শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:২২ অপরাহ্ন

শতাব্দীর অন্যতম বেদাত ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’

মোহাম্মদ ইয়াহইয়া শহিদ ● প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহকাল ত্যাগ করে চলে যাবার তিন শতাব্দী পর্যন্ত ইসলাম ধর্ম তাঁর সঠিক দ্বারায়ই চলছিল। অবশ্য নবীজী সা. বলেও গেছেন তাঁর যুগ ও পরিবর্তী দুই যুগ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ যুগ, কিন্তু তৃতীয় শতাব্দীর পরে ইসলাম ধর্মে ধর্মের নামে অনেক কিছুকে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল ইসলাম বিদ্বেষীরা। অনেকটা সফলও বলতে হবে তাদেরকে। কারণ, তৃতীয় শতাব্দীর পরে ইসলাম ধর্মে এমন কিছু বিষয়কে মানুষ ধর্মীয় ইবাদাত মনে করতে শুরু করেছে, যার সম্পর্ক ইসলাম ধর্মের সাথে কোনভাবেই নেই। এমন এক নব আবিষ্কৃত ইবাদতের নাম ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’।

ঈদ, মিলাদ, নবী, তিনটি শব্দই আরবি। ঈদ অর্থ উৎসব (রুপক অর্থে), মিলাদ অর্থ জন্ম আর নবী অর্থ বার্তাবাহক। ঈদে মিলাদুন্নবীর বাংলা অর্থ হয়, নবীজীর জন্মোৎসব। ১২ রবিউল আউয়াল ইসলাম নামদারী একটা মহল এ জন্মোৎসবটি অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করে থাকে। তাদের সাথে অনেকেই এটাকে ধর্মীয় উৎসব মনে করে ঈদে মিলাদুন্নবী নামের বেদাত পালনে শরিক হয়ে থাকেন। আপনারা যারা কেবলই পোস্টার ফেস্টুন আর দেয়াল আর্ট দেখে ঈদে মিলাদুন্নবীর মতো একটা বেদাতে লিপ্ত হোন, একবারের জন্য হলেও কি খোঁজ নিয়েছেন? ইসলামে এরকম কিছু ছিল কি না! আদৌ কি ইসলামের সাথে ঈদে মিলাদুন্নবীর কোনো সম্পর্ক আছে কি না? আপনি সত্যিকার অর্থে মুহাম্মদ সা. এর উম্মত দাবি করলে অবশ্যই আপনাকে জানতে হবে। যদি না জানেন সেই জবাবটাও কিয়ামতের দিন আপনাকেই দিতে হবে। খুব সংক্ষেপে ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে কিছু আলোচনা করছি৷ আপনি যদি সত্যান্বেষী হয়ে থাকেন অবশ্যই এইটুকুই আপনার জন্য যথেষ্ট হবে বলে মনে করছি।

আমার উস্তাদ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. একটা কথা প্রায়ই বলেন, ‘দ্বীন জজবার নাম নয়, দ্বীন রাসুল সা.-এর অনুসরণের নাম’। হুজুরের কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মের সাথে যেহেতু আবেগের সমুর্কটা একটু বেশিই, তাই আমরা আবেগে অনেক কিছুই ধর্ম মনে করে করে ফেলি। যার সম্পর্ক আসলে ধর্মের সাথে নেই।

তৃতীয় ঈদ পালনের বিধান : ঈদে মিলাদুন্নবী নামে জন্মোৎসবটি পালন করা সর্বসম্মতিক্রমে বেদাত অর্থাৎ নব আবিষ্কৃত বা নব সংযুক্ত। (সর্বসম্মতিক্রমে বলার কারণ হচ্ছে, যারা ঈদে মিলাদুন্নবীকে বৈধ বলে, তাঁরা ইসলাম ধর্মের চারটি মূলনীতির কোনোটি দিয়ে এই ঈদকে বৈধ করতে পারে না। কারণ এই ঈদের ভিত্তি ইসলামে নেই।)

বেদাত বলা হয়, উপাসনা মনে করে পূণ্যের আশায় এমন কোন কাজ করা, যার সম্পর্ক ইসলামের প্রথম তিন যুগে ছিল না। যেহেতু এই ঈদের সম্পর্ক ইসলামের প্রথম তিন যুগের সাথে নাই, তাই এই ঈদ পালন করা উলামদের মতে বেদাত।

আজব ঈদের সূচনা : ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ এ জাতীয় উৎসবের ভিত্তি কোরআন ও হাদিসে বা ইসলামের প্রথম তিন যুগে পাওয়া যায় না। তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ইসলামি যুগেও বিধর্মীরা এ জাতীয় উৎসব পালন করত। যেমন- গ্রীক, ইউনান, ফিরিয়ানা ইত্যাদি সভ্যতায় তারা স্বীয় দেবতার অনুষ্ঠান পালন করত। তাদের থেকে গ্রহণ করেছে খৃষ্টান সম্প্রদায়। খৃষ্টানদের কাছে তাদের সবচে বড় উৎসব হলো তাদের নবীর জন্মোৎসব পালন করা। সেখান থেকেই অনুসৃত হয়ে এসেছে একশ্রেণীরর মুসলিম সমাজে।

এখন প্রশ্ন হলো- কখন থেকে মুসলিম সমাজে এ অনৈসলামিক সভ্যতার অনুপ্রবেশ ঘটল? এখানে সব আলেমরা একমত যে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন (সাহাবাদের পরের যুগ) ও তবে তাবেয়িন (তার পরের যুগ) এর মধ্যে এ জাতীয় উৎসব নামে কিছুই ছিল না। এই তিন যুগের পরে এই বেদাতের আবির্ভাব হয়েছে। পরে কোন সময় কার মাধ্যমে এ বেদাতের আবির্ভাব হলো; এ সম্পর্কে আমি তিন সুত্রে তিনটি তথ্য পেয়েছি।

১. আরবালের বাদশা মুজাফফর উদ্দিন কৌকুরি ৬০৪ হিজরিতে সর্বপ্রথম এই প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবী আবিষ্কার করেন। প্রতি বছর অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে এ উৎসব পালন করতে তিনি তৎকালীন প্রায় তিন লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করতেন। বাদশাহর এই উদারতার কারণে একদল লোক তার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এবং তার পর থেকে বিভিন্ন দেশে এ প্রথা চালু হয়। [তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া]

২. হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষের দিকে মিসরে ফাতেমি সম্রাজ্যে এ বেদাতের উদ্ভব ঘটে। তারা সর্ব প্রথম ছয়জন ব্যক্তির জন্মোৎসব পালন করে। ১. নবী মুহাম্মদ সা. ২. আলী রা. ৩. হাসান রা. ৪. হুসাইন রা. ৫. ফাতেমা রা. ৬. তৎকালীন ফাতেমি সাম্রাজ্যের খলিফা। তখন থেকে শিয়া বা ফাতেমি সম্প্রদায় স্বউদ্যোগে জাতীয়ভাবে ছয়জনের জন্মোৎসব পালন করত। [তথ্যসূত্র : আল খিতাত লিল মাকরিযী ১ম খন্ড ১৯০-১৯৯ পৃষ্ঠা]

৩. হিজরির সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে ইরাকের তৎকালীন বাদশার পৃষ্ঠপোষকতায় দরবারী আলেম ওমার বিন মুহাম্মদ মুল্লা এর পরিচালনায় সর্বপ্রথম এ উৎসবের সূচনা হয়। [তথ্যসূত্র : আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৩ নং খন্ড ১৪৭ পৃষ্ঠা]

ইসলামের প্রথম যে তিন যুগকে নবী সা. উত্তম যুগ বলেছিলেন সেই তিন যুগ ৩য় শতাব্দীতেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আর ঈদে মিলাদুন্নবীর আবিস্কার ৪র্থ শতাব্দীর পরে। এতে বুঝতে কষ্ট হয় না যে, এটা ইসলামে একটি নতুন আবিষ্কৃর একটা বিধর্মী সভ্যতা। অতএব, যেহেতু এই সূচনা থেকেই ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই, তাই এই ঈদ ইসলামের নামে পালন করার কী যুক্তি আছে আপনার কাছে!

১২ রবিউল আউয়াল যে সর্বসম্মতিক্রমে নবীজীর ওফাত দিবস, তাহলে ঐদিন তো বিয়োগব্যথায় কাতর হয়ে থাকার কথা ছিল। তার পরিবর্তে আপনি জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করে কেক কেটে উৎসব করার মানেটা কী? না কি ঈদে মিলাদুন্নবী নামে ঈদে ওফাতুন্নবী (নবীজীর মৃত্যু উৎসব) পালন করছেন?

একটু অন্যদিকে যাই …..। আচ্ছা মেনে নিলাম আপনি নবীর জন্মদিন পালন করবেন! কিন্তু আপনি বলেন তো, নবীজীর সঠিক জন্মতারিখ কত? ৯ রবি. আউ. থেকে শুরু করে ২৪ রবি. আউ. পর্যন্ত কোন তারিখের কথাই তো ইতিহাসবিদগণ বাদ দেননি, তাহলে শুধুই ১২ রবিউল আউয়াল কেন? আচ্ছা মেনে নিলাম ১২ তারিখের মতটি বেশি, তাই ১২ তারিখেই পালন করেন। কিন্তু ১২ রবিউল আউয়াল যে সর্বসম্মতিক্রমে নবীজীর ওফাত দিবস, তাহলে ঐদিন তো বিয়োগব্যথায় কাতর হয়ে থাকার কথা ছিল। তার পরিবর্তে আপনি জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করে কেক কেটে উৎসব করার মানেটা কী? না কি ঈদে মিলাদুন্নবী নামে ঈদে ওফাতুন্নবী (নবীজীর মৃত্যু উৎসব) পালন করছেন?

আমার উস্তাদ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. একটা কথা প্রায়ই বলেন, ‘দ্বীন জজবার নাম নয়, দ্বীন রাসুল সা.-এর অনুসরণের নাম’। হুজুরের কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মের সাথে যেহেতু আবেগের সমুর্কটা একটু বেশিই, তাই আমরা আবেগে অনেক কিছুই ধর্ম মনে করে করে ফেলি। যার সম্পর্ক আসলে ধর্মের সাথে নেই। আমারা আমাদের জজবা ও আবেগকে ইসলামের অনুকূলে এবং নবীজী সা.-এর রেখে যাওয়া পথ ও পন্থার অনুসরণে নিয়ে আসতে হবে। আর তখনই ঈদে মিলাদুন্নবীর মতো নিকৃষ্ট বেদাতের জন্ম আমাদের দ্বারা হবে না।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক
আহবায়ক : জমিয়তে আনসার বাংলাদেশ সিলেট জেলা

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com