১৬ই আগস্ট, ২০২০ ইং , ১লা ভাদ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

শত্রু যখন বন্ধুরূপে হাসে

সরলকাব্য । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

শত্রু যখন বন্ধুরূপে হাসে

বড় খতরনাক একটি বিষয়। যে সারা জীবন দুশমুনি করেছে। পদে- পদে, মুহুূর্তে – মুহূর্তে, যুগ যুগ ধরে, বছরের পর বছর, শেষমেষ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর কুলিয়ে উঠতে পারেনা, ঠিক তখনই সে তার রুপ পরিবর্তন করে। কৌশল চেঞ্জ করে নয়া ফন্দি আঁটে। এখন সে বন্ধুর রুপ নেয়। বন্ধু সেজে ক্ষতি করার চেষ্টা করে তলে তলে। মানে কথায় বলে ” মুখে শেখ ফরীদ বগলে ইট”।

একটা বড় ধরনের কপটতা। যাকে আমরা সহজে বুঝি মুনাফেকী। মুনাফেক সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। ইয়াহুদী – খ্রিষ্টান যারা ইসলামের চরম দুশমুন, তার থেকেও মারাত্মক হল, মুনাফেক চক্র।

মুনাফেক চক্র রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানায় ইসলাম এবং মুসলমানদের চরম ক্ষতি করেছে। ওরা মুসলমানদের লেবাস ধারণ করে মুসলমানদের বিপদে ফেলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। যখনই মুসলমানদের জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তখনই ওরা ওঁৎ পেতে থেকেছে। সময় সুযোগে বিপদগ্রস্ত করতে দ্বিধা করেনি।

ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানগণ পেয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে যুদ্ধ করার জন্য রওয়ানা হল, তখনই মুনাফেকগণ হণ্যে হয়ে গেল। মুসলমানদের মধ্যে ডিভাইডেট করে তারা কিছু মুসলমানকে যুদ্ধ থেকে বিরত করে ফেলল। একদল বাগিয়ে নিয়ে মুসলমানদের শক্তিকে দুর্বল করে দিল।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মুনাফেগণ ইসলামের ক্ষতি সাধন করেছে। সময়ে- অসময়ে মুসলমানদের বেশধারণ করে মুসলমানদেরই বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে।

বহুরূপি চরিত্রের অধিকারী হল মুনাফেক গোষ্ঠী। যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন তারা বলে আমরা তোমাদের সাথে আছি। আবার যখন ইসলামের দুশমুনদের সাথে মিলিত হয়, তখন তারা তাদেরকে বলে আসলে আমরা তোমাদের সাথেই। মুসলমানদের কাছে যাই তাদের বিদ্রূপ করার জন্য।

মুনাফেকদের এসব হঠকারিতার ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে তুলে ধরেছেন, ” ওয়া ইজা লাকুল্লাজিনা আমানু কলু আমান্না, ওয়া ইজা খলাও ইলা শায়াতিনিহিম, কলু ইন্না মায়াকুম”।

যখন তারা মুসলমানদের সাথে মিলিত হয়, তখন তারা বলে আমরা ঈমান আনলাম, আর যখন শয়তান- কাফেরদের সাথে ( গোপনে) মিলিত হয়, তখন তারা বলে আমরা তোমাদের সাথেই আছি। ( সুরা বাকারা- ১৪)

এটাই হল মুনাফেকদের চরিত্র। মুনাফেকগণ এভাবে মুসলমানদের জামাতে প্রবেশ করে বড় ক্ষতি করে ফেলে। আসলে ওরা পুর্বের থেকেই ইসলাম বিদ্বেষী। কিন্তু যখন মুসলমানদের সাথে আর পেরে ওঠেনা, তখনই শুরু হয় তাদের আসল অপকর্ম। ওরা মুসলমানের রুপ নেয়।মুসলমানের বন্ধু হয়। এরপর মুসলমানদের তলে তলে ক্ষতি করতে খাকে।

মুসলিমদের হুঁশিয়ার হওয়া চাই। সতর্ক- সজাগ দৃষ্টি থাকবে সব সময়। যাতে মুনাফেকগণ যেন কোন ক্ষতি করতে না পারে।

বড় আশ্চর্যের বিষয়, যারা নবী এবং সাহাবাদের দুশমন। পদে পদে আলেম- উলামা এবং দ্বীনদার মানুষদের যুগ যুগ ধরে ক্ষতি করে আসছে।

দুশমনি করে আসছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে। সময়ে সুযোগে আলেমদের বেকায়দায় ফেলে দেয়। বহু আলেমকে অন্যায় ভাবে জুলুম -নির্যাতন করেছে। আহত করে রাস্তায় ফেলে রেখেছে। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হল, তাদের থেকে নবী আলাইহিমুচ্ছালাম এবং সাহাবায়ে কেরাম রেহাই পাননি। সমালোচনায় তুলোধুনো করেছেন নবী-সাহাবীদের। ঠিক, সেই গ্রুপের লোকদের আলেমদের জন্য হঠাৎ মায়াকান্না ভাবিয়ে তোলে সকলকে।আলেমদের বন্ধু রুপে এসে পাশে দাঁড়ানোতে ভীত বিজ্ঞ আলেম এবং দ্বীনদার সমাজ।

যাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি আল্লাহর প্রিয় নবীগণ। যাদের থেকে রেহাই পায়নি সাহাবাগণ। যাদের অত্যাচার থেকে এযুগের ওলামা-মাশায়েখ বাঁচতে পারেনি। তাহলে সেসব লোকেরা আলেম সমাজের বন্ধু হয় কিভাবে?

কেন এত মায়াকান্না ওদের? উদ্দেশ্য কি? আর কোন আলেমদের জন্য দরদ লাগেনা। কিন্তু দু -একজন আলেমের জন্য দরদ উথলিয়ে পড়ে তাদের। এখানেই চিন্তার বিষয়। ” ডাল মেঁ কুচ কালা হায়”। কোন রহস্য আছে বলে মনে হচ্ছে।

কওমী মাদ্রাসার উপর দিয়ে বহু ঝড়-ঝাপটা। ওরা কিন্তু নীরব ছিল। এই যে কওমীর স্বীকৃতির জন্য সকল আলেম এক প্লাট- ফরমে। কিন্তু ওরা তখন প্রকাশ্যে বিরোধীতা করেছে। শতবার চেষ্টা করেছে কিভাবে কওমীওয়ালাদের স্বীকৃতি থেকে মাহরুম করা যায়। তারা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনতো ওরা স্বীকৃতি হতেই দেয়নি। আমাদের প্রাজ্ঞ শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. এবং চরমোনাই এর মরহুম পীর সৈয়দ ফজলুল করীম রহ. তাঁরা যে সংগ্রাম করেছিল, সে ডাকে সাড়া দেয়নি। বরঞ্চ ভিতরে ভিতরে স্বীকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করেছিল।

কিন্তু বড় চিন্তার বিষয়, আজ তারা কিছু আলেমের বন্ধু রুপে আভির্ভূত হয়েছে। বড় দরদ- মহব্বত দেখাচ্ছে। চরম শত্রদের হঠাৎ আচরণে এমন পরিবর্তন জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে।

তবে ওলামায়ে কেরামের সতর্ক হওয়ার এখনই সময়। দুশমুনেরা যতই ভালবাসা দেখাক না কেন, আমাদের সজাগ থাকতে হবে সব সময়। ওদের সাথে গা ভাসিয়ে দিলে চরম ভুল হবে।

আমরা জানি ইসলামের ইতিহাসে কি বলে।আমাদের পুর্বসূরীগণ এসব মুহূর্তে কি পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটা সকলেরই জানা। ঘরের মধ্যে ইখতেলাফ হলে ঘরের লোকজন দিয়ে মীমাংসা করা শ্রেয় কাজ। সে সময়ে বাহিরের কাউকে শালিস- বিচারের জন্য ডাকা বা বহিরাগত শত্রুর সাহায্য তলব করা চরম নির্বুদ্ধিতা।

এক্ষেত্রে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আলী রা. এবং আরেক প্রসিদ্ধ সাহাবী মুআবিয়া রা.-এর মাঝে মতানৈক্য এবং সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিধর রোম সম্রাটের তরফ থেকে মুআবিয়া রা. কে সাহায্য করার জন্য আলী রা.-এর বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করার ব্যাপারে যে চিঠি লিখেছিল রোম সম্রাট, আর মুআবিয়া রা.-এর কি ভূমিকা ছিল, সেটা উল্লেখ করতে পারি।

রোমের খ্রিষ্টান সম্রাট মুআবিয়া রা.-এর কাছে এ মর্মে চিঠি লিখল, তোমার ভাই আলী রা. তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে, আমি আপনার সাহায্যের জন্য সৈন্য পাঠাতে প্রস্তুত আছি।

রোম সম্রাটের চিঠির উত্তরে মুআবিয়া রা. লিখলেন,

” হে খ্রিষ্টান কুকুর! আমার আর হযরত আলী রাঃ এর মধ্যে যে মতভেদ দ্বারা তুই ফায়দা লুটতে চাচ্ছিস? মনে রাখিস, তুই যদি আলী রা.-এর দিকে বাঁকা নজরে তাকাস, তাহলে হযরত আলী রা. এর বাহিনীর সৈনিক হয়ে সর্বপ্রথম আমি মুআবিয়া তোর চোখ ছিদ্র করে দিব।

একদা রোম সম্রাট মুসলমানদের গৃহযুদ্ধের দ্বারা ফায়দা লুটে হামলা করার সিদ্ধান্ত নিল। হযরত মুআবিয়া তা শুনতে পেয়ে রোম সম্রাটের নামে এ মর্মে চিঠি লিখলেন। যদি তোর ইচ্ছা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাও, তাহলে আমি কসম করে বলছি, আমার সাথে হযরত আলী রাঃ এর সাথে মীমাংসা করে নিব এবং তাঁর বাহিনীর প্রথম দলে শরীক হয়ে কুসতুনতুনিয়াকে জ্বালিয়ে কয়লা বানিয়ে দিব এবং তোর রাজত্বকে মুলার ন্যায় মুলোৎপাটন করে ছাড়ব।

( তাজুল উরুস, খণ্ড- ৭ পৃষ্ঠা ২০৮) ( হুদুদে ইখতেলাফ, মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. সংকলক, মুফতী ফারুক রহ; অনুবাদ, মুফতী মামুন রশিদ, পৃষ্ঠা-৬২)

আমাদর আলেম সমাজের ভাবার বিষয়, কি করব? কারো সাথে সখ্যতা গড়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করা প্রয়োজন। আর দুশমনদের সাথে কোন বন্ধুত্ব নেই। ওদের কিন্তু ডাকা যাবে না নিজেদের ঘরের মতানৈক্য মেটানোর জন্য। কেননা, ওদের মাকসাদ ভাল নয়। ওরা সাহায্য করতে চাইলে প্রত্যাখ্যান করা চাই। ওদের সাহায্য নেওয়া মানে আরো বিপদ ডেকে আনা।

এই পরিস্থিতিতে দুশমনের মায়াকান্না, দরদ বড্ড চিন্তার বিষয়। দুশমন হঠাৎ বন্ধুর আচরণ করলে মনে করতে হবে, কোন গূঢ় রহস্য নিহিত আছে। ওরা এত দরদি, তওবা করুক তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ থেকে। তাহলে বোঝা যাবে ওরা আলেমদের কল্যাণকামী। আল্লাহ আমাদের সকলকে সহী বুঝ দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com