২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

রিমান্ডের পরও জবানবন্দি দেননি প্রদীপ

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : চার দফায় ১৫ দিন রিমান্ডে থাকলেও মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যায় নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। চতুর্থ দফার রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এদিকে, সিনহা হত্যার ঘটনা তদন্তে গঠিত প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি ৬৭ জনের সঙ্গে কথা বলেছে। সিনহা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওসি প্রদীপের সংশ্লিষ্টতা কমিটি পেয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্ত কমিটি এখনো পর্যন্ত প্রদীপ দাশের সঙ্গে কথা বলতে পারেনি। সিনহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী ও তৃতীয় আসামি এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এই মামলার দ্বিতীয় আসামি প্রদীপ কুমার দাশ। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে র‌্যাবের একটি দল প্রদীপকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে হাজির করা হয়। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম জানান, সিনহা হত্যা মামলায় আটক বরখাস্ত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমারকে চার দফায় ১৫দিন রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মামলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন। আমরা সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি। তিনি আরো জানান, সিনহা হত্যা মামলার দ্বিতীয় অভিযুক্ত আসামি ওসি প্রদীপ। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেননি। প্রধান ও তৃতীয় অভিযুক্তরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আদালত সূত্রমতে, আত্মসমর্পণের দিন গত ৬ আগস্ট ওসি প্রদীপসহ সাত আসামিকে সাত দিন করে রিমান্ড দেয় আদালত। পরে ২৪ আগস্ট চার দিন, ২৮ আগস্ট তিন দিন ও ৩১ আগস্ট এক দিনসহ মোট ১৫দিনের জন্য ওসি প্রদীপের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। আদালতের আদেশ পেয়ে এই ১৫দিন বিভিন্ন সময়ে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত সংস্থা র্যাব। তবে এই মামলায় রবিবার ইন্সপেক্টর লিয়াকত ও সোমবার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর আদালতের নির্দেশে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক তদন্তেও প্রদীপের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে : সিনহা হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন-গ্রামবাসী ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট ৬৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে। তবে গতকাল পর্যন্ত প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষ্যগ্রহণ করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। ফলে একাধিকবার প্রতিবেদন জমার সময় বেঁধে দেওয়ার পরও ওসি প্রদীপের কারণে দীর্ঘ একমাস ধরে আটকে আছে সিনহা হত্যার প্রতিবেদন। প্রতিবেদন জমা দিতে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছে এই তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এসব তথ্য জানিয়েছেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান গণমাধ্যমকে বলেন, ওসি প্রদীপের সঙ্গে তদন্ত কমিটির সাক্ষাত্ হয়নি। তদন্ত কমিটি রবিবার সারা দিন বৈঠক করে কমিটির মেয়াদ বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। সেইমতে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করেছে মন্ত্রণালয়।

তিনি আরো বলেন, কমিটি সিনহা হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৬৭ জনের জবানবন্দি নিয়েছে। সিংহভাগ বক্তব্যে উঠে এসেছে ওসি প্রদীপ সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তার জবানবন্দি নিয়ে তার দেওয়া তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। এরই মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট অনেকটা গুছিয়ে আনা হয়েছে। শেষ পর্যায়ে রয়েছে তদন্ত। শুধু ওসি প্রদীপের জবানবন্দির অপেক্ষায়। আমরা দুইবার আদালতে আবেদন করেছি তার জবানবন্দি নিতে। তখন ওসি প্রদীপ রিমান্ডে থাকায় আদালত জানিয়েছেন, রিমান্ড শেষ হলেই জবানবন্দি নেওয়া যাবে। এদিকে, রিমান্ড শেষে গতকাল ওসি প্রদীপকে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। আমরা শিগিগরই তার জবানবন্দি নিতে পারব বলে আশা করছি। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো তদন্ত কমিটির মেয়াদেই আমরা রিপোর্ট জমা দিতে পারব।

জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন : সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে কক্সবাজারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সোমবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পালিত এ কর্মসূচিতে ওসি প্রদীপ কর্তৃক নিপীড়নের শিকার নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন মানবাধিকার, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী, ওসি প্রদীপের হাতে নির্যাতিত সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফাসহ পুলিশের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা এতে বক্তব্য দেন। মানববন্ধনে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ায় বরখাস্ত হওয়া ওসি প্রদীপসহ পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা অংশ নেন। মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মা হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তির দাবি জানিয়ে ঢাকা থেকে মোবাইলে দেওয়া বক্তব্য মানববন্ধনের মাইকে প্রচার করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। এ ঘটনায় গত ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস। এতে ৯ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আসামি সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। পরে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়। সিনহা হত্যার পর পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষীকে গ্রেফতার করে মামলার তদন্ত সংস্থা র্যাব। এছাড়া হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরো তিন এপিবিএন সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এ নিয়ে মোট ১৩ আসামি কারাগারে আছেন। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচটি মামলা হয়েছে। যার চারটি তদন্ত করছে র‌্যাব-১৫।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com