২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৮ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

শক্তের ভক্ত নরমের যম | মুহাম্মাদ আইয়ুব

শক্তের ভক্ত নরমের যম | মুহাম্মাদ আইয়ুব

আমাদের সমাজে শুধু নয়; সারা দুনিয়াতেই একটা কমন নিয়ম হলো, যে পাওয়ারফুল যার শক্তি বেশি তার সাথে কোন জোর জবরদস্তি চলেনা। ঋণ নিয়েছ? সময়মত দিতে হবে নইলে কড়ায় গন্ডায় উসুল করে ছাড়বে। আর যে নরম টাইপের তার সাথে সবাই জোর খাটাতে চায়। রিক্সাওয়ালা পঞ্চাশ টাকার জায়গায় ষাট টাকা চাইল কেন, লাগাও চড়। আর বাই ওয়ান গেট অন হিসেবে গালি ফ্রী।

মফিজ মিয়ার কাছ থেকে রাঙ্গা মিয়া এক সপ্তাহের কথা বলে পাঁচশ টাকা ধার নিয়েছে, এক বছর হয়ে যায় কিন্তু টাকা আর মফিজ মিয়ার নাগালে আসেনা। টাকার পিছে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় এমন হয় যে, মফিজ মিয়া রাঙ্গার কাছে পাওনা টাকা নয় বরং ভিক্ষা চাচ্ছে! অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে, মফিজ মিয়া রাঙ্গা সাহেবের উপকার করে মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে। ঠিক অনুরূপ ঘটনা আমরা আমাদের মালিকের সাথে ঘটাই। যিনি জীবন দিলেন, সম্মান দিলেন, রিজিক দিলেন, ক্ষমতা দিলেন, প্রভাব প্রতিপত্তি, অন্ন বস্ত্র সব দিলেন। এতসব দেওয়ার পরে ছোট্ট একটি হুকুম দিলেন যে, চব্বিশ ঘন্টার ভিতর মাত্র দুইটা ঘন্টা আমাকে দিবে। আমাকেও না বরং তুমি তোমার পরকালীন সুখের জন্য দিনে রাতে মাত্র দুই ঘন্টা সময়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে। অথচ আমাদের ভাবখানা ঠিক রাঙ্গা মিয়ার মত। আজ পড়ি, কাল পড়ি। এখন তো যুবক, একটু বয়স হোক চুল দাড়ি পাকুক তখন না হয় মসজিদে যাওয়া যাবে। আচ্ছা আমাদের মালিক যদি আমাদের সাথে এমন আচরণ করতেন যে, মসজিদে না গেলে পাঁ দু’খানা পঙ্গু থাকবে। যখন মসজিদে যাওয়ার নিয়ত করবে তখন ভাল করে দিব! সুরা ক্বেরাত পড়ার আগ পর্যন্ত বোবা রাখব! অযু শুরু না করা পর্যন্ত হাত লোলা রাখব! ব্যাপারটা কেমন হত তখন? কিন্তু না, আল্লাহ এমন করেন নাই। তাই বলে নির্ভয় হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ পাক ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। দুনিয়ার এক প্রতাপশালী বাদশাহ নমরূদকে আল্লাহ ছাড় দিয়েছিলেন, তাই সে ধোঁকায় পড়ে আসমানে তীর নিক্ষেপ শুরু করে দিয়েছিল স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনকে শেষ করে দিতে (নাউজুবিল্লাহ)। কিন্তু যখন তার সময় ফুরিয়ে এলো তখন আল্লাহ তা’আলা তাকে ধরে ফেললেন। মহা প্রতাপশালী রাজা একটা লেংড়া মশার কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে জুতোর বাড়ির কল্যাণে ইহধাম ত্যাগ করল।

মফিজ মিয়া যদিও তার পাওনা আদায় করতে অক্ষম কিন্তু মহাপরাক্রমশালী মালিক কিন্তু সবকিছুতে সক্ষম!

নমরূদের মতো আরেক রাঙ্গা মহাশয়। নাম তার মিষ্টার ফেরাউন। অহংকারের সীমা ছাড়িয়ে নিজে নিজেকে ‘মহা প্রভু’ ঘোষণা দিয়ে বসলো। আল্লাহ পাক তাকেও ছাড় দিলেন। দেখি উড়তে উড়তে ঘুড়ি কত উপরে যেতে পারে । কিন্তু না, সে সুযোগের সদ্বব্যবহার করলনা। পরিশেষে তার জীবনেও গোধূলি নেমে এল ধূসর হয়ে ঠিক নীলনদের মাঝখানে। হাবুডুবু খেতে খেতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হলো। দুনিয়া ও শেষ আখেরাত ও শেষ। তাই সাবধান! আমাদের জীবনের গোধূলী বেলা যেন ধূসর না হয়ে আসে! মুসলমান হয়েছি তাই সাতখুন মাফ ভাবলে জীবনের সাথে বড় অবিচার হবে। মা ফাতেমার (রাঃ) কবর যদি বলে আমি নবী দুহিতাকে চিনিনা, আমি চিনি আমাল। তখন আমি আপনি কে? সুতরাং আসুন আল্লাহর ইবাদাতে মন দিই। আর তাঁর ঋণ পরিশোধ করে দিই। রাঙ্গা মিয়ার মত গড়িমসি না করি। মফিজ মিয়া যদিও তার পাওনা আদায় করতে অক্ষম কিন্তু মহাপরাক্রমশালী মালিক কিন্তু সবকিছুতে সক্ষম!

ক্বেয়ামতের দিন আগে এক হাজার টাকার নোট তথা নামাজের হিসাব হবে। তারপরে পাঁচ টাকা দশ টাকার হিসাব। যদি বড় নোটের হিসাব ঠিকঠাক মত আদায় করা যায় বাকিটা আল্লাহর দয়া আর নবীজির সুপারিশ চালিয়ে নিয়ে যাবে সমস্যা নাই। আর যদি বড় নোটেই হযবরল হয় তাহলে পাঁচ দশ টাকা ছুঁড়ে ফেলতে দেরি হবেনা।

সুতরাং প্রিয় পাঠক! আসুন আখেরাতের বড় নোটগুলো (ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত) একটু ভাজ করে নিই। কালেক্টর তথা আজরাইল আঃ এসে পড়লে আর কাজ হবে না কিন্তু। অজুহাত দেওয়া তো দূরের কথা, কালেক্টর সাহেবকে দেখলেই গোটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কল কব্জা ঢিলা হতে থাকবে।

আল্লাহর আবার কিসের ঋণ?

আল্লাহ পাক নামাজ পড়ার হুকুম দিয়েছেন বালেগ হওয়ার পর থেকে কিন্তু আমি পাঁচ বছর নামাজ পড়িনি। এখন বিগত পাঁচ বছরের ছুটে যাওয়া কাযা নামাজ আমার কাঁধে আল্লাহর ঋণ। কেউ যদি ভেবে থাকেন যে, কাযা নামায আদায় করার দরকার নাই তাহলে সে ভুলের স্বর্গে আছেন। যদি দুনিয়ার সকল আদালত সম্মিলিত ভাবে আইন জারি করে যে, যে ঋণের মেয়াদ এক মাস পার হয়ে যাবে সেটা আর দেওয়া লাগবেনা। অবাক হওয়ার কিছু নাই। মাটির দুনিয়ায় এই আইন টিকলে টিকতেও পারে কিন্তু কাযা নামায আদায় করা লাগবেনা এই কথা আল্লাহর কাছে অর্ধ সেকেন্ডের জন্য ও টিকবেনা।

বড় নোটের হিসাব না মিললে শুরু হয়ে যাবে আনলিমিটেড ডান্ডা। তাই পিঠে মুগুর পড়ার আগেই সতর্কতা অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ। সুতরাং আসুন, শ্রেষ্ঠ মাস রমজানুল মোবারকেই সৃষ্টির সেরা মাখলুক হিসেবে আল্লাহর ঋণ পরিশোধের মহান কাজে আত্মনিয়োগ করি। আল্লাহর রঙে নিজেদের জীবন রাঙিয়ে তুলি।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com