২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১০ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

শান্তিনগরে একবিকেল

শান্তিনগরে একবিকেল

মুজীব রহমান : নদীভ্রমণ আমার খুব পছন্দের। কোন যানজট থাকে না।কান নষ্ট করা হরণের শব্দ থাকে না। থাকে না কোন চিল্লাফাল্লাও।এছাড়াও পরিবেশ থাকে খুব শান্তশিষ্ট। অথৈ জলের ভেতর শনশন শব্দ করে পালতোলা নৌকা চলতে থাকে অবিরাম। চাঁদনী রাত হলে নৌকাভ্রমণ হয়ে উঠে এক অপার্থিব স্বর্গভ্রমণ।

সেদিন আকাশে শরতের নীল।শিমুল তোলার মত উড়ছে খণ্ড খণ্ড মেঘ।

তিন চারটা ঘাট পাড় হয়ে শরীর অনেকটা ক্লান্ত। কিছুদিন আগে বন্যায় প্লাবিত হয়েছে নদীতীরের শতশত মানুষের ঘরবাড়ি।থমকে গিয়েছিল তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন।

তাদের একটু খোঁজখবর নিতেই উস্তায লাবীব আবদুল্লাহ’র সাথে সেদিন বের হয়েছিলাম।

মধ্যদুপুর। আমরা তখন তৈয়র ঘাটে। এখান থেকে দুলালের চর অটোতে কয়েক মিনিটের পথ। দুলালের চর ধীরে ধীরে তার এ পুরনো নামটা মুছে যাচ্ছে। অনেকেই এখন দুলালের চরকে বলে “শান্তিনগর।”

এ নামটি নাকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী রেখেছেন। ময়মনসিংহের থানার ঘাট বস্তি,রেল লাইন ও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গৃহহীন মানুষদের জন্য এখানে তৈরী করা হয়েছে ২৪০ টি গৃহ।বাহিরের মানুষ এটাকে গুচ্ছ গ্রাম বললেও তারা তা বলতে নারাজ।কারণ প্রধানমন্ত্রীর এতে মন খারাপ হতে পারে। আমরা অটোতে করে চলছি শান্তিনগরের দিকে।

বাঁশের একটি সাঁকো পার হয়ে আমরা চলে এলাম শান্তি নগরে। এখানে এসে আমাদের সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে গেল। শান্তি নগরের সবার মুখেই পরম তৃপ্তির হাসি। তাদের সকলের মাঝে খেলা করছে ঈদের আমেজ।

তারা ভাবতে পারে নি কোন দিন তাদের নিজস্ব একটা ঘর হবে।সেই ঘরে বিদ্যুৎ থাকবে। থাকবে নিজস্ব একটা নলকূপও। এখানের কেউ কেউ ত্রিশ চল্লিশ বৎসর কাটিয়েছে উদ্বাস্তু জীবন।ঘরহীন।রেললাইনের প্লাট ফর্মে কিংবা নদীর পাড়ে। আজ তাদের নিজস্ব একটা ঘর হয়েছে।

গত মে মাসের ১৯ তারিখ উপজেলা প্রশাসন সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে এ অসহায় মানুষদের তালিকা তৈরী করেছিলেন।বলেছিলেন ঈদের পর প্রত্যেক পরিবার তাদের ঘরের চাবি বুঝে পাবে। হয়েছেও ঠিক তাই।ঈদের পরেই প্রত্যেকে তাদের ঘরের চাবি বুঝে পেয়েছে। প্রতিটি ঘরে দুটি করে রুম ও পাশে রান্নাঘর।বিদ্যুৎও দেওয়া হয়েছে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে।কয়েকটি পরিবারকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি করে নলকূপ। বাড়ির আঙিনায় লাগানোর জন্য কিছুদিনের মধ্যেই দেয়া হবে বিভিন্ন ফলবান গাছ।

সেখানে সরকারি খরচে তৈরি করে দেওয়া হয়েছে একটি মসজিদ। শিশুদের খেলার জন্য আছে একটি সুন্দর মাঠ।

সেখানে বেশ কয়েকটি পরিবারের সাথে আমাদের কথা হয়। তারা সুন্দর পরিবেশে এমন একটি ঘর পেয়ে দারুণ খুশি।বাচ্চারাও দারুণ উৎফুল্ল। তাদের আগে দিন কাটত বস্তিতে। নদীর তীরে।খেলার মত তাদের কোন মাঠ ছিল না।এখানে তারা প্রতিদিন বিকেলে ক্রিকেট খেলে।কখনও ফুটবল।
দু’ বাড়ি পার হয়ে আমরা সামনে এগুতেই দেখি চারপাঁচটা মেয়ে লুডু খেলছে। তারা কেউ আগে একজন আরেকজন কে চিনত না।এখানে এসে তারা পরস্পর পরিচিত হয়েছে। তাদের এখানে মসজিদ ও খেলাধুলার মাঠ থাকলেও এখনো কোন বিদ্যালয় তৈরী হয় নি। তাই তারা খেলাধুলা করে আর ঘুরা ফেরা করেই সময় কাটাচ্ছে।তারা লেখা পড়তে চায়। বিশেষ করে কুরআন শিখার প্রতি তাদের খুব আগ্রহ রয়েছে। মসজিদে এখনো কোন ইমাম নির্ধারণ হয় নি।অচিরেই ইমামও নির্ধারণ হবে। আমাদের উচিত এ ২৪০ টি পরিবারের শিক্ষা নিয়ে ভাবা। তাদের জন্য এখানে সুপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘমেয়াদে কুরআনের মক্তব প্রতিষ্ঠা করা।

এখানের অভিভাবকরাও এমনটাই চান। ভূমিহীন উদ্বাস্তু মানুষের জন্য সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। ময়মনসিংহে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গৃহহীন মানুষদের জন্য আরো দু’টি গুচ্ছগ্রামের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সরকারের কাছে।এই প্রস্তাব দুটি পাস হলে প্রায় আরো ৬০০ গৃহহীন পরিবার একটু শান্তিতে ঘুমুতে পারবে।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে পশ্চিমাকাশে। ঝাঁকে ঝাঁকে শালিকের দল বসে আছে শিমুলডালে।

আমরা তখন তৈয়র ঘাট,বউ বাজার, কল্যানপুর ও ঘন্টির পথে পথে…..।

ইবনে খালদুন অধ্যয়ণ কেন্দ্র

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com