্যই নয় গোটা মাখলুকাতের জন্যই রহমত। তাই আমি বিশ্বাস করি, ইসলাম যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে শুধু মানুষই উপকৃত হবে না গোটা মাখলুকই উপকৃত হবে৷

মাসউদুল কাদির : আপনি কি আপনার বাবার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের কোন গল্প শুনেছেন! আপনাদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা এসেছিলেন?

মুফতি ফয়জুল করীম : হ্যাঁ! গল্প শুনেছি। তবে আমার বাবা কিন্তু তৎকালীন যুদ্ধের সময় সিনে ছিলেন না। আমার দাদা তখন ওখানের দায়িত্বে ছিলেন। কাজেই আব্বাজানের ভূমিকা থাকা না থাকার বিষয়টি তখন আসেইনি। কারণ তিনি তো তখন দায়িত্বে ছিলেন না। আর যে দায়িত্বে থাকে আলোচনা পর্যালোচনা তাকে নিয়েই হয়।

মাসউদুল কাদির : সাবলীলভাবে বিচার বিভাগকে সাজানোর জন্যে আপনারা কোন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন কি না?

মুফতী ফয়জুল করীম : আমরা ইসলাম হাতে নিয়েছি। ইসলামি হুকুমত ক্ষমতায় এলে সমস্ত বিচার বিভাগ এমনিতেই সুজ্জিত সুন্দর হয়ে যাবে। দেখুন, আপনি এসকে সিনহা, আব্দুল ওয়াহাব মিয়া বা বিভিন্ন বিচারকগণ কি বললেন। আসলে বিচারকদের ঘাড়ের উপরে পিছন থেকে একটা হাত আছে। তাদের কণ্ঠ চেপে ধরার মত। এই জন্যে তারা বিচার করতে পারে না। আর ইসলাম ওই কালো হাতটাকে ভেঙে দিবে। এর বিচারকের তার মানসা অনুযায়ী, তার স্বকীয়তা অনুযায়ী, তার স্বাধীনতা অনুযায়ী বিচার করতে পারবে। এই জন্যেই মানুষ ন্যায়বিচার পাবে।

মাসউদুল কাদির : আমরা ছোটবেলা থেকেই জেনে আসছি গণতন্ত্র একটা কুফুরী মতবাদ, এখন গণতন্ত্র নিয়েই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩০০টি আসনে নির্বাচন করছে, এই বিষয়ে আপনার ব্যাখা কী?

মুফতী ফজলুল করীম : আসলে কিছুদিন আগে আমি কুমিল্লা গিয়েছিলাম, অনেক উলামায়ে কেরাম ছিল, তাদের মধ্যে একজন খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন, আপনারা অনেকে তাকে চিনবেন, আমি নাম বলবো না, আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি নাকি নির্বাচনকে হারাম কুফুরী মনে করেন, কিন্তু কেন? উনি বললেন, আমি নির্বাচনকে গণতন্ত্র মনে করি। আমি বললাম, আপনি গণতন্ত্র আর নির্বাচনকে এক মনে করছেন। আপনাকে এই জ্ঞান কে দিয়েছে? নির্বাচনকে কি কেউ বলে আমি গণতন্ত্র করছি? গণতন্ত্র বেসিক একটা আদর্শ। একটা নীতি। যার মূল থিম হলো of the people, by the people, for the people আর নির্বাচন হলো নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি। নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি আর গণতন্ত্র এক জিনিস না। মনে রাখবেন ক্ষমতায় আসার পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এক হয়, কিন্তু উদ্দেশ্য এক হয় না। দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঠে আসছেন, আবু জেহেল ও মাঠে আসছে, আমার নবীর ঘোড়া ছিল, আবু জেহেলেরও ঘোড়া ছিল, আমার নবীর তলোয়ার ছিল, আবু জেহেলেরও তলোয়ার ছিল, আমার নবীর পক্ষের লোকের রক্তক্ষরণ হয়েছে, আবু জেহেলের লোকেরও রক্তক্ষরণ হয়েছে, আমার নবীর পক্ষের লোক শাহাদাত বরণ করছে, আবু জেহেলের পক্ষের লোক মারা গেছে। ব্যাহিকভাবে দেখতে সব সমান, কিন্তু একটাকে কুফরী আরেকটাকে ইসলাম বলি কেন? কারণটা কী?

ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি, প্রক্রিয়া সমান হয়। কিন্তু উদ্দেশ্য এক হয় না। মূসা আ.এর ফেরাউনের সাথে যুদ্ধ সমান। ইব্রাহিম আ.এর নমরুদের সাথে যুদ্ধ সমান। যুদ্ধ সবসময় সমান হয়, উদ্দেশ্য সমান হয় না। এমনিভাবে হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতি সমান হয়, উদ্দেশ্য সমান হয় না। আবু জেহেলের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর জমিনে মানবরচিত আইন বাস্তবায়ন করা, আর আমার নবীর উদ্দেশ্য ছিল মানব জমিনে ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করা। যেহেতু পদ্ধতি সমান, উদ্দেশ্য সমান, তাই একটা হলো ইসলামবাদ, শহীদ। আরেকটা হলো মৃত্যুবাদ। আজকেও বর্তমান জামানায় ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি সমান হয়। ওরা পোস্টারিং করে আমরাও করি, ওরা মিছিল-মিটিং করে আমরাও করি। ওরাও জনসভা করে, আমরাও করি। কিন্তু আমরা বলবো, আমাদেরটা ইসলামী হুকুমত কায়েম করার জন্যে। আর ওদেরটা সেকুলার, কমিনিজম কায়েম করার জন্যে। ওরা আল্লাহর জমিনে মানবরচিত আইন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায়, আর আমরা ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমাদেরকে নির্বাচন করুন, আমরা ইসলামী হুকুমত কায়েম করবো। যেহেতু উদ্দেশ্য এক না, তাই ওদেরটা হবে সন্ত্রাসবাদ, আর আমাদেরটা হবে ইসলামবাদ। ওরা মারা গেলে ওরা শহীদ হবে না, কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য যেহেতু ইসলাম, তাই আমাদের কেউ মারা গেলে সে শহীদ হবে। কারণ সমস্ত জিহাদে কিতাল থাকতে পারে, কিন্তু সমস্ত কিতালে জিহাদ নেই। কিতাল এবং জিহাদ এক জিনিস না। কিতাল হলো এক কথায়- আল্লাহর জামিনে আল্লাহর হুকুম কায়েম করার জন্যে যে পদ্ধতি, প্রক্রিয়া, পন্থা অবলম্বন করা হবে সেটাই জিহাদ।

একটা কথা না বললেই নয়, অনেকে মনে করে নির্বাচনটা কুফুরী, অমুকের পদ্ধতি। আরে ভাই পদ্ধতি যে কোন জাত থেকে আসতে পারে। যেমন আবু জেহেলের তলোয়ার দিয়ে যদি কোন মুসলমান কাউকে শহীদ করে তাহলে সে কি সওয়াব পাবে না। যেমন খন্দকের যুদ্ধে প্রক্রিয়ার কথা, এটা পারস্যের মাজুসিদের তরিকা, এটা ওহির মাধ্যমে হয় নাই। তো মাজুসিদের, অগ্নিপূজকদের তরিকা অবলম্বন করার কারণে যদি ফজিলত হতে পারে, সেটা ইসলাম হতে পারে, তো এখন যে পদ্ধতিতে ইসলামী হুকুমত কায়েম করা যেতে পারে, সেই পদ্ধতি অবলম্বন করলে আমি মনে করি গুণাগুণ হবে না। আর শুধু গণতন্ত্র হারাম হারাম বলে চিৎকার করেন তাহলে লাভ নেই, কারণ আমি তো গণতন্ত্রের মধ্যেই আছেন। আপনি বিবাহ করছেন কোন আইনে? আপনার মাদরাসা চলে কোন আইনে? আপনার মসজিদ চলে কোন আইনে? তখন আপনার গণতন্ত্রের প্রশ্ন আসে না, কিন্তু যখন নির্বাচন আসে তখন গণতন্ত্রের প্রশ্ন করেন কেন? এই প্রশ্ন আপনার না, এই প্রশ্ন ইহুদী, খ্রিষ্টান, নাস্তিকদের। এখন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে আমার উদ্দেশ্য হলো ইসলামী হুকুমত কায়েম করা, তাই আমারটা জিহাদ হবে। আর ওদের উদ্দেশ্য ভিন্ন তাই ওদেরটা হবে না।

মাসউদুল কাদির : আমরা কোনভাবেই সুদি কারবার থেকে বের হতে পারছি না, আপনারা ক্ষমতায় এলে সুদি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা কী হবে?

মুফতী ফজলুল করীম : এখানের দর্শনের বৈপরিত্য কোনো কিছু নেই এবং ব্যাপক কোন দর্শনের প্রয়োজন নেই। এতে যে কেশিয়ার ছিল সে থাকবে, বর্তমানে যে জাস্টিজ আছে সে জাস্টিজ থাকবে। যে যেখানে আছে সে সেখানে থাকবে। শুধু এতটুকু পরিবর্তন হবে এতদিন তারা হিসাব করেছে সুদে, এখন করবে লাভে। এতদিন তারা বিচার করছে ব্রিটিশ ল তে, এখন করবে ইসলামিক ল তে। কাউকে তার চাকরি ছাড়তে হবে না, শুধু ধরনটা পরিবর্তন করতে হবে। আর ইসলামিক ল- এর সাথে যে ল সাংঘর্ষিক ওইগুলো বাদ যাবে, অন্যগুলো নয়।

মাসউদুল কাদির : সাইফুর রহমান বলেছিলেন, আমরা যেটাকে সুদ বলি আপনারা সেটাকে মুনাফা হলে চালিয়ে দেন। আপনি এই বিষয়ে কী বলবেন?
মুফতী ফয়জুল করীম : আসলে আমি উনার কথাটার মাফহুম জানি না, তাই কিচ্ছু বলতে পারছি না। সুদ এবং মুনাফার মধ্যে পার্থক্য আছে। এই জন্যে থাকে কিতাবুল বুয়ু (ইসলামী লেনদেনসংক্রান্ত অধ্যায়) পড়তে হবে। এরপর তাকে কোনটা সুদ আর কোনটা লাভ সেটা নির্ধারণ করতে হবে।

মাসউদুল কাদির : নারী নেতৃত্বের ভারে নুব্জ প্রায় দেশ। এই মুহূর্ত ইসলামী আন্দোলন কী ভাবছে?

মুফতী ফজলুল করীম : নারীদের ন্যায্য অধিকারের জন্য ইসলাম সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করছে। আর নারীদের মর্যাদা রক্ষা করার জন্যে ইসলাম যতগুলো যুদ্ধ করেছে, অন্য কোন জাতি কখনো এতগুলো করেনি। শুধু একটা উদাহরণ দেই, মোহাম্মদ বিন কাসেম এই ভারতবর্ষে আক্রমণ করার কারণ কী ছিল? শুধু একটা নারীর অভিযোগ। সবসময় নারীদের অধিকারের জন্যে মুসলমানরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু শুধু নারী নেতৃত্বের বিষয় ইসলাম বলছে এটা হারাম, এটা জায়েয নেই। নারী নেতৃত্ব আগেও হারাম ছিল, আজও হারাম, কিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। ইজমায়ে উম্মতের দাবি নারী নেতৃত্ব হারাম।

মাসউদুল কাদির : একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ইসলামী অন্দোলন বাংলাদেশের মূল টার্গেটটা আসলে কী?

মুফতী ফয়জুল করীম : মূল টার্গেট ইসলামকে ক্ষমতায় নেয়া। ইসলামকে শক্তিশালী করা, ইসলামের প্রচার প্রসার করা। আর আমি মনে করি যদি আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী না দেই তাহলে প্রচার হবে কী ভাবে? মানুষ জানবে কী ভাবে? আমরা এই কথা মনে করি না, আমরা আগামী কাল ক্ষমতায় যাব। ইসলামী আন্দোলন ও অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে পার্থক্য এখানে। ইসলাম একদিনে ইস্টাবলিস্ট হয় নাই, চারাগাছ থেকে আস্তে আস্তে বড় হয়েছে। আমরা ইসলামকে আস্তে আস্তে বড় করতে চাই, আস্তে আস্তে তার বিজ বপন করতে চাই। তৃণমুল থেকে যদি ইসলামকে শক্তিশালী না করেন, শুধু ঢাকায় বসে রুমে বসে ইসলাম প্রাচার করবেন, নেতাদের পিছনে গুরুর করবেন, তাহলে ইসলামী হুকুম হবে না। স্বতন্ত্র চিন্তাধারা আসবে না। আমরা তৃণমুল থেকে কাজ করছি, নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছি, ইসলামকে ক্ষমতায় নেয়ার চেষ্টা করি। কারো উপর ভর করে ক্ষমতায় যেতে চাই না।

মাসউদুল কাদির : আপনাদের জন্যে অনেক ভালো ছিল না যে, কোন বড় দলের সঙ্গে আপনারা জোটবদ্ধ হলেন এই শর্তে আপনাদের ২০টি সীট দিবে, আপনাদের এমপি সংসদে থাকবে। সেটা ভালো কাজ হতো না?

মুফতী ফয়জুল করীম : দেখুন, আসলে ক্ষমতায় যাওয়া এক জিনিস, আর আদর্শ বাস্তবায়ন করা ভিন্ন জিনিস। এই পার্থক্যটা বুঝতে হবে। আমি একটা বক্তব্যে বলছিলাম, আমাদেরকে ভোট দিলে ইসলাম ও নবী ভোট পাবে। ধানে নৌকায় ভোট দিলে অমুকে অমুকে ভোট পাবে। কিন্তু অনেকে এর ভুল ব্যাখা করেছে। তারা আমার কথার উদ্দেশ্য বুঝে নাই। আমাদের এই রাজনীতি উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ ও তার রাসূলের আদর্শ বাস্তবায়ন করা। আমরা ভোটটাকে সাপোর্ট মনে করি। ভোট মানে সাক্ষী দেয়া, সমর্থন করা, ভোট মানে সাহায্য করা, ভোট মানে সহযোগিতা করা। তাই যদি নৌকায় ভোট দেন তাহলে সেকুলারকে সমর্থন করলেন। ধানে ভোট দেন তো ডেমোক্রেসিকে সমর্থন করলেন। কাস্তে, মই, হাঁতুড়ি, চাকা ইত্যাদিতে ভোট দেন তো আপনি কমিউনিজমকে সাপোর্ট করলেন। আপনি হাতপাখায় ভোট দেন তো আপনি ইসলামকে সাপোর্ট করলেন। এখন যদি আপনার প্রতীক হয় আল্লাহ ও তার রাসূল ও ইসলাম প্রচারের জন্যে, তাহলে সাপোর্টটা কে পেলো? আপনি কাকে সমর্থন করলেন? আপনি যার আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্যে যেই মার্কায় ভোট দিয়েছেন আপনি তাকে সমর্থন করলেন না? ওরা আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখা দিয়েছে, ওরা জানে না, ওরা বুঝে না। আমাদের কওমি লেভেলের কিছু কাসেমী, আমি জানি না ওরা কেমন কাসেমী, কাসেমি নামে কলঙ্ক। আমাদের কাসেম নানুতবী রহ. যে তাকওয়া ওয়ালা ছিলেন, এখন থেকে যেই ছেলেরা বের হয়, তাদের আদর্শ, আখলাক, তাদের ইবাদত, তাদের নরমিয়ত, তাদের খোদাভিতী যুগশ্রেষ্ঠ ছিলো। কোন গীবতকারী চাটুকার, দুই নাম্বার, ছয় নাম্বার, বেনাম্বার, যাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় বলতে কিচ্ছু নেই, এরকম কেন লোক কাসেমী নাম লাগালে ওর কাসেমী নাম খুলে ফেলতে হবে। দেওবন্দ পড়লেই কাসেমী হওয়া যায় না। মসজিদে নববীতে আল্লাহর নবী দর্শকদের শুনলেই সে সাহাবী হয়ে যায়নি। এটা বুঝতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলোলও কিন্তু রাসূলের হাদীসের দরসে বসেছে।

মাসউদুল কাদির : জোটবদ্ধ হলে আপনারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। তাই জোটবদ্ধও হচ্ছেন না?
মুফতী ফয়জুল করীম : জ্বী এটাই। জোটবদ্ধ হলে আদর্শ বিসর্জন দিতে হয়। আমরা এটা পারবো না।

মাসউদুল কাদির : আপনাদেরকে ক্ষমতায় দেখতে হলে আমাদেরকে আরো কত বছর অপেক্ষা করতে হবে?

মুফতী ফয়জুল করীম : আগামীকালও দেখতে পারেন আল্লাহ পাক রহমত করলে। এতে সমস্যাটা কী! আমি মনে করি খুব ইমিডিয়েটলি এই দেশে ইসলাম ক্ষমতায় আসতেছে। এদেশের নেতৃত্বের বিশাল ঘাটতি হবে। অনেক ঘাটতি হবে। সে বাম হোক আর ডান হোক। বাম ডানের নেতৃত্বে সংকট সৃষ্টি হবে। এই সংকটের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন এবং তাদের দল যেই পর্যায়ে, যেই অবস্থানে আছে, এই দেশের মানুষ তাদেরকে কবুল করে নেয়াটাকেই যোক্তিকতা দেখি আমি, বাকিটা আল্লাহ তাআলা ভালো জানেন।

মাসউদুল কাদির : আপনি তৃণমূল থেকে কাজ করছেন এবং তৃণমূলে বারবার সফর করছেন, আজ বিকালেই হয়তো তৃণমূলের দিকে যাবেন, আর তৃণমূলে মানুষ ইসলামকে বেশি গ্রহণ করেন। আপনি তো প্রায়ই রাজধানীতেও আসেন, কিন্তু রাজধানীতে আমরা তো সে রকম কিছু দেখি না।
মুফতী ফয়জুল করীম : আসলে ইসলামকে সমাজের ইস্টাবলিস্ট মানুষগুলো সবসময়ই দেরিতে কবুল করেছে। এটা আজকের ঘটনা না।

মাসউদুল কাদির : আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রিণ্ট সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে যারা কথা বলছেন তাঁরাই শুধু একটু বিরক্তি ভাব দেখাচ্ছেন ইসলামের প্রতি। কোন একটা শব্দ পেলেই ঘেও ঘেও করে উঠছেন, বিষয়টা কী এমন?

মুফতী ফয়জুল করীম : আমিও তাই দেখছি, কিন্তু এর কারণটা কী? কারণ হলো ওরা জানে যদি ইসলাম ক্ষমতায় আসে তাহলে ওদের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে।

মাসউদুল কাদির : ইসলাম প্রতিষ্ঠান মিডিয়া কেমন ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আপনি মনে করছেন?

মুফতী ফয়জুল করীম : অনেক ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক ভূমিকা পালন করা দরকার। কিন্তু কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে আজকে মিডিয়াকে। আর এটা আন্তর্জাতিক ইসলামী দুশমনদের চক্র। আপনি দেখুন, আজকে বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোর মধ্যে অনেক মিডিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থানটা বিদেশ থেকে আসে। তাদের পরিচালক ভিন্ন দেশের আর এই মিডিয়ার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে একটি নাস্তিক গোষ্ঠীকে ডাকানো হয়েছে এবং এখানে আমাদের ডানপন্থী গ্রুপের কারো হাজারও চেষ্টা করা সত্ত্বেও, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

মাসউদুল কাদির : আপনাকে বাংলাদেশের ইসলামিক তরুণদের অনেক বড় একজন ফ্যান বলা যায়, তো আপনি ব্যক্তিগতভাবে তরুণদের উৎসাহিত করার জন্যে, মিডিয়াকর্মী বানানোর জন্যে অথবা মিডিয়ার ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে আপনার চেষ্টা কতটুকু?

মুফতী ফয়জুল করীম : দেখুন, আমি ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে একদল গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলেছি এবং তাদেরকে নিয়ে বৈঠক করতেছি। আর আমরা একটা ওয়েবসাইট খুলে ফেলেছি, আমাদের প্রিন্ট মিডিয়াতে কিছু সাপ্তাহিক মাসিক পত্রিকাও আছে এবং দৈনিক একটা পত্রিকা করার জন্যে উদ্যোগী হয়েছি। পাশাপাশি বিশেষ করে একদল মিডিয়াকর্মী তৈরি করার জন্যে আমরা বিশেষভাবে চেষ্টা করতেছি।

মাসউদুল কাদির : আমি সর্বশেষ প্রশ্নের দিকে যাচ্ছি। আপনি তো ভারতে সফর করেছেন। অসমিয়া মুসলমানদের সম্পর্কে অবশ্যই আপনার জানাশোনা আছে। এখন অসমিয়াদের নাগরিকত্ব সঙ্কট নিয়ে আপনার এবং আপনা দলের কী ভূমিকা?

মুফতী ফয়জুল করীম : এই ক্ষেত্রে আমার স্পস্ট ক্লিয়ার কথা হলো, এখানে কেন্দ্রীয় সরকার আসামের ব্যাপারে যে ভূমিকা পালন করছে, সেই হিসাবে এখানে স্থানীয় সরকারে পরামর্শ তাদের জন্যে সবচেয়ে বেশি যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু মমতা এই ব্যাপারে বারবার আলোচনা করলেও এটা কেন্দ্রীয় সরকার কোন অবস্থাতেই কর্ণপাত করছে না। এটা তার রাজনৈতিক কারণে। কারণ সে জানে, এই ওরা সাধারণ এই ভোট বিজেপিকে দিবে না। এটা রাজনৈতিক কারণে। আর আরেকটা কারণ আমরা অনেক আগেই বলছি। আসলে এই বাংলাদেশকে দখল করার চক্রান্ত। এই চল্লিশ লক্ষ লোককে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার একটা পাঁয়তারা করতেছে, এবং সেখানে যেই দায়িত্বশীল বক্তব্য দিয়েছে, তারা বলছে বাংলাদেশের সাথে আমাদের আলোচনার ভিত্তিতেই আমরা তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠাবো। আমার স্পস্ট কথা, আমরা আগেই বলেছি। পার্শবর্তী রাষ্ট্রের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই সুন্দর থাকবে, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ থাকবে, সবঠিক আছে, কিন্তু নিজেদের স্বাতন্ত্র্য স্বকীয়তা রক্ষা করে। স্পস্ট কথা হলো, যদি ভারত কোন অবস্থাতেই তাদের দেশের নাগরিকদেরক আমাদের দেশে পাঠানোর চেষ্টা করে তাহলে বাংলাদেশের জনগণ কোন অবস্থাতেই মেনে নিবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে যা কিছু করার প্রয়োজোনে সবকিছুই বাংলাদেশ করবে।

মাসউদুল কাদির : প্রকৃত পক্ষে তারা যদি বাংলাদেশের নাগরিক হয়, তাহলে আপনি কেন গ্রহণ করবেন না?

মুফতী ফয়জুল করীম : আমরা বিশ্বাসই করি না তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তারা কখনোই বাংলাদেশের নাগরিক ছিল না।

মাসউদুল কাদির : তাহলে কী অসমিয়রা মুসলমান হওয়ার কারণে তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে?

মুফতী ফয়জুল করীম : গোটা ভারত বর্ষই তো মুসলমানদের ছিল, সাতশো সাড়া সাতশো বছর শাসন করেছি আমরা। গোটা দেশ তো মুসলমানদের। মুসলমান হওয়ার কারণে পাঠিয়ে দিবে এটা প্রশ্নই আসতে পারে না। অসমিয়দের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চিন্তাধারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত নয়। এখানে দুইটা সাইট আছে। একটা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অন্যটা দেশের বিরুদ্ধে।

মাসউদুল কাদির : পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম’কে আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়ার জন্যে অনেক ধন্যবাদ।

মুফতী ফয়জুল করীম : আপনাদেরকেও অনেক ধন্যবাদ। আল্লাহ তাআলা এই পাথেয় টোয়েন্টিফোর ও ইকরা মালটিমিডিয়াকে ইসলাম, দেশ ও মানবাতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আপনাদের এই কার্যক্রম কবুল করুন।

সাক্ষাৎকারটি শ্রুতিলিখন করেছেন কাউসার মাহমুদ ও আদিল মাহমুদ
ভিডিও ধারণ : ইকরা মাল্টিমিডিয়া

ভিডিও সাৎক্ষাৎকার

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com