২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৯ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

শরণার্থী শিবিরে জমিয়তুল উলামা : মানুষের জন্য হৃদয়বিগলিত মমতা

বিপন্ন মানুষ। মানবতা কাঁদছে সাগর পাড়ে। বিক্ষুব্ধ মুসলিম বিশ্ব। লাখো লাখো মানুষের মিছিল দেখে জাতিসংঘসহ বিশ্বের প্রায় দেশই মিয়ানমারের এহেন নিন্দনীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনেও উঠে এসেছে মিয়ানমারের নৃশংসতার কথা। বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামাও দাঁড়িয়েছে বিপন্ন এই রোহিঙ্গাদের পাশে। এখনও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে কাজ করছে জমিয়তুল উলামা। যারা ঘুরে এসেছেন মতামতসহ তুলে ধরা হলো বিশেষ প্রতিবেদনটি।

লাখো কোটি হৃদয়ের ¯পন্দন, হযরত শায়খুল হিন্দ ও হযরত শাইখুল ইসলামের চিন্তার ধারক, হযরত ফিদায়ে মিল্লাতের জানেশীন। শুধু ভারত নয় গোটা মুসলিম মিল্লাতের পথপ্রদর্শক, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সিপাহসালার হযরত মাওলানা মাহমুদ মাদানী দামাত বারাকাতুহুম- এর পুরো মনোনিবেশ ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান, ফিদায়ে মিল্লাতের প্রধানতম খলিফা, রায়হানাতুল আসর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম- এর নির্দেশে নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহযোগিতায় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারী, মাওলানা হাকিমুদ্দিন কাসেমী, সংগঠক মাওলানা আহমাদ আব্দুল্লাহ এবং বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার মুখপাত্র মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন, সাংগঠনিক স¤পাদক মাওলানা ইমদাদুল্লাহ কাসেমী, সহ-সাংগঠনিক স¤পাদক মাওলানা শুয়াইব আহমেদসহ নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সেপ্টেম্বরের এক সকালে শাহপরীর দ্বীপে রওনা হয়। এটা সেই দ্বীপ যেখানে নৌকায় করে রোহিঙ্গারা বার্মা থেকে বাংলাদেশে এসে নামে। পতিমধ্যে কিছু দূর পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জওয়ানরা জিজ্ঞাসাবাদ করে। বাংলাদেশ জমিয়তের সঙ্গীরা উত্তর দেওয়ার পরই যাওয়ার অনুমতি মেলে। এদিকে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। মাইক্রোবাসে করে আমরা টেকনাফ জেলার নতুন পাড়ায় পৌঁছাই যা আমাদের থাকার জায়গা থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সামনে রাস্তা খারাপ থাকায় মিলিটারির জওয়ানরা গাড়ি সামনে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। এরপর নতুন পাড়া থেকে আমরা সবাই অটো রিক্সায় করে কিছুদুর যাই ।

দেখতে পাই মজলুম রোহিঙ্গাদেরকে ক্যা¤েপর দিকে পৌঁছানো হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার পরে অটো রিক্সারও রাস্তা শেষ হয়ে যায়। তারপর প্রবল বৃষ্টি ও বাতাসের মধ্যে সব সাথীরা প্রায় দেড় দুই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সমুদ্র তীরবর্তী নদীর পাড় দিয়ে কোথাও ইট, কোথাও বালু ও কোথাও মাটির রাস্তা পার হয়ে এমন একটি জায়গায় পৌঁছাই যেখান থেকে ¯িপডবোট বা মোটরবাহী নৌকায় করে শাহপরীর দ্বীপে পৌঁছাতে হয়।

মনে এই প্রশ্ন জাগতে লাগলো যে অসহায় মজলুম রোহিঙ্গাদের এই বৃষ্টির মধ্যে কী অবস্থা হবে? এবং পতিমধ্যেই এই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো যে, আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা, শিশু মাথার উপর নিজেদের সামানাপত্র নিয়ে বৃষ্টিতে কাঁপছে। আমাদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। কিন্তু আজকের নির্ধারিত জায়গায় তো পৌঁছতেই হবে।

এখান থেকে ¯িপডবোটে করে শাহপরীর দ্বীপে মাদরাসায়ে বাহরুল উলূমে পৌঁছাই। গ্রামে প্রবেশ করেই রাস্তায় এমন কিছু লোকের সাথে দেখা হয় যারা মাথায় সামানাপত্র নিয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয় খোঁজ করছে। জিজ্ঞাসা করতেই জানা গেল যে তারা আজকেই বাংলাদেশে এসেছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। অশ্রুসিক্ত চোখে সানজিদা নামে এক নারী জানায় যে, আমাদের মধ্যে অধিকাংশ পুরুষদেরই সেনাসদস্যরা গুলি করে শহীদ করে দিয়েছে। আমরা রাতের অন্ধকারে বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে এসেছি।

মাদরাসায়ে বাহরুল উলুমের মুহতামিম মাওলানা হুসাইন আহমদের সাথে সাক্ষাতের পর তিনি জানান, এখান থেকে বার্মার বর্ডার মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে। ২৪ আগস্টের পর থেকে থেকে লোক আসছেই। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার পরেই আড়াই থেকে তিন হাজার লোক আসতে থাকে। মাওলানা তাঁর মাদরাসার এক উস্তাযকে আমাদের সঙ্গে দেন। তিনি আমাদেরকে এই সমুদ্র ঘেঁষা নাফ নদীর ব্রিজে নিয়ে গেলেন যেখান থেকে শরণার্থীরা বাংলাদেশে ঢোকে। সেখান থেকে একদম সামনেই বার্মা দেখা যায় । জ্বলন্ত আগুনের ধোঁয়া আমরা সব সাথীরা নিজ চোখে দেখতে লাগলাম। তারপর আমরা মাদরসায়ে বাহরুল উলুমে ফিরে আসি। কারণ, সব রোহিঙ্গারা প্রথমে এখানে এসেই ওঠে। এ কারণে মুহতামিম সাহেবের সাথে জমিয়তের প্রতিনিধিদলের পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, এখানে একটি জরুরি সাহায্যের জন্য ক্যা¤প করা হবে। এবং বাংলাদেশ জমিয়তের অফিস সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল্লাহ শাকেরকে ক্যা¤েপর জিম্মাদার বানিয়ে তাঁকে এখানেই থাকতে বলা হয়।

এখানে এমন শরণার্থীদের সাথে সাক্ষাৎ হয় যারা আজই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নাজমা নামে এক যুবতী গৃহবধূ জানায় যে, তাঁর স্বামীকে গুলি করে শহীদ করে দেওয়া হয়েছে। এমনও বাচ্চা আছে যারা কারো না কারো সাথে এখানে এসেছে আর তাঁর বাবা-মা সেখানে রয়ে গেছে। হয়ত বাবা মারা গেছে, নিজের জান হাতে রেখে বাচ্চাকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছেন এই আশায় যে, আমার কলিজার টুকরাটা অন্তত এই অত্যাচার থেকে বাঁচুক। এই সদ্য আগত মাজলুমদের জমিয়ত নেতৃবৃন্দ কিছু নগদ অর্থ প্রদান করে আমাদের থাকার জায়গায় যাওয়ার জন্য রওনা হই। ¯িপডবোটে করে নতুন পাড়া পৌঁছে মাগরিবের নামজ আদায় করি। তারপর রওনা হই। প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। গাড়িতে বসে হৃদয়বিদারক ঘটনা মনে করে চোখ থেকে আপনাতেই পানি বের হয়ে এল। দেখলাম একজায়গায় স্থানীয় পুলিশ, মিলিটারী ও মিডিয়া কর্মীরা বৃষ্টিতে ছাতা নিয়ে জড় হয়ে আছে। গাড়ি থামিয়ে দেখলাম ৫টি মাসুম বাচ্চাসহ ১৫টি লাশ রেখে দেওয়া হয়েছে। পরে জানতে পারলাম যে এরা আজকে সন্ধ্যায় নৌকায় করে বাংলাদেশে আসার সময় সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে। মনে বড় ব্যাথা পেলাম আর বললাম যে আল্লাহ এদের সাহায্য কর।

আনুমানিক রাত ১০টার দিকে আমাদের থাকার জায়গায় এসে পৌঁছাই। আসার পর শাহপরীর দ্বীপে জমিয়তের ক্যা¤প থেকে মাওলানা আব্দুল্লাহ শাকের ফোন করে জানান, আমরা চলে আসার পর থেকে এরমধ্যেই দেড় দুই হাজার লোক এসে পৌঁছেছে। কেউ কেউ নৌকার ভাড়া পর্যন্ত দিতে পারেনি পরে জমিয়তের পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয় এবং জরুরিভাবে তাদের জন্য কিছু খাবার দাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যার্থে জমিয়তুল উলামার কর্মীবৃন্দ কুতুপালংয়ে হিন্দু পাড়া শরণার্থী ক্যা¤প পরিদর্শনে যায়। এখানে ধারালো অস্ত্রের দ্বারা জখম “মধুপাল” নামে এক বার্মী যুবকের জবানীতে জানা যায় যে, এখানে ১৬০ পরিবারের ৬২০ জনের মত লোক রয়েছে। সে জানায়, আমাদের উপর হামলা হয়েছে কেউ পালাতে সক্ষম হয়েছে আর কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে। “নিতাই শিল” এই যুবকের দুই হাত ও মুখে জখমের অনেক চিহ্ন বিদ্যমান। এখানে জমিয়তের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়। এই ক্যা¤েপ ভারতের পাঞ্জাবের ‘ইউনাইটেড শিখ সংস্থার’ পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে খাবার বিতরণের কাজ চালু করেছে। শিখ সংস্থার কর্মকর্তা যতিন শিখ নিজ দেশের লোক পেয়ে খুব খুশি হন এবং আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন আর বলেন যে, এখানে আজ প্রথম কোন ইন্ডিয়ান সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ হলো।


নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাহায্যের সুবিধার্থে মাওলানা মাকনুন সাহেবের দিকনির্দেশনায় জমিয়তের ১০ জন কর্মী কুতুপালং লুম্বাসা ক্যা¤েপ মাদরাসায়ে খালিদ বিন ওয়ালিদে জামিয়তে উলামায়ে হিন্দ ও ইসলাহুল মুসলিমীনের স্থায়ী অফিস নির্মাণ করা হয় এবং তা মাওলানা শুয়াইব আহমদের দায়িত্বে অর্পণ করা হয়। এখানে বার্মী আলেম মাওলানা মুহাম্মাদ জাবের সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হয়। যিনি ৯ অক্টোবর কুটুঙ্গি পাহাড় পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছেছেন। যেহেতু তিনি মাওলানা তাই তিনি উর্দুতে জমিয়তের নেতৃবৃন্দকে সেখানের অনেক খবর দিয়েছেন। তিনি জানান যে, আরাকানে তিনটি বড় মুসলিম প্রধান শহর রয়েছে। ১) মঙ্গড়- ২) বুছিডং ৩) রুছিডং
মংড়-র সাথে বাংলাদেশ খুশকির কাছে গিয়ে মিলেছে। তিনি বলেন, অত্যাচারীরা বার্মার গাছিদাম শহরের কাছে কিংডম গ্রামকে চারিদিক থেকে ঘিরে হামলা চালায় এবং সেখানের অধিকাংশ পুরুষকে গুলি করে বা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে। মাওলানা অত্যাচারের এই ঘটনা বর্ণনা করতে করতে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, আমরা মংড়- শহরের কাছে রাঙ্গামালী গ্রামে বসবাস করি। গ্রামের প্রায় আড়াইহাজার নারী পুরুষ বাংলাদেশের দিকে পালাতে থাকি।

তখন পিছন ফিরে দেখি আমাদের গ্রামের ৭ জন যুবতি বোন অত্যাচারীদের কাছে বন্দি, তখন আমরা সেখানে থেমে যাই , তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন যে, আমাদের চোখের সামনে সেই সাত বোনকে আগুনে পুড়তে দেখেছি। কিছু সময় পর তিনি বলেন যে, এই তিন শহরে ১০৫টি বড় মাদরাসা ছিল, মিলিটারীরা কিছু মাদরাসা ২০১২ সালে এবং কিছু মাদরাসা এই সময় ২০১৭ সালে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁর এই কষ্টের কাহিনী বর্ণনার এক ফাঁকে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারি মাওলানা হাকিমুদ্দীন কাসেমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন এখন আপনারা কী চান? এই জুলুম নির্যাতনের পাহাড় মাথায় নিয়ে তিনি যা বললেন তা মুসলিম উম্মতের জন্য এক বিরাট পয়গাম। তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যেই আমাদের কামিয়াবী নিহিত। এই মুহূর্তেও আমরা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীকা অনুসরণ করতে চাই এবং ত্রাসের বদলে ভালোবাসার পরিবেশ তৈরী করতে হবে। আমরা বার্মায় জন্মেছি, যখন ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ সৃষ্টি হবে আমরা আবারও নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।

জানেশীনে ফিদায়ে মিল্লাত সাইয়্যেদ মাহমুদ মাদানী দামাত বারাকাতুহুম-এর তাওয়াজু ও রায়হানাতুল আসর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম-এর নির্দেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহযোগিতায় হযরত মাওলানা মাকনুন, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সেক্রেটারি মাওলানা হাকিমুদ্দিন কাসেমি, সংগঠক মাওলানা আহমাদ আব্দুল্লাহ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ হযরত মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুম-এর অনুমতিক্রমে কাজকে সুশৃঙ্খল করার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করি। তাঁর মধ্যে বিভিন্ন উপদল গঠন করে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় । তাঁর মধ্যে একটি দল মাওলানা আব্দুল্লাহ শাকেরের দায়িত্বে যেটা শাহপরীর দ্বীপে কাজ করবে। সন্ধ্যা নামার পর যেখান থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আরেকটি দল মাওলানা শুয়াইব আহমদের দায়িত্বে যেটা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করবে। এখন পর্যন্ত জমিয়তের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ, খাদ্য, ঔষধ, শরণার্থীদের ক্যা¤েপ পৌঁছানোর ব্যবস্থা চলছে এবং আগামীতে শরণার্থীদের জন্য তাবু, সেনিটেশন, শিক্ষা, স্কুল নির্মাণ, মাদরাসা নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।

মাসিক পাথেয় : অক্টোবর ২০১৭/১ম কিস্তি

● পাথেয় ডেস্ক

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com