২রা এপ্রিল, ২০২০ ইং , ১৯শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৯ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

লেখালেখির আত্নকথন । সিদ্দিক আবু বকর

লেখালেখির আত্নকথন । সিদ্দিক আবু বকর

লেখালেখি আমার পেশা তো নয়’ই নেশাও না! মাংস পোলাও খাওয়ার পর কিন্তু আর কিছু উদরে চালান করার মতো জায়গা থাকে না। তবু মানুষ একটু দই, দু’টো মিষ্টি কিংবা সামান্য ফিরনি অসম্ভব তৃপ্তিতে ভেতরে চালান করে দেয়। টুকটাক ছাইপাস যা’ই লিখি ওটা আমার কাছে উদুরপূর্তির পর সামান্য সাপ্লিমেন্টারীফুড ভেতরে চালান করার মতন আর কী!

আমার প্রিয়ভাজন অনেক না মুষ্টিমেয় কিছু বন্ধু-শুভানুধ্যায়ী আছেন। যারা আমার অনিয়মিত লেখালেখি নিয়ে গভীর মমতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সত্যি বলতে অই অসন্তোষগুলো আমার যাপিত জীবনের বৈস্যিক হাজার চাপে চিরেচেপ্টা জীবন-চৈত্রের তাপদাহে শীতল প্রলেপ দেয়। লিখিয়ে প্রিজনদের প্রতি পরম শ্রদ্ধায়, অফুরান কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ি তখন। অমূল্য এই অসন্তোষের মহাদাওয়াই আমাকে অনাদায়ী ঋণের দায়ে আবদ্ধ করে। ঋণ শোধিতে বেকুল মন তখন চিন্তার জমিনে নিবের আচড় বসায়। ঋণ শোধিতে আমার এই বিক্ষিপ্ত চিন্তার আচড় কিংবা আগর-বাগর যৎসামান্য মানতে আপত্তি নাই । আমার মতন অদক্ষ নবিশ সৌখিন কলম সৈনিকের প্রতি প্রিয়জনদের অসন্তোষ এক পরম পাওয়া। যেদিন এই অসন্তোষের প্লাবন বন্ধ হবে সেদিন হয়তো আমার এই অলস নিবের আচড়ও চিরতরে বন্ধ হবে।

একসময় লেখালেখি নিয়ে ভীষণ ক্ষ্যাপাটে ছিলাম। উদিয়মান তরুণ লেখক লিটলম্যাগ প্রেমি তরুণ-তরূণীর মধ্যে যে ক্ষ্যাপাটে ভাবটা থাকে আর কী! আমার মধ্যেও তাই ছিলো। এখন নাই। নাই মানে, আসলেই নাই। অনিচ্ছায় সাড়ে তিনহাত কবরে মাটিচাপা দিয়েছি সেই কবে…। কারণ বেশি কিছু না। প্রথমত আমি প্রিয় কবি নজরুল হতে পারবো না। পারবো না তার মতন পেটে পাথর বেঁধে দারিদ্র্যতাকে আলিঙ্গণে জড়িয়ে সাহিত্য বানাতে। সেই অদম্য শক্তি, সৎ সাহস কিংবা প্রজ্ঞা আমার নেই। কোন কালেই ছিলো না। আর হবেনা এটাও নিশ্চিত।

স্বপ্নের গলায় তিন তিনবার চেপে ধরে হত্যা করেছি স্বপ্নের বীজ। প্রথম চাপটি মারি বেকারত্বের চাপে যখন অনেকটা দিশেহারা ঠিক তখন বাট স্বপ্নের দম কিন্তু আধমরাও হয়নি তখনো। স্বপ্নের টুটিতে দ্বিতীয় চাপটি বসাই মা-বাবার চাপে বিয়ের পিড়িতে বসার সময়। দ্বিতীয় চাপটি বসাই প্রথম চাপের দ্বিগুণ চাপে। চরম নির্দয় আক্রোশে। এই আক্রোশ আমার অক্ষমতার উপর আমার সীমাবদ্ধতার প্রতি। তৃতীয় এবং সফল চাপটি দিতে সক্ষম হই অনাকাঙ্ক্ষিত বেদনাহত সময়ে। বুঝে উঠতে না উঠতেই, কিছু একটা করার অগেই অথর্ব পুত্রকে ফাকি দিয়ে বাবা চলে যান পরপারে । আরো খোলাসা করে বললে অথর্ব পুত্রকে সকল দায় থেকে মুক্তি দিয়ে বাবার চলে যাওয়া । পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা ছাপা হলে কতই না খুশি হতেন অল্পতে তুষ্ট বাবাটা! উনি ভাবতেন ছেলে আমার মস্তবড় লেখক হবে। বাবাটাও নেই মস্তবড় লেখক হবার স্বপ্নটাও নেই। সেদিন থেকেই মেরে ফেলিছি উদ্ভট ঘোরলাগা স্বপ্নের ফিনিক্স পাখিটারে।

কিছুটা কনফ্লিক্ট ঠেকছে তো? স্বপ্ন আবার মরে না কি? ও তো গা ঢাকা দেয়, অনুকুল বাতাসে আবার ডালপালা মেলে! হ্যাঁ কথা ঠিক স্বপ্ন এক পাজি জিনিস ও মরে না। মরার ভান ধরে মাত্র। আমারটাও মরেনি যাষ্ট ভান ধরেছে। আর এই ভান ধরাটাই আমাকে দিয়েছে বেসুমার বিক্ষিপ্ত চিন্তার অবসর। নিবের দৌড় থেকে দিয়েছে আলস্যের স্বাধীনতা! এতেই আমি প্রচন্ড হ্যাপি। এরপরও যা তৈরি হচ্ছে এ আমার স্বজনের অসন্তুষ্টির দায় মেটানোর চেষ্টামাত্র।

প্রিয়জনরা বলেন, আপনি টুকটাক যা লিখছেন মন্দ না। পত্র-পত্রিকায় পাঠাতে দোষের কী? আসলেই তো দোষের কী? দোষ নাই তবে খোশ থাকার একটা বদ খায়েস আমার মাঝে অনেক দিনের। খোশ থাকার মতো যত্নের সাথে এখন আর শিশুপাতাগুলো বের হয়না (একান্তই আমার বিবেচনা)! অথবা অই পত্রিকায় পাঠানোর মতো মান উত্তীর্ণ লেখাটি হয় তো আমার দ্বারা লেখাই হয়না এখন আর!

আর একটা কথা, ছোটবেলা থেকেই একটা নীতি মেনে চলতাম। বুকে হাত রেখে বলতে চাই এখনো মানি। রাজকবি কিংবা সভাকবি হতে পারবো না। চাটুকার হতেও পারবো না। কারো বাপের বা কারো স্বামীর বা কারো গুষ্ঠির স্তুতি করার মতো অবসর আমার নাই। করতেও পারবো না কোনদিন। আমার যত স্তুতি এক আল্লাহর প্রতি। স্তুতি করবো একজনেরই সে আমার সৃষ্টিকর্তার।
লেখক : কবি ও ছড়াকার

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com